বৈশাখ: প্রবাসে আমার দেশ

সুবীর কাস্মীর পেরেরা: 

গত বছরের ঘটনা, ভার্জিনিয়ার লী হাইওয়ের গেটওয়ে পার্ক। ঢুকতে চোখে পড়লো লাল-সাদা রঙের শাড়ি-পাঞ্জাবি পরা হাজার মানুষ। কেউ দাঁড়িয়ে গল্প করছে, কেউ ছবি তুলছে কেউবা আবার দোকান থেকে কিনছে শাড়ি-চুড়ি-গয়না ও দেশীয় খাবার। অন্যদিকে অস্থায়ী মঞ্চ সাজিয়ে বাঙালি ঘোষিত হচ্ছে নানা ঘোষণা।শিশুরা ব্যস্ত বেলুন ও বাঁশি নিয়ে। ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে গেলাম রমনা বটমূলে। এই তো আমাদের সোনার ছোট বাংলাদেশ।যেখানে জন্ম আমার, যেখানে কেটেছে আমার শৈশব-কৌশোর-যৌবন। আবেগ হয়, বিবেকের ভিতরে বার বার নাড়া দিচ্ছিলো আমাদের দেশের ভালোবাসা।

গেলো বছর ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামিলি, বাংলা স্কুল সহ নানা সংগঠন আলাদা আলাদা ভাবে উদযাপন পড়েছে বাংলা নববর্ষ উদযাপন ও বৈশাখী মেলা। শুরুটা হয়েছিল অনেক আগেই। শুরু ওয়াশিংটন এলাকায় নয়, গোটা আমেরিকা জুড়ে চলছে এই মহোৎসব। কে বলবে আমরা বাংলা মাকে ভুলে গেছি? ভুলে গেছি আমাদের শিকড়ের মূল কিংবা ভুলে গেছি আমাদের সংস্কৃতি?

প্রবাসী বাঙালিরা যে হারে বাঙালি জাতীয় উৎসবগুলো উদযাপন করে তার চেয়ে অধিক কম হারে অন্যান্য জাতি পালন করে কিনা সন্দেহ।

আমরা যারা প্রবাসে আছি তাদের দিন কাটে কাজের মধ্যে দিয়ে। কেউ চাকরি করে, কেউ ব্যবসা কিংবা ঘর সংসার নিয়ে। এতো ব্যস্ততার মধ্যে কিন্তু আমরা আমাদের জাতীয় উৎসবের কথা মোটেও ভুলে যায়নি। ভুলে যাইনি আমরা খাঁটি বাঙালি। আমাদের আচার-আচরণে-কাজে সর্বদা বাংলার ছাপ।

আমাদের যত জাতীয় উৎসব আছে তন্মধ্যে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মতো উৎসব এতো ঘটা করে পালন করা হয় না। কারণ বৈশাখী উৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসব। বৈশাখ এলেই প্রাণে জানে দোলা, সেই দলের বহিঃ  প্রকাশ আমাদের পোশাকে। ভিবিন্ন ষ্টেটে মাসজুড়ে চলে বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলার আয়োজন। স্থানীয় শিল্পীদের সাথে বাংলাদেশি শিল্পীরা চলে আসে উৎসব পালন করতে। নাচে-গানে মাতিয়ে রাখে প্রবাসীদের।

আমার দেখা কয়টি সংগঠনের বৈশাখী মেলার প্রধান আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে, সম্পূর্ণ বাংলা সংস্কৃতিতে অনুষ্ঠান আয়োজন, পাশাপাশি বাংলা পোশাকের ও খাবার দোকান, দেশীয় পোশাকে বাঙালিদের উৎসাস ও মঙ্গল শোভাযাত্রা। এই বৎসর থেকে যোগ হয়েছে, লাটিম ঘুরানো প্রতিযোগিতা ও বলি খেলা। গত সপ্তাহে ভার্জিনিয়ার ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামিলির আক্তার হোসাইন ও শিব্বির আহমেদ এই নতুন মাত্রা যোগ করেন।

কেন এতো ব্যস্ততার মধ্যে এতো আয়োজন? উত্তরে জানালেন ভার্জিনিয়ার অন্যতম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামিলির কর্ণধার সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব ও সংগঠক জনাব আবু রুমি বলেন, দেহতত্ব বলে প্রবাসে আছি, কিন্তু মনতত্ব বলে আছি প্রবাসের ভিতরে আমার বাংলাদেশে। তিনি বলেন, ভিবিন্ন জাতীয় উৎসব আয়োজনের মধ্যে দিয়ে আমি আমার দেশের স্বাদ গ্রহণ করি। এর মধ্যে পহেলা বৈশাখ মানে দেশের শিকড়ের রস গ্রহণ করা। তিনি বলেন, আমার অস্তত্বি মিশে আমার আমার বাংলাদেশের সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি ভুলে যাবার নয়। তিনি বলেন, বাংলা সংস্কৃতিকে মানুষের মাঝে জাগ্রত করাই আমার লক্ষ্য। এই প্রসঙ্গে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ফোরামের সুকুমার পিউরিফিকেশন বলেন, আমার স্ত্রী মুক্তা মেবেল রোজারিও সংগীত শিল্পী। আমার মেয়ে মেঘা পিউরিফিকেশন নাচ ও গান করে এবং আমি তবলায় সঙ্গত করি। বলতে গেলে বাংলা সংস্কৃতির বলয়ে আমার পুরো পরিবার ও আমার বেড়ে উঠা। এই কারণে যেকোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে যোগদান করে আমাদের বাংলা সংস্কৃতির স্বাদ আস্বাদন করি। তিনি বলেন যতদিন প্রবাসে থাকব আমার পরিবার ও আমার অস্তিত্ব জুড়ে থাকবে আমার শেকড়।  বাঙালি-আমেরিকান খ্রিষ্টান এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট স্ট্যানলি খোকন রোজারিও বলেন, আমি আমার দেশকে খুব অনুভব করি। অনুভব করি নিজস্ব সংস্কৃতিকে। কিন্তু অনুভব নিজের ভিতরে পুষে রাখলে তো চলবে না! এই অনুভব ও চেতনা সবার ভিতরে জাগ্রত করাই আমাদের লখ্য ও উদ্দেশ্য। আমাদের নতুন প্রজন্মকে তাদের শেকড়কে চিনতে সহায়তা করতে গেলেই এই ধরণের উৎসবে তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

বিগত বছরগুলোতে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া মিজানুর রহমান খান ও কুলসুম আলম খুকি দম্পত্তির উৎসাহটা একটু বেশি। যেকোন বাংলা অনুষ্ঠান হলেই এই দুজন ছুটে আসেন। এক সময় থিয়েটারের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন মিজান। তিনি বলেন ভুলতে পারিনি দেশকে। দেশ কি বা দেশ প্রেম কাকে বলে প্রবাসে না আসলে বুঝতে পারতাম না। যার কারণে এই ধরণের অনুষ্ঠানে ছুটে আসি। শুরু মিজান-খুকি নয় বাংলা সংস্কৃতির সাথে ওতোপতো ভাবে জড়িত ছিলেন, শামীম চৌধুরী, শেখ মাওলা মিলন, শফি দেলোয়ার কাজল, আবু রুমি, বুলবুলি ইসলাম, ক্লেমেট স্বপন গমেজ, দিনার মনি, ডরোথি বোস, সোমা বোস, রুমা ভৌমিক সহ আরো অনেকে বাংলা অনুষ্ঠানে সপরিবারে চলে আসেন।

বলতে দ্বিধা নেই, আবেগ প্রবণ বাঙালি যেমন দেশের জন্য রক্ত দিতে জানে, তেমন দেশের মান ও সংস্কৃতি ধরে রাখতে অক্লান্ত পরিশ্রমও করতে জানে। আমরা আমাদের দেশ নিয়ে যেমন গর্ব করি, ঠিক তেমনি প্রবাসী বাঙালিদের নিয়ে আমরা ততটুকু গর্ব করতে জানি।

প্রবাসের বুকে আমরাই তো বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকবো। লেখাটি যদিও আবেগের কিন্তু বিবেক দিয়ে চিন্তা করুন আপনার ভূমিকা কোন স্থানে?