ছোট খাটো বিষয় – ২৯

আলো ডি’রোজারিও:

১। তিন বছর ধরে কারাবন্দি নিরপরাধ পাটকল শ্রমিক জাহালম অবশেষে গত ৩রা মার্চ ২০১৯ তারিখে রাত একটার দিকে কাশিপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। সোনালী ব্যাংকের সাড়ে ১৮ কোটি টাকার আত্ম-সাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় বন্দী ছিলেন তিনি। এর আগেও বিনা বিচারে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রাখার খবর আমরা পড়েছি বিভিন্ন পত্রিকায়। কোন কোন ক্ষেত্রে মানবাধিকার সংস্থার উদ্যোগের ফলে তাদের কেউ কেউ কখনো কখনো ছাড়াও পেয়েছেন, সে খবরও পড়েছি পত্রিকায়। নানা কারণেই  সেসব অন্যায় ঘটনা ঘটেছে, আর খুব কম সংখ্যাকই সেসব অন্যায়ের পতিকার পেয়েছেন। অন্যায়ের প্রতিকার সংস্কৃতির অভাবে একই ধরনের অন্যায় বার বার ঘটতে থাকে। ভবিষ্যতেও ঘটবে হয়ত।

২। টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুরের জাহালমকে বিনা অপারাধে আটকে রাখা ও তার মুক্তির ঘটনা দেশব্যাপী বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কারণ এই ক্ষেত্রে ভুল করেছে দুদক। সেজন্য মহামান্য আদলত বিরল এক আদেশে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দেন, এই আদেশের পর আইনি পক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে মুক্তি দেন কারা কর্তৃপক্ষ। জাহালমের মুক্তির আদেশের পাশাপাশি উচ্চ আদালত বলেন, ‘কোন নির্দোষ ব্যক্তিকে এক মিনিটও কারাগারে রাখার পক্ষে আমরা নই। এই ‘ভুল তদন্তে’ কোন সিন্ডিকেট জড়িত কী না, সিন্ডিকেট থাকলে কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা চিহ্নিত করে আদালতকে জানাতে হবে। তা না হলে আদালত এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে’। এখন দেশবাসীর দেখার অপেক্ষা কতদিনে তদন্ত শেষ হয়, তদন্তে কারা দায়ী  বলে চিহ্নিত হয়, দায়ী ব্যক্তিগণ কীরূপ সাজা পান। এখানে উল্লেখ্য, জাহালমকে ক্ষতিপূরণ দেবার ব্যাপারে বিভিন্ন সংস্থার ও ব্যক্তি ইতিমধ্যেই সোচ্চার হয়েছেন, ক্ষতিপূরণ দেবার দাবী ক্রমশ জোরদার হচ্ছে, এটা আমাদের সমাজেরই একটি ইতিবাচক দিক, নিসন্দেহে।

৩। আইন-আদালত ও কোট-কাচারী সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এতই কম যে এই বিষয়ে লেখার মতোন মাল-মশল্লা আমার তেমন নেই। তবুও যা আছে তা লিখতে দোষ কী। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ইংল্যান্ড হতে ঢাকা ফেরার  দু’দিন পরে থানা হতে লোক এসে জানালেন পরদিন কোর্টে হাজিরা দিতে হবে, হাজিরা দিয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে, আদালত অবমামনার দায়ে আমার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না। বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারলাম না, যে এই খবর দিতে থানা থেকে আসলেন তিনিও আমাকে পুরোপুরি বুঝাতে পারলেন না। আমি শ্রদ্ধেয় এডভোকেট সিরিলি সিকদারকে ফোন দিলাম, তিনি তখন সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী। তাঁর পরামর্শে থানা হতে আগত ব্যক্তিটিকে নিয়ে তাঁর চেম্বারে গেলাম, চেম্বারে যাবার পর এদিক সেদিক ফোন-টোন করে রেফারেন্স খাঁটাখাঁটি করে তিনি বের করলেন পুরো কাহিনী যা কয়েকবছর আগেকার। তেজগাঁও থানার সামনে এক দুর্ঘটনায় আমার এক ভাগিনা গুরুতর আহত হলে থানার পুলিশের পরামর্শে আমি আমার নিজ হাতের লেখায় একটি সাধারণ আবেদনপত্র জমা দেই। সেই সূত্রে কয়েকবার আমাকে কোর্টে উপস্থিত হতে নির্দেশ দেন মহামান্য আদালত। সেই নির্দেশনামার একটিও কোনদিন আমাদের হাতে পৌঁছেনি কোন এক অজ্ঞাত কারণে। যাই হোক নির্ধারিত দিনে আমাকে আমার ভাগিনাসহ কোর্টে হাজির হয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ব্যাখ্যা করতে হ’ল কেন আমি আগের তারিখগুলোতে কোর্টে হাজির হতে পারিনি। আমি জানাই, প্রধান কারণ আমরা কোন নোটিশ পাইনি, দ্বিতীয় কারণ আমি বিগত প্রায় দেড় বছর যাবৎ ইংল্যান্ডে ছিলাম। সেই প্রথমবার আমার কোর্টে যাওয়া। আইনজীবী ব্যতিরিকে নিজেই নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করা। অবশ্য শ্রদ্ধেয় এডভোটেক সিরিল সিকদার আমাকে আগেভাগেই শিখিয়ে দিয়েছিলেন কীভাবে কী কী বলতে হবে। আমার কোন সাজা হয়নি, এমনি এমনি ছাড়া পেলাম। আর ভাগিনার দুর্ঘটনার বিষয়ে অভিযোগের কোন কিছু কখনো হয়েছে বলে জানা নেই।

৪। দ্বিতীয়বারে কোর্টে যাবার প্রয়োজন হয়েছিল গত বছর অর্থ্যাৎ ২০১৮ সনে। আমাদের ১৮জনের বিরুদ্ধে ফৌজধারার কার্যবিধি ১০৭ ধারায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়। দরখাস্তকারী যেই যেই দিনে আমাদের দ্বারা হুমকি বা শাস্তি ভংগের আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন তার দরখাস্তে সেসব দিনে/সপ্তাহে আমি ছিলাম বিদেশে অবস্থানরত। আবার কারিতাসের যে জমি কেনার ঘটনাতে এই অভিযোগ তাতে আমি কোনরূপ জড়িত ছিলাম না কারণ ঐ সময়কালে আমি পিএইচডি এর পড়াশুনার জন্যে ইংল্যান্ডে ছিলাম। উপরন্ত, আমি তখন কর্মরত ছিলাম কারিতাসের প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটে, আর জমি ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখাশুনা করে কারিতাসের প্রধান অফিসের প্রশাসনিক বিভাগ। যাহোক এসব বিষয় বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে মহামান্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে অবহিত করা হয়। বাকীরাও তাদের অবস্থান ও পরিস্থিতি অবহিত করেন। সবকিছু জেনে ও শুনে বিজ্ঞ আদালত শর্তাধীনে মামলাটি খারিজ করে দেন। আঠার জনের মধ্যে আমাদের দুইজনকে দুইবার কোর্টে যেতে হয়, বাকীরা একদিনেই কোর্টের কাজ শেষ করতে পারেন। কারণ আমরা দু’জন প্রথম দিন অন্য জরুরী কাজ থাকাতে চলে এসেছিলাম মহামান্য আদালতে হাজির পূর্বক ব্যাখ্যা না দিয়ে।

৫। যেকোন সমাজে ভাল মানুষের সংখ্যাই বেশী। সমাজে যারা বিঘ্ন ঘটায়, অশান্তি আনে, চাঁদাবাজি করে, বিচারকাজ সঠিকভাবে করতে বাধা দেয়, নিরীহদের নির্যাতন করে, সন্ত্রাসে  জড়িত হয়, তাদের সংখ্যা খুবই কম। যারা ভাল তারা যদি সোচ্চার হয় বা একতাবদ্ধ হয় তবে বাকীরা দুর্বল হতে পরতে বাধ্য। এই প্রসঙ্গে নেপোলিয়ানের একটি উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে, এই বিশ্বে দুঃখ-কষ্ট অনেক। এর কারণ মন্দ মানুষের সহিংসতা যত না, তার চেয়ে বেশী ভাল মানুষের নীরবতা। সকল ভাল মানুষ যদি একত্রিত হয়ে সরব হয়, পৃথিবী পাল্টে যাবে দ্রুত, ভালো ও আলোর দিকে। আমাদের দেশে মহামান্য আদালত ও এর বিচারকগণ খুবই প্রশংসনীয় কাজ করছেন, স্বপ্রণোদিত হয়ে, জনস্বার্থে নোটিশ ও রায় দিয়ে। তাঁদের কাজের লক্ষ্য ব্যক্তি কল্যাণ, সমাজ কল্যাণ ও দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা। আসুন তাঁদের কাজে আমরা সর্বতোভাবে সহায়তা করি। আর যেসব কাজে মানুষ অযথা হয়রানী হয়, বিচার কাজে বিঘ্ন ঘটে, মানুষের জীবনে শুধু শুধু দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগ নেমে আসে সেসব কাজ হতে দূরে থাকি।

লেখক: ড. বেনেডিক্ট আলো ডি’রোজারিও, সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কারিতাস বাংলাদেশ

আরো পড়ুন: ছোট খাটো বিষয় ২৮