মিডিয়াতে যদি খ্রিস্টের বাণী প্রচার করা হয় তবে মানুষ তা শুনবেন: ফাদার সুনীল রোজারিও

ফাদার সুনীল ডানিয়েল রোজারিও, বাংলাদেশের রাজশাহী কাথলিক ধর্মপ্রদেশের একমাত্র অনলাইন রেডিও স্টেশন- রেডিও জ্যোতির পরিচালক। রেডিও জ্যোতি স্টেশনটি উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র বগুড়া সিটিতে অবস্থিত। ফাদার সুনীল রোজারিও একজন পেশাদার সাংবাদিক, লেখক, গীতিকার, সুরকার, কন্ঠশিল্পী , আবৃত্তিকার। নানা গুণের অধিকারি ফাদার সুনীল রোজারিওর মুখোমুখি হয়েছিলাম অনলাইনে, বিডি খ্রিস্টান নিউজের  (বিডিসিএন) পক্ষে আমি সুমন কোড়াইয়া। মিডিয়াতে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের বহু চিত্র ওঠে এসেছে এই সাক্ষাৎকারে। বিডি খ্রিস্টান নিউজের পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো।

বিডিসিএনঃ- ফাদার সুনীল রোজারিও- বিডি খ্রিস্টান নিউজ এবং পাঠকদের পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা। আমি আপনার কাছে প্রথমেই জানতে চাইবো, আপনি কীভাবে এবং কখন থেকে রেডিওর সাথে যুক্ত হলেন।

ফাদার সুনীল :-শুভেচ্ছা। ছোটোকাল থেকেই রেডিওর প্রতি আমার অতিরিক্ত টান ছিলো। আমি অভিষিক্ত হওয়ার পর ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারির ২৭ তারিখ থেকে দিনাজপুর ধর্মপ্রদেশের বলদিপুকুর মিশনে আমার পালকীয় কাজ শুরু করি। সে বছরই বড়দিনের কিছুদিন আগে রংপুর বেতারে অডিশন দেই। কোনো ঝামেলা ছাড়াই টিকে গেলাম। আমাকে দেওয়া হলো বড়দিনের অনুষ্ঠান করার জন্য ৩০ মিনিট সময়। সেই থেকে নিয়মিতভাবেই রংপুর বেতার এবং কিছুদিন ঠাকুরগাঁও বেতার থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করতাম।

বিডিসিএনঃ- আপনি তো প্রায় তিন দশক ধরে রেডিও ভেরিতাস এশিয়ার (আরভিএ) বাংলা বিভাগের সাথে জড়িত ছিলেন- এই বিষয়ে কিছু বলুন।

ফাদার সুনীল :- আমি আরভিএর বাংলা বিভাগের শুরু থেকেই অনুষ্ঠান শুনতাম এবং সুনীল রায় ছদ্ব্য নামে চিঠিপত্র লিখতাম। রংপুর বেতারের সাথে যুক্ত থাকার কারণে আমি বাণীদিপ্তীর নজরে পড়ি। খ্রিস্টিয় যোগাযোগ কেন্দ্রের পরিচালক স্বগীয় ফা. জ্যোতি এ. গমেজ এবং প্রখ্যাত লেখক হেবল ডি’ক্রুশ আমার বিশপ থিওটোনিয়াস গমেজের  কাছে অনুরোধ করেন যেন আমাকে আরভিএ মেনিলাতে কাজের জন্য অব্যাহতি দেওয়া হয়। বিষয়টি আমি জানতাম না। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি আমি বদল হয়ে বলদিপুকুর থেকে ঠাকুরগাঁও মিশনে গেলাম। বিশপ থিওটোনিয়াস তিনজন নতুন সিস্টারসহ আমাকে ঠাকুরগাঁও মিশনে নিয়ে গেলেন। বিকালে বিশপ দিনাজপুর ফিরে যাওয়ার আগে আমাকে বললেন, আমাকে মেনিলায় অবস্থিত রেডিও ভেরিতাসে যেতে হবে। যেন ফা. জ্যোতি গমেজের সাথে যোগাযোগ করে প্রস্তুত হতে থাকি। সে বছর পোপ ২য় জন পল বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। আমি বৃহত্তর দিনাজপুর ধর্মপ্রদেশ থেকে পোপীয় সফরের কেন্দ্রীয় কমিটির একমাত্র সদস্য থাকায় তিনমাস ঢাকা দৌঁড়াতে হয়েছে। ফলে রেডিওর প্রস্তুতি একটু ব্যাহত হয়েছিলো।

বিডিসিএন: তাহলে ঠিক কখন থেকে আপনি রেডিও ভেরিতাসের বাংলা বিভাগের সাথে যুক্ত হলেন?

ফাদার সুনীল :- ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর আমি ঠাকুরগাঁও থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকায় পৌঁছি। সন্ধ্যায় রমনা সেমিনারিতে ফা. জ্যোতির সাথে দেখা হলো। আমাকে দেখে ফা. জ্যোতির প্রথম কমেন্ট ছিলো, “আমার কাঁটার মুকুটে আর একটি কাঁটা যোগ হলো।” বাণীদিপ্তীতে চারমাস বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারির ২৯ তারিখে কোলকাতার চিত্রবাণীতে যাই। সঙ্গে ছিলেন আর্চবিশপ মাইকেল রোজারিও, বিশপ মাইকেল  ডি’রোজারিও, সিএসসি, ফা. জ্যোতি এ. গমেজ, ফাদার সুব্রত বনিফাস টলেন্টিনু, সিএসসি এবং আমি। উদ্দেশ্য ছিলো রেডিও ভেরিতাসের বাংলা কাউন্সিল গঠন করা।  কোলকাতার চিত্রবাণী যোগাযোগ কেন্দ্রে আরো কিছুদিন প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি কোলকাতা-হংকং হয়ে মেনিলায় পৌঁছি এবং ঐদিন রাতের অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো বিশ্ব সংবাদ পড়েছিলাম। সেই সময় সব মিলিয়ে ভেরিতাসের কর্মী সংখ্যা ছিলো ২০৮জন।

বিডিসিএন : ফাদার আপনি কতোদিন মেনিলার ভেরিতাসের প্রধান স্টুডিওতে বাংলা বিভাগে কাজ করেছেন ?

ফাদার সুনীল:- প্রথম মোট চার বছর কাজ করার পর ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে দেশে ফিরে আসি। পরে আবার ২০০২ খ্রিস্টাব্দে মেনিলার বাংলা বিভাগ থেকে দুইজন ইস্তফা দিয়ে চলে যাওয়ার কারণে জরুরি ভিত্তিতে বারুইপুরের বিশপ সালভাদোর লবো এবং বিশপ পলিনুস কস্তা অনেকটা ধরে বেঁধে আমাকে মেনিলায় পাঠিয়ে দিলেন। বললেন তিনমাস থাকবে। কিন্তু থাকলাম তিনবছর। সেটা ছিলো ২০০২ খ্রিস্টাব্দের মে মাসের ২৪ তারিখ। দ্বিতীয়বার আমার দায়িত্ব ছিলো অনেক বেশি। কর্মী সংখ্যা পাঁচ থেকে কমে হয়েছিলাম তিনে। আমি ছিলাম বাংলা সার্ভিসের বিভাগীয় প্রধান। এছাড়া কোম্পানি আমাকে দায়িত্ব দেয়- ভেরিতাস থেকে প্রচারিত ১৬টি ভাষায় প্রচারিত সার্ভিসের সাথে যুক্ত ৪৯জন সাংবাদিক এবং তাদের পরিবারের ডিন হিসেবে। নানা দেশের নানা ভাষা-সংস্কৃতির মানুষকে নিয়ে কাজ করা ছিলো বিড়ম্বনায় ভর্তি। দুই মেয়াদে মোট সাত বছর মেনিলার প্রধান স্টুডিওতে ছিলাম।

বিডিসিএন :- ফাদার সুনীল ভেরিতাসের বাংলা বিভাগের সাথে যুক্ত থাকার সময় আপনার নিজের তৈরি কোন্ কোন্ অনুষ্ঠান আপনার ভালো লাগতো।

ফাদার সুনীল : দুটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান আমার প্রিয় ছিলো। একটি হলো গণমাধ্যম বিষয়ক অনুষ্ঠান “আজকের গণমাধ্যম”, এটি শুরু করেছিলাম ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ জুন। আর অন্যটি ছিলো বিশ্বের সমসাময়িক গঠনাবলী নিয়ে বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠান “আর্ন্তজাতিক সমীক্ষা।”এটি শুরু করেছিলাম ২০০২ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মে মাস থেকে। এই দুটি অনুষ্ঠান একটানা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের জুন মাস পর্যন্ত নিজে লিখে নিজের কন্ঠে সম্প্রচার করেছি।

বিডিসিএন : আপনি তো দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ কাথলিক বিশপ সম্মেলনী কর্তৃক পরিচালিত খ্রিস্টিয় যোগাযোগ কেন্দ্রের পরিচালক ছিলেন। আপনার প্রধান কাজ কী ছিলো।

ফাদার সুনীল : খ্রিস্টিয় যোগাযোগ কেন্দ্রের প্রধান তিনটি ডিপার্টমেন্ট রয়েছে… যেগুলোহলো…

১. সাপ্তাহিক প্রতিবেশী- সাপ্তাহিক প্রতিবেশীর মাধ্যমে চার্চের শিক্ষা মানুষকে জানানো, দেশের খবরাখবর প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিদের কাছে তুলে ধরা, দেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতি লেখনীর মাধ্যমে সংরক্ষণ করা এবং নতুন লেখক সৃষ্টি করা ছিলো প্রধান উদ্দেশ্য।

২. বাণীদিপ্তী- বাণীদিপ্তী সেলের প্রধান কাজ ছিলো রেডিও ভেরিতাসের জন্য অনুষ্ঠান তৈরি করা। দেশের মধ্যে বিভিন্ন উৎসব পর্বে বাংলাদেশ বেতার এবং টেলিভিশনের অনুষ্ঠান করা, ধর্মীয় গান ও ধর্মীয় অনুষ্টান রেকর্ড করা এবং শিল্পী গোষ্ঠি তৈরি করা।

৩. প্রতিবেশী প্রকাশনী- প্রতিবেশী প্রকাশনীর কাজ হলো সাপ্তাহিক প্রতিবেশী প্রত্রিকা প্রকাশ করা, জেরী প্রিন্টিংএর মাধ্যমে ধর্মীয় বই পত্র প্রকাশ করা, ইত্যাদি। তিনটি ডিপার্টমেন্ট দেখার দায়িত্ব থাকলেও আমি একটু বেশি সময় দিতাম বাণীদিপ্তীকে।

বিডিসিএন :- ফাদার সুনীল রোজারিও, এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক, আর সেটা হলো- অনলাইন রেডিও জ্যোতি সর্ম্পকে। এই ইন্টারনেটভিত্তিক বা অনলাইন রেডিও স্টেশন স্থাপনের যুগান্তকারি ও সাহসী চিন্তাটা আপনার মাথায় কীভাবে এলো।

ফাদার সুনীল :-রাজশাহী কাথলিক ধর্মপ্রদেশের পক্ষ থেকে বহুভাবে চেষ্টা করা হয়েছে একটি এফ.এম. (F.M.= Frequency Modulation) রেডিও স্টেশন স্থাপনের জন্য। কিন্তু নানা জটিলতায় তা আর হলো না। এক সময় একজন পিমে মিশনারি, বিশপ জের্ভাস রোজারিওকে বলে কয়ে আমাকে বগুড়া সিটিতে অবস্থিত এম্মাউস ভবনে নিয়ে এলেন এই সিদ্ধান্তে যে, বগুড়ায় একটা বড় ধরনের প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হবে। সেই প্রজেক্ট আর হলো না। এতে আমি মানসিকভাবে ও ভীষণভাবে আহত হয়েছি। আমি ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২ ডিসেম্বর বগুড়া এলাম। কিন্তু সৃষ্টি করার মতো কোনো কাজ খুঁজে পেলাম না। বাধ্য হয়ে সেন্ট সিলভিয়া কাথলিক স্কুল নামে একটা ছোটো স্কুল শুরু করলাম। ধমনীতে রেডিওর রক্ত, মন ভরে কী করে? পরের বছর মার্চ মাসের ৪ তারিখে বিশপ জের্ভাসকে বললাম, এম্মাউস ভবনে একটা অনলাইন রেডিও চালু করলে কেমন হয়। বিশপ জের্ভাস সিদ্ধান্ত দিতে এক মিনিট সময়ও নেননি। বললেন, ঠিক আছে, পুরো সহযোগিতা তুমি পাবে। তখন বিশপ নিজেও জানতেন না, অনলাইন রেডিও কীভাবে চলবে। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুন শুক্রবার, প্রভু যীশুর হৃদয়ের মহাপর্বদিনে বিশপ জের্ভাস রোজারিও নিজে বগুড়া সিটিতে এসে রেডিও জ্যোতির সম্প্রচার উদ্বোধন করেন। সেই থেকে এখনো বাংলাদেশ কাথলিক চার্চে রেডিও জ্যোতি একমাত্র অনলাইন রেডিও হওয়ার গৌরব ধরে রেখেছে।

বিডিসিএন : এই অনলাইন রেডিও জ্যোতির মূল উদ্দেশ্য কী? বা এই স্টেশন থেকে কী ধরনের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে।

ফাদার সুনীল :- আজকের দিনে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া হোক বা প্রিন্ট মিডিয়া হোক- একটা ব্যবসায়ীক ও দলমত, জনমত তৈরির উদ্দেশ্য থাকে। সেই সাথে শ্রোতা দর্শক ধরে রাখা ও বাড়াবার জন্য থাকে চটকদার বিজ্ঞাপন ও চটকদার বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনা। রেডিও জ্যোতি তা থেকে অনেক ভিন্ন। এখান থেকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বাইবেলভিত্তিক অন্ষ্ঠুান ছাড়াও জাতীয় অনুষ্ঠান, অন্য ধর্মের  পর্ব-উৎসব, যুব শ্রেণীর জন্য, নারীদের জন্য, ছোটোদের জন্য বিশেষ নাটিকা ও ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান এবং অতি সম্প্রতি চালু করা হয়েছে স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠান “নার্সিং হোম।” অনুষ্ঠান পুনঃপ্রচারের মাধ্যমে ২৪ ঘন্টা ধরেই সম্প্রচার হচ্ছে। সেই সাথে সুযোগ রয়েছে আর্কাইভ এবং ইউটিউব থেকে শোনার ।

বিডিসিএন : রেডিও জ্যোতির শ্রোতা কারা এবং ফিডব্যাক কেমন?

ফাদার সুনীল :- রেডিও জ্যোতির উদ্দেশ্য হলো যুব সমাজের মনোনিবেশ আকর্ষণ করা। কারণ এই অনুষ্ঠান যেহেতু এনড্রয়েট মোবাইল ফোনে শোনা যায় আর যুব সমাজ প্রায় সারাক্ষণ মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে থাকে- তারা যেন অনুষ্ঠান শুনে। এছাড়া বাঙালি খ্রিস্টান যারা প্রবাসে বসবাস করছেন তাদের কথা ভেবে অনুষ্ঠান তৈরি হচ্ছে। বিশ্বের ৩০টি দেশের শ্রোতাদের কাছ থেকে ফিডব্যাক আসে এবং মাসে গড়ে প্রায় দেড় লক্ষ্য শ্রোতা রেডিও জ্যোতি হিট করে বা ভিজিট করে। প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রোতা দেশের বাইরের বাংলা ভাষাভাষি। প্রতি মাসে প্রায় ২৫ থেকে ৩২টি দেশের শ্রোতার কাছ থেকে নটিফিকেশন পাই।

বিডিসিএন : একটা প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে কিছু চ্যালেঞ্চের মুখোমুখি হতে হয়। রেডিও জ্যোতির সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

ফাদার সুনীল :-বহু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মাঝে মধ্যে মনে হয় এই প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকবে কিনা। কারণ চার্চে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি থাকলেও মিডিয়াতে তাদের উপস্থিতি খুব কম। মিডিয়া বিষয়ে আগ্রহ নেই। মিডিয়ার প্রথম শর্ত হলো স্কিৃপ্ট বা লেখালেখি। এই লাইনে কেউ এগিয়ে আসছে না- সেই পুরণো কয়েকজন ছাড়া। রেডিও টেলিভিশনে বৃহত্তর সমাজের লোক যেভাবে এগিয়ে আসছে- চার্চের বেলায় তা হচ্ছে না। ফাদার সিস্টারগণ এগিয়ে আসছেন না। অনেকের মধ্যে ট্যালেন্ট আছে তবে কী নিয়ে যে ব্যস্ত থাকে একমাত্র ঈশ্বরই জানেন।এ ব্যাপারে চার্চের কর্তৃপক্ষের আরো একটু উদ্যোগ দরকার। উপযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত স্থানে নিয়োগ দিতে হবে। এটা কোনো পাটটাইম জব হতে পারে না। তবে আমি খুশি যে, রাজশাহী কাথলিক ধর্মপ্রদেশ এক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে আছে। আমি একটা সুদিন দেখতে পাচ্ছি। তবে দেশের গোটা চার্চের মিডিয়া নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। চার্চে আরো কয়েকটি অনলাইন রেডিও স্টেশন থাকলে একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হতো এবং তাতে ভালো হতো।

বিডিসিএন :- খ্রিস্টের বাণী প্রচারে এবং চার্চের পালকীয় কাজে এই রেডিও এবং মোদ্দা কথায় মিডিয়ার ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ফাদার সুনীল:- বিশ্বের কোথায় কী ঘটছে মিডিয়ার কল্যাণে এক মুহূর্তে বিশ্বে জানাজানি হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সমসাময়িক অনেক ঘটনা মিডিয়ার কারণে আলাদা জনমত তৈরি করছে। অনেক ছোটো খাটো ধর্মীয় গোষ্ঠি মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্ব ফোরামে স্থান করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। চার্চে মিডিয়া তখন কেনো নীরব থাকবে? এদেশের খ্রিস্টভক্তগণ এখানো গির্জায় আসেন, ফাদারের উপদেশ শুনেন। মিডিয়াতে যদি খ্রিস্টের বাণী বা আদর্শিক বিষয় প্রচার করা হয় তবে মানুষ তা শুনবেন। তবে মিডিয়া বলতে শুধু রেডিও টেলিভিশন বা সংবাদপত্রই নয়। নাটক, নাচ, গান-বাজনা, পালা-পর্বের মতো অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলো এদেশের মানুষের রক্তের মধ্যে মিশে আছে। চার্চের পালকীয় কাজ ও বাণী প্রচারের জন্য মিডিয়ার এ ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করতে হবে। যেভাবেই হোক জনগণ আজকে মিডিয়া অরিয়েন্টেড হয়ে গেছে। চার্চ এই সুযোকটা নিতে পারে।

বিডিসিএন :-বর্তমানে মিডিয়া জগতে যুগান্তকারি বিপ্লব ঘটে গেছে। নানা রকম সম্পচারের ভিড়ে রেডিওর ভবিষ্যৎ কেমন হবে বলে আপনার মনে হয়।

ফাদার সুনীল:- যখন ঘরে বসে ভিডিও ক্যাসেটের মাধ্যমে সিনেমা দেখার সুযোগ এলো, ক্যাবল টেলিভিশন এলো, ডিস লাইন হলো- তখন অনেকে ভেবেছিলেন এই বুঝি রেডিওর ভূমিকা গেলো। কিন্তু বাস্তবে কী হলো? যেখানে একসময় শুধু মাত্র বাংলাদেশ বেতার ছিলো, এখন বাংলাদেশে মোট ১৮টি প্রাইভেট এফ.এম/কমিউনিটি স্টেশন হয়ে গেলো। বাংলাদেশ টেলিভিশনের পাশাপাশি আরো গড়ে উঠলো ২৩টি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল। তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ব সংবাদ শোনার ক্ষেত্রে রেডিওর বিকল্প আজো হয়নি। মাঠের আইলে রেডিও রেখে আজো কৃষক মাঠে কাজ করে। রেডিও বহন করা সহজ। দামে সস্তা। তাই বলতে চাই রেডিওর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই।

বিডিসিএন :- এবার আপনার কাজের বিষয় একটু জানতে চাইবো। আপনি রেডিও জ্যোতি প্রায় একাই চালাচ্ছেন। তারপর স্কুলের প্রিন্সিপাল, ধর্মপল্লীর দায়িত্ব, এছাড়া বিডি খ্রিস্টান নিউজ, সাপ্তাহিক প্রতিবেশী সহ আরো কয়েকটি পত্রিকার নিয়মিত কলামিস্ট। কী করে সময় বের করেন?

ফাদার সুনীল :- সবাই জানে রাত আটটার পরে আমাকে পাওয়া যাবে না। তবে রাত আড়াইটার পর পাওয়া যাবে। ঐ সময়টা আমার কাজের সময়।  ভোর ছয়টা থেকে থাকে ব্যক্তিগত প্রার্থনা এবং মিসার সময়। দুপূরে ঘুমানোর অভ্যাস নেই। তখন পড়াশোনা করি। বিকাল  চারটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত রের্কডিং টাইম। পরে সন্ধ্যার দিকে একটু হারমোনিয়াম বা তানপুরা নিয়ে বসি। দিনের সময়টা আমাকে ট্রিক্টলি ফলো করতে হয়। নতুবা কর্মসূচি এলামেলো হয়ে যায় এবং রুটিন ফিরিয়ে আনতে খুব বেগ পেতে হয়। ইচ্ছা এবং আগ্রহ থাকলে সবই করা যায়।

বিডিসিএন :- ফাদার সুনীল, আমি অনেকক্ষণ ধরে আপনাকে এটা সেটা জিজ্ঞেস করছি। এবার নিজের থেকে কিছু বলুন।

ফাদার সুনীল:- প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখ বিশ্ব বেতার দিবস পালিত হয়। এবারের মূল ছিলো  Dialogue, Tolerance and Peace  অর্থাৎ সংলাপ, সহনশীলতা এবং শান্তি। আমি দীর্ঘ সময় ধরে রেডিওতে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশ এবং ভারতের আনাচে কানাচে ঘুরেছি। আমার বেশিরভাগ শ্রোতা মুসলিম এবং হিন্দু। আমাদের মধ্যে রেডিওকে ঘিরে যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে সংলাপ, সহনশীলতা এবং শান্তি তা আজো অটুট রয়েছে। একজন রেডিও DX (Distance Xtreme)-er  হিসেবে তাই আমি গর্বিত। আমি এই লাইনে আমাদের ছেলে মেয়েদের আসার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। আমার ধারণা চার্চ সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছে।

বিডিসিএন :- ফাদার সুনীল রোজারিও- সময় নিয়ে এই সুন্দর সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য অনলাইন পত্রিকা বিডি খ্রিস্টান নিউজ এবং পাঠকদের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। এই মিডিয়াতে আপনার কর্মজীবন আরো দীর্ঘ হোক। শুভ কামনা রইলো রেডিও জ্যোতির।

ফাদার সুনীল :- বিডিসিএন-এর পক্ষ থেকে এই সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ সেই সাথে ধন্যবাদ জানাই পত্রিকার পাঠকবর্গদের। সবাইকে শুভেচ্ছা।