ছোট খাটো বিষয় – ৩০

আলো ডি’রোজারিও:

 ১। সেই রোববারের ভোরে ঘুম হ’তে জেগে প্রাতঃক্রিয়াদি সেরে প্রস্তুত হয়ে ফার্মগেইটে গিয়ে যখন বাসে উঠে বসলাম তখন বাজে সাড়ে ছয়টা। আবদুল্লাহপুর যেতে যেতে বাস বেশ কয়েকবার থামল, যাত্রী উঠা-নামার জন্যে। অল্প বয়সী বাস হেলপার নেমে যাওয়া যাত্রীদের বার বার পরামর্শ দিচ্ছিলেন, বাম পা আগে দিয়ে নামাবার। যারা বাসে উঠছিলেন তাদের জন্যে তার কোন পরামর্শ ছিল না, মনে প্রশ্ন জাগল, তাই তো যারা বাসে উঠবেন তাদের জন্যে পরামর্শ নেই কেন? যাত্রীরা কী ডান পা আগে দিয়ে উঠবেন? না বাম পা? ইতোমধ্যে বাস আবদুল্লাহপুর এসে যাওয়ায় আমার প্রশ্নটা পরবর্তীতে করা যাবে ভেবে নেমে পড়লাম। বাস ভাড়া দিলাম ২৫ টাকা।

২। রাস্তা পার হয়ে লেগুনাতে চড়ে বসলাম উলুখোলার উদ্দেশে। লেগুনার ক্যাপাসিটি ১৪ জনের, আমি ছিলাম আনলাকি ১৩ নম্বরে। পরে আরো একজন উঠলেন সহসাই। লেগুনা ছেড়ে দিল। বেশ খুশী হলাম, অপেক্ষায় সময় নষ্ট হ’ল না দেখে। পথিমধ্যে প্রায় সকলেই চুপচাপ, ঘুম-ঘুম ভাব, এত চুপচাপ আমার ভাল লাগে না। কিছুটা রাস্তা চলার পর এক তরুণ কথা বলা শুরু করলেন, পাশে বসা তরুণীর সাথে, অনুচ্চ স্বরে। ভেসে আসা টুকরো কথায় বুঝলাম তাদের আলাপের বিষয় চলমান এসএসসি পরীক্ষা। মনে হ’ল তারা ভাই-বোন, ভাই বড় তাই জানেন বেশী, বলছেনও বেশী, বোন অবাক হয়ে শুনছেন। মনে মনে হয়ত বলছেন, আমার ভাই সব জানেন! উলুখোলামুখী যানবাহন কম থাকাতে আমরা এগুচ্ছিলাম বেশ দ্রুতগতিতেই। এর মধ্যে এক যাত্রী নামবেন আর তাই তিনি বললেন, সচিবের বাড়ীর কাছে নামিয়ে দিতে। বুঝলাম উলুখোলার কাছাকাছি চলে এসেছি। কোনো এক সচিব এদিকটায় বাড়ী করেছেন, শুনেছি। আজকাল সচিবরা শহরের আশেপাশেও বাড়ী করা শুরু করেছেন। সম্ভবত: মাধ্যে-মধ্যে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন নিয়ে এসে শহরের ব্যস্ত সময় ও কোলাহল হতে কিছু সময়ের জন্যে হলেও মুক্তি পেতে। এক সপ্তাহ আগে ভাদুন গিয়ে শুনি, সেখানেও একজন সচিব বাড়ি করেছেন। আমার এক বন্ধু একবার কথায় কথায় বলেছিল: বাড়ীর আশেপাশে সচিবরা থাকলে ভাল, বিপদে-আপদে প্রতিকার পেতে সহজ হয়। তাদের ক্ষমতা অনেক যে। আর তাই তারা তিন সচিবের কাছে কিছুটা কম মূল্যে জমি বিক্রি করেছে। কৌশলটা মন্দ না। ইতিমধ্যে লেগুনা উলুখোলা পৌঁছে যাওয়াতে ২৫ টাকা ভাড়া মিটিয়ে বড় পাকা রাস্তা পার হয়ে বাজারের ভেতর দিয়ে হাঁটা দিলাম। লেগুনাতে কোন হেলপার ছিল না, তাই কোন পরামর্শ আমরা যাত্রীরা পেলাম না । এই কথা ভাবা শেষ হতে না হতেই উলুখোলা বাজার পার হয়ে এলাম। অপেক্ষমান এক ইজিবাইকে উঠে বসলাম, চালকের আহ্বানে নাগরী যেতে।

৩। চালকের বাড়ী পাঞ্জোরায়, তাই সেই গ্রামের অনেকের খবর নেয়া গেল, যারা আমার সাথে ১৯৭৩ সনে নাগরী সেন্ট নিকোলাস উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। চালক ছাড়া শেয়ারের যাত্রীর সাথেও কথা হল, তিনি চানখোলা যাচ্ছেন, আর আমার শেষ গন্তব্য দড়িপাড়া। নাগরী পৌঁছাবার পর ইজিবাইকটির চালক তিন রাস্তার একদম মধ্যেখানে থামিয়ে আমাদের নামানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন দেখে পাশে অপেক্ষমান এক ইজিবাইক চালক বললেন: পাগল ছাড়া কেউ কী কখনো এমন জায়গায় কিছু থামায়?

-কি বললি, আমি পাগল? আরে আমি পাগল হলে তুই কী? তুই … (একটি গালি, গালিটি এখানে লেখা গেল না!)

-আমাকে তুই গালি দিলি ক্যান?

-দিছি, কী করবি তুই?

-দেখবি? কী করি … এই বলে দৌঁড়ে হাত তুলে মারতে আসে, আর আমাদের চালকও নেমে প্রস্তুতি নেয়, প্রতিরোধের। তাকিয়ে দেখি, তারা তো দু’জনেই বেশ সিরিয়াস, সত্যিই মারামারি করবে। এই ব্যাপারখানা যারা উপভোগ করছিলেন তারা আমার উদ্যোগে এগিয়ে এলেন, অর্থাৎ আমি কথা বলছি দেখে তারাও কথা বললেন, তাদেরকে মারামারি করা হতে নিবৃত্ত করা গেল। একটা ভাল কাজ করছি ভেবে মনটা আরো ভালো হয়ে গেল। আগে থেকেই মন ভালো ছিল, নিজ এলাকার কাছে এসেছি তো। অটোরিক্সা চালক পনের টাকা ভাড়া নিলেন, কী জানি কম নিলেন কীনা। যা চাইলেন তা-ই দিলাম। বেশ ভালো মন নিয়ে স্থির করলাম, হেঁটেই আজ দড়িপাড়া যাব। অনেকদিন এই রাস্তায় হেঁটে যাইনি যে। শেষ কবে হেঁটেছি রীতিমত গবেষণা করে বের করতে হবে। সময় তখন আটটার কয়েক মিনিট বেশী, মোবাইলে দেখে নিলাম।

৪। পরিচিত কেউ দেখে যেন না ফেলে তাই তাড়াতাড়ি হাঁটা দিলাম। দেখে ফেললেই বিপদ, বাড়ীতে যাবার জন্যে বার বার বলতে থাকবেন। বার বার বললে আমি আবার না করতে পারি না, কারণ যদি না যাই, তবে মনে কষ্ট পাবেন। খুব অল্প সময়েই চলে এলাম ‘বড় ভাই’ সুজিত নিকোলাসদের বাড়ীর কাছে, ওদের বাড়ীর কাছে এসে একটু গতি কমালাম, ভাবলাম বাড়ী আছেন কী না, পরক্ষণে মনে হ’ল নিশ্চয় গির্জায় গেছেন, বোরবার তো। পথিমধ্যে দু’চারজনের সাথে দেখা হয়েছে, যারা পায়ে হেঁটে গির্জায় যাচ্ছেন। একটু আগে সুজিত নিকোলাসকে ‘বড় ভাই’ বললাম কারণ নাগরী সেন্ট নিকোলাস উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি আমার এক ব্যাচ আগে পড়েছেন, তিনি তার ক্লাশে বিজ্ঞান বিভাগের ‘ফাস্ট বয়’ ছিলেন। পরবর্তীতে আমরা কারিতাসে সহকর্মী হই আর অভিন্ন নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে মাঝে-মধ্যে বিড়ম্বনায়ও পড়ি। এতসব চিন্তা শেষ না করতেই চলে এলাম ছাইতান গ্রামে ঢোকবার বা বের হবার মোড়ে, সেখানে দেখি অনেকজন দাঁড়িয়ে, রাস্তার দু’পাশেই। তাদের সকলের গন্তব্য রোববারের খ্রিস্টযাগে যোগ দিতে, নাগরী গির্জাতে। তারা আছেন যানবাহনের অপেক্ষায়, কোন যানবাহনই সেখানে নেই, আসবে আসবে আশায় তারা সব দাঁড়িয়ে। আমার মনে পড়ল, এই রাস্তা ধরে হেঁটে নাগরী স্কুলে  যাবার কথা। আমরা অবশ্য মাধবনগর পার হয়ে তিরিয়া গ্রামের মধ্যিখানের রাস্তা ধরেই বেশী গিয়েছি স্কুলে, সেই রাস্তা কী এখনো চলমান? জানা নেই। স্বাধীনতার পর পর সেই সময়ের রাস্তা আর এখনকার রাস্তা, কতই না ফারাক! সুন্দর সুন্দর রাস্তা পেয়ে আমরা প্রায় সকলেই এখন হাঁটি কম।

৫। বাসা হতে বের হবার আগে তিনটে বিস্কুট ও দু’গ্লাস পানি খেয়েছি। ফলে যা হবার তাই হল, পেশাবের বেগ পেল, কোন চিন্তা না করেই দারকাভাঙ্গার কাছটাতে পাকা রাস্তা হতে নেমে গেলাম সুবিধাজনক স্থানে, কাজ সারলাম নির্বিঘ্নে। যে জায়গায় নামলাম রাস্তা হতে, সেখানে বছরে কমপক্ষে চার মাস গোদারা লাগত পার হতে, বাকী সময়ে যাওয়া যেত বাঁশের সাকোঁ ধরে। তখন এসব জায়গা ছিল খোলামেলা, গাছপালা তেমন ছিলই না, এখন তো গভীর জংগলের ন্যায়। ভয় ভয় করে দিনের বেলাতেই। দারকাভাঙ্গার বাজার হতে বামের ছোট রাস্তায় পা দিয়ে ফোন করলাম গ্রামের কয়েকজনকে, কেউ ফোন ধরলেন না, এমনকি মিলন দাদাও না। কী আর করা, সোজা হাঁটা দিলাম দড়িপাড়ার দিকে। কিছুটা এগিয়ে যাবার পর দেখি হাতের ডানে দেয়ালে ঘেরা সুন্দর জায়গা, সামনে চিলতে বাগানের কাজ প্রায় শেষ, মাটি ভরাট শেষে বিল্ডিং উঁকি দিচেছ দেয়াল ছাপিয়ে, কাজ হচ্ছে খুবই দ্রুত, কারা করছেন এসব? অনতিদূরে আমাদের বোরো খেতের জমি, কেউ একজন বর্গা করেন, আমার মা জানেন ভাল। দু’টো যুবক বয়সী ছেলে আসছে দেখে জানতে চাইলাম:

-এই বাড়ী কারা তৈরী করছেন?

-অবসরপ্রাপÍ আর্মির কেউ, তাদের উত্তর।

-সঠিক কী না পরে জানা যাবে, মিলন দা বলতে পারবেন। দেখতে দেখতে মিলন দার বাড়ী ‘জয়তু ভবন’ পার হলাম। তারপর একে একে বেশ কয়েকটি বাড়ী যা নতুন করা হয়েছে, দড়িপাড়া হতে তারা এসেছেন, সেসব বাড়ী পার হয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় আসতেই শুনতে পেলাম বাজিনার বাজনা, একটানা বেজেই চলেছে, স্বরসতী পূজা উপলক্ষে। পথিমধ্যে একজনকে প্রশ্ন করে জানলাম, পূজার স্থান কুমুদদের বাড়ী। যেতে ইচ্ছে করল খু-উ-ব। কিন্তু কী ভাববে লোকে, তাই গেলাম না। মনে পড়ল, ছোট বেলায় কতনা গিয়েছি, মামার বাড়ী হতে এক দৌঁড়ে, চক পেরিয়ে।

৬। ‘তোমরা আবার জাল ফেল…’ সেই বিখ্যাত মাছ ধরার কাহিনী, বাইবেল হতে পাঠ করছেন দড়িপাড়ার পাল-পুরোহিত শ্রদ্ধেয় ফাদার অমল ডি’ক্রুজ। আমি গির্জার গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর বাইবেল পাঠ শুনলাম। এরপর ক্রুশের চিহ্ন সেরে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম দড়িপাড়া বাজারে বা বাস স্ট্যান্ডে। সেখানে দেখি বেশ কয়েককজন মহিলা, তরুণ-তরুণী ও শিশু দাঁড়িয়ে, কিছু একটা পেলে গির্জায় যাবেন, পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ পার হয়ে। তাদের ভাগ্য ভাল, পর পর দু’টা ইজিবাইক এল। চটজলদি সকলে উঠে পড়লে খুব দ্রুতবেগে সেই দু’টো ইজিবাইক ছুটে গেল গির্জাপানে। আমার বিশ্বাস, তারা সকলে শ্রদ্ধেয় ফাদার অমলের রোববারের উপদেশ প্রায় পুরোটা শুনতে পাবেন। আমিও শুনব রোববারের উপদেশ, বিকেলে, তেজগাঁও গির্জায় গিয়ে। পাকা রাস্তা পার হয়ে থামতে হ’ল প্রশান্ত গমেজের দোকানের সামনে। কুশল বিনিময় শেষে তার প্রশ্ন:

-কাকা সময় হবে? একটা বিষয় আলাপ করার ছিল।

-কী বিষয়? এখনই আলাপ করবা না বাড়ীতে আসবা?

-তুমি যাও, আমি আসছি।

আমি বাড়ী চলে আসার কিছুক্ষণ পর প্রশান্ত এল। আমরা আলাপ করলাম আমাদের গ্রামের জমিজমা নিয়ে, যেসব জমি রেললাইনের উত্তরে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ রেলের প্রয়োজনে সেসব জমি নিয়ে নিবেন, দাম দিবেন দেশের নীতি অনুসারে। জমিজমা দেয়া-নেয়ার ব্যাপারে গ্রামে গ্রামে আলোচনা চলমান। মতামত যাচাই হচ্ছে, একাধিক সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ হচ্ছে। প্রায় সকলেই উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন, কী জানি কী হয়! উৎকন্ঠার বিষয়ই তো। জমি নিবে, ক্ষতিপূরণ দিবে, কিন্তু এরপর কি? জমি কী শুধুই জমি? জমি তো জীবন, জমি যে ঐতিহ্য। জমি দিয়ে দেবার পরবর্তী প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ। আশেপাশের পরিবেশ – প্রাকৃতিক ও সামাজিক উভয়েরই অধোগতি হবে, অবাসযোগ্য হবে এলাকা, অন্য দিককার অভিজ্ঞতা তাই বলে। জনবান্ধব সরকার জনগণের ঐক্যবদ্ধ মতামতকে গুরুত্ব দিবেন, তাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিবেন, সেটাই প্রত্যাশা। প্রশান্তের সাথে আশু করণীয় নিয়ে আলাপ হ’ল। একই আলাপ হ’ল আরো অনেকের সাথে। সকলেই এক বাক্যে বললেনঃ রেলওয়ের জন্যে জমি দিলে, তারা তা সংযোগ রেললাইনসহ আইসিডি (ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো) বানাবে, আমাদের বাপদাদার জমি হারাতে হবে। আমরা আর আশেপাশে বসবাস করতে পারব না। তাই ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের স্বার্থ দেখতে হবে, নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এগিয়ে যেতে হবে।

৭। সেই রোববারে কী যে একটা ভাল মন নিয়ে বাড়ী গেলাম, আর ফিরলাম বিষণ্ন মনে, প্রার্থনা করতে করতে, আমাদের জন্যে যা ভাল তা যেন আমরা সকলে বুঝতে পারি, হাতে হাত রেখে চলতে পারি। হে দয়াময় প্রভু, আমাদের সঠিক পথে চলতে আলো ও সাহস দাও।

লেখক: ড. বেনেডিক্ট আলো ডি’রোজারিও, সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কারিতাস বাংলাদেশ

ছোট খাটো বিষয় – ২৯