ছোট খাটো বিষয় ২৭

আলো ডি’রোজারিও:
১। আমি তিনটি কলাম লিখতে শুরু করে এখনো এই ‘ছোট খাটো বিষয়’ কলামটি অনিয়মিত হলেও অব্যাহত রেখেছি। অন্য দু’টি কলামের একটি বন্ধ করেছি সম্পাদকের কাছে রেখে আসা আমার একটি লেখা হারিয়ে ফেলার কারণে, আর অন্যটি বন্ধ করেছি সম্পাদক সম্মাদনায় খুব বেশী মনোযোগ দিচ্ছেন না দেখে। উভয় ক্ষেত্রে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা সম্পাদকের কারণে। তো আমার ছোট ভাই প্রদীপ মার্সেল রোজারিও আমার অন্য দু’টি কলাম বন্ধ করার কারণ জানতে পেরে একদিন আমাকে বলল: ‘দাদা, পাঠকরা তো কোন দোষ করেনি, সম্পাদকের কারণে পাঠকরা বঞ্চিত হবে কেন’? তাই তো, ভেবে দেখলাম, সম্পাদকের কারণে পাঠকদের বঞ্চিত করা তো আমার ঠিক হচ্ছে না। আমি আবার লিখব, ২০১৯ সন হতে।
২। আমার মা সন্ধেবেলায় ভারতীয় সিরিয়াল দেখে এক নাগাড়ে এক কি দেড় ঘন্টা। ভারতীয় সিরিয়াল আমি নিজে কখনো দেখি না, আমার বাসাতে অন্য কেউ দেখে না। মা’র এই অভ্যাস যে কীভাবে হ’ল, আমি তাতে চরম বিরক্ত। আমার এই বিরক্তির কথা বাসায় অনেকে জানে, জেনেও চুপ থাকে, মা’র সিরিয়াল দেখা চলতে থাকে। আমি চাই, মা এইসব সিরিয়াল না দেখে অন্য আরো কিছু দেখুক। একদিন এই সিরিয়াল দেখা নিয়ে আলাপ চলাকালে আমাদের বুয়েটে পড়া ছেলে সাম্য অর্কিড বলল: ‘ঠাকুর মা সারাদিনের এই এক বা দেড় ঘন্টার বিনোদন তুমি বন্ধ করো না, তাকে দেখতে দাও, তার মতোন। আমাদের তো কত রকমের বিনোদন আছে, ঘরে ও বাইরে, তার তো তা নেই’। সত্যিই তো, আমি ভেবে দেখলাম, প্রথমবারের মতোন, আমাদের ছেলের বলার পর। ঠিক করেছি, ২০১৯ সনে মা’র ভারতীয় সিরিয়াল দেখা নিয়ে আর কিছু বলব না, দেখতে দিব তার মতোন।
৩। ২০১৮ সনে ২০১৯ সনের জন্যে দু’টি করণীয় বিষয় ঠিক করেছি, এরই মধ্যে যা এই কলামের পাঠকরা জেনে গেলেন। আরো ঠিক করব বছর পার হয়ে যাবার আগে আগে। আপনারাও নিশ্চয় নতুন বছরের জন্যে নতুন করণীয় ঠিক করবেন, তাই না? ঐদিন কোথায় জানি পড়লাম: সব সময়ই একটা বড় ফারাক থাকে নতুন বছরে করব বলে নেয়া পদক্ষেপ বা করণীয় বিষয়গুলোর সাথে প্রকৃতপক্ষে অর্জন করা বিষয়ের। আসলে আমরা নতুন বছরের করণীয় ঠিক করেই চুপ মেরে যাই, নিজের কাছে নিজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকি না তা বাস্তবায়ন করতে, মাঝে-মধ্যে পেছন ফিরে দেখি না যা করব বলে স্থির করেছিলাম তা কতুটুকু করতে পারলাম, না পারলে কেনই বা পারলাম না, পারার জন্যে কী কী করতে হ’ত। নিজের কাছে নিজে অঙ্গীকারবদ্ধ হলে একনিষ্ঠভাবে নিজেই তার দায়িত্ব নিতে হবে।
৪। গত বছরে আমার একটি অঙ্গীকার ছিল মদসহ মাদকদ্রব্য ব্যবহারে ব্যক্তিগতভাবে সচেতনতামূলক কাজ করব ও অন্যদেরও উৎসাহিত করব। সেই অঙ্গীকার রক্ষায় চেষ্টা চালাতে গিয়ে কখনো পুরোপুরি সফল হয়েছি, কখনো হয়েছি আংশিক। ২০১৮ সনে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা মদ্যপান সীমিত রাখব ও অনুষ্ঠান চলাকালে কোন মদ্যপান করব না, বর পক্ষ ও কণে পক্ষ, আমার উদ্যোগে ও সকলের মতামতে তা স্থির করা হয়। খুব সুন্দর মন নিয়ে ও আন্তরিকতার সাথে তা মেনে চলে বিয়েটা সারা সম্ভব হয়।
একই সনে অন্য আর একটি বিয়েতে অনুরূপ আলোচনা ও ঐক্যমত হওয়া সাত্ত্বেও সার্বিক পরিবেশ সুন্দর রাখা সম্ভব হয়নি। অনুষ্ঠান চলাকালে অতিথিরা নিজ উদ্যোগে মদ সংগ্রহ করেন, এমন কী মদ তাদের নিজের পয়সাতেই কিনে আনেন, মদ খেয়ে পরিবেশ নষ্ট করেন, আমার হাত হতে মাইক কেড়ে নেন, আমাদের সিদ্ধান্তের বিপরীতে কাজ করতে চেষ্টা করেন। এমন কী সেই অতিথিদের একজন মদ্যপ অবস্থায় অন্যান্যদের সামনে আমার কাছে জানতে চান: আমি এত অসামাজিক কেন? কেন আমি মদ খেতে বারণ করেছি, কেন শর্ত দিয়েছি বরের বাবাকে? খ্রিস্টান পরিবারের বিয়ে মদ ছাড়া কী কখনো হতে আমি দেখেছি? এই ধরনের আরো অনেক প্রশ্ন। আমি তাকে বুঝাতেই পারলাম না যে, আমি একা কোন সিদ্ধান্ত নেইনি। আমরা উভয় পক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মদ্যপান সীমিত রাখতে এবং অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে মদ প্রাপ্ত বয়স্কদের পরিবেশন করতে। তিনি আমার ব্যাখ্যা বুঝতে ও মানতে নারাজ, তাই জানতে চাইলেন তাদের মদ্যপান হতে বঞ্চিত করবার অধিকার আমাকে কে দিয়েছে? এই কঠিক প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি আর চেষ্টা করিনি।
৫। মদ্যপানের বিরোধিতা করে বেশ কয়েকবার লেখাতে আমার ওপর বিরক্ত হয়ে এক লেখক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
: আপনি আমাদের বিরুদ্ধে এতটা লেগেছেন কেন?
: কই নাতো, কীভাবে?
: আরে মাদের বিরুদ্ধে লাগা আর আমাদের বিরুদ্ধে লাগা তো একই কথা…।
: তাই কী?
: দেখেন, আমি মদ খাই, সিগারেট খাই, আরো অনেক কিছুই খাই, অনেক বছর ধরে খাই, তা-ও অনেকের চেয়ে ভাল আছি, আরো ভাল থাকব, আরো অনেকদিন…!
: তাই বুঝি?
গত বছর বিডিখ্রিস্টাননিউজ এর উপদেষ্টা পরিষদের সভাশেষে চলা এই আলাপ আমাদের চলল বেশ অনেকক্ষণ, কখনো হলকা রসে, কখনো আবার সিরিয়াস ভাবে। এই আলাপের কয়েক মাস পরেই ঐ লেখক হঠাৎ করেই মারা গেলেন। কিন্তু তার বলা কথাগুলো আমাকে এখনো তাড়া করে। ভাবায়।
৬। আমরা শিখতে পারি অনেক কিছুই প্রতিদিন যেকোন মানুষের কাছ হতেই, কী ছোট, কী বড়। আমরা করতে পারি অনেক কিছুই, নিজের জন্যে, পরিবারের জন্যে, সমাজের জন্যে ও দেশের জন্যে। অনেক কাজ যেমন অন্যের প্রতি ভাল ব্যবহার করা, পয়সা লাগে না। ভাল ব্যবহার দিয়ে অনেক কিছু অর্জন করা সম্ভব যা নাকি বুদ্ধি দিয়েও অর্জন করা যায় না। মাথায় অনেক বুদ্ধি থাকার চেয়ে হৃদয়ে অনেক ভালাবাসা থাকা ঢের ভাল। হৃদয়ের ভালবাসা মানুষকে ভাল ব্যবহার করতে শেখায়। আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে অনেক ভালবাসা জমা হয়ে আছে, যা দিতে থাকলে আরো বেড়ে যাবে। ২০১৯ সনে আমরা নিজেকে, নিজের পরিবারকে ও সমাজকে দেশকে আরো বেশী ভাল বাসব।
লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কারিতাস বাংলাদেশ
আরো পড়ুন: ছোট খাটো বিয়ষ- ২৬