রিমেলের বড়দিন


 প্রদীপ মার্সেল রোজারিও:

চার দিন পর বড়দিন। মাস শেষ না হলে বেতন হবে না। বড়দিনের আগে নিদেন পক্ষে বোনাসটা পাওয়া গেলেও হতো। কিন্তু সেরকম কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সকালে অফিসে পৌঁছে রিমেল হিসাব বিভাগে যায় বোনাসের বিষয়ে কথা বলতে। হিসাব বিভাগ সাফ জানিয়ে দেয়- বড়দিনের বোনাস দেয়ার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কোন নির্দেশনা নেই। রিমেল ইচ্ছে করলে সরাসরি বস্-এর সাথে কথা বলতে পারে।

চাকুরীতে যোগদান করার পর রিমেল কোনদিন বস্-এর রুমে যায়নি। অফিসে রিমেলের যে অবস্থান তাতে ও’র বস্-এর ‍রুমে যাওয়া দরকার হয় না। কিন্তু আজ ও’ যাবে।  বোনাসটা ও’র খুব দরকার। হাতে শুধুমাত্র ডিসেম্বর মাসের ব্যয় মেটানোর মতো টাকা আছে। কিন্তু বড়দিনের জন্য কিছু বাড়তি খরচ তো করতেই হয়। বাড়িতে মা ও বোন অপেক্ষায় আছে। মা ও বোনের মুখের হাসি ছাড়া বড়দিন হয় নাকি?

ভাবতে ভাবতে রিমেল বস্-এর রুমের সামনে দাঁড়ায়।

  • স্যার, আসতে পারি?
  • হ্যাঁ, এসো, কিছু বলবে?
  • স্যার, একটি কথা বলার ছিলো।
  • কি বলবে, সংক্ষেপে বলে ফেলো। প্যাচাবে না। বাঙালির স্বভাব হলো প্যাচানো। প্যাচানো স্বভাবের মানুষ আমার একদন পছন্দ না। আমি সোজা কথার মানুষ।
  • না স্যার, প্যাচাবো না। ইচ্ছা করলেও প্যাচাতে পারবো না, স্যার। ছোট বেলায় আমার টাইফয়েড হয়ে মুখ বেঁকে গিয়েছিলো। তারপর থেকে আমার মুখে  সহজে কথা আসে না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে থেকে যায়। মুখে আসে না।
  • তোমাকে এতো কথা কে বলতে বলেছে? নাকি সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছো। দেখো সহানুভূতি-টহানুভূতি এ অফিসে চলবে না। নির্ধারিত নীতিমালা মেনে এ অফিস চলে। কি বলবে বলো। আমার  জরুরী মিটিং আছে।
  • স্যার, বলছিলাম যে, বড়দিনের আর মাত্র চার দিন বাকি। এখনো বোনাসটা পেলাম না। যদি আমাকে বোনাসটা দিতেন তাহলে…

কথা শেষ করার আগেই বস্ রিমেলের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেনো ও’নার পেছনে কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। কিছুটা সময় নিয়ে কর্কশ কন্ঠে বললেন- এখন কোন বোনাস হবে না। মাস শেষে বেতনের সাথে বোনাস হবে। এইতো ক’দিন মাত্র হলো চাকুরীতে যোগদান করলে। আর এখনই আগাম বোনাসের কথা বলছো? কমনসেন্স নেই? এক কথা বার বার বলতে পারবো না। শুধু শুধু রিকোয়েষ্ট করে সময় নষ্ট করো না।

খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ছোট্ট একটা মুচকি হাসি দিয়ে বসের রুম থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলো রিমেল। দরোজার কাছে পৌঁছুতেই বস্-এর ডাক শোনে দাঁড়িয়ে গেল ও’। বসকে এখন খুব শান্ত দেখাচ্ছে। রিমেলকে ইশারায় বসতে বললেন।

  • রিমেল একটা বিষয় বুঝতে পারলাম না। অফিসের অন্য স্টাফরা বোনাস অথবা ছুটির জন্য কাকুতি-মিনতি করতে করতে মাথা নষ্ট করে ফেলে। অনুরোধ রাখতে না পারলে চোখের আঁড়ালে আমাকে গালি দেয়। আর তুমি কিছু না বলে মুচকি হাসি দিয়ে চলে যাচ্ছো? তোমার ধৈর্য্য আর সহ্য শক্তি দেখে সত্যিই অবাক হচ্ছি।
  • স্যার, এগুলো আমার অল্প কয়েক বছরের চাকুরী-কালীন সময়কার অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া। আর এ জন্য আমার আগের প্রতিষ্ঠানের বসদের ধন্যবাদ দেবো। কারণ তাঁদের জন্যই আমি আমার ধৈর্য্য এবং সহ্য ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পেরেছি।
  • বস্ ভ্রু কুচকে বললেন- বুঝলাম না রিমেল। বুঝিয়ে বলো।
  • স্যার, আমি আগে যে প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করতার সেখানে সহজে ছুটি পাওয়া যেতো না। নিয়মিত বেতন-বোনাসও হাতে পেতাম না। খুব রাগ হতো। অনেক গালাগাল করতাম। রাগ করে একটি চাকুরী ছেড়েও দিয়েছিলাম। চাকুরী ছেড়ে দেয়ার পর দেখলাম- বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারছি না। বোনটা কলেজে যেতে পারছে না। নিজে খেতে পারছি না। চারিদিক থেকে অভাব শব্দটা গিলে ফেলেছিলো আমাকে। সব প্রতিষ্ঠানে একই অবস্থা। বুঝলাম, সব সুখ এক সাথে পাওয়া যায় না। আমাকে এগুলো সহ্য করেই চাকুরী করতে হবে।
  • তার মানে তুমি আমাকে যাচাই করতে এসেছিলে?
  • রিমেল মুচকি হেসে বললো- ধরে নিন স্যার, এরকমই কিছু।
  • বাহ্ বাহ্… তুমি কি আমার কাছে নিজেকে অসাধারণ ব্যক্তি হিসাবে জাহির করতে চাচ্ছো?

রিমেল নিজেকে একটু গুছিয়ে নিলো। তারপর বললো- স্যার, আমি অসাধারণ কেউ নই। আমিও দশ জনের মতো সাধারণ। আমারও ইচ্ছে করে বড়দিনে ঘুরাঘুরি করার। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার। সারারাত গান-বাজনা করার। বড়দিনে নতুন ড্রেস পরা সুন্দরী ললনাদের দিকে আড় চোখে তাকানোর।  মা’কে বড়দিনে শাড়ি গিফট দেয়া এবং বোনকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছাও হয়, স্যার। সব ইচ্ছেগুলোকে মাটি-চাপা দিয়ে রেখেছি । কারণ সময়ের সাথে সাথে সব পাল্টে গেছে। এখন জানালা দিয়ে রাস্তার মানুষ এবং ফেইসবুকের নিউজফিড দেখে দেখে বড়দিনে সময় কাটাই। বোনটা তো সারাক্ষণ বলে- দাদা, চল্ না একবার সবাই মিলে মার্কেটে যাই। তোর পছন্দ তো দারুণ। দেখিস্ না অন্য সকল ভাই-বোনেরা একসাথে হাত ধরাধরি করে মার্কেটে ঘুরে বেড়ায়। আর তোর তো সময়ই হয় না। আমি বলি, তুই যা। আমার সময় হলে তোর সাথে যাবো। পাগলি বোনটা হয়তো আশা করে আছে। আমি কবে টাকা পাঠাবো। মার্কেটের সবচেয়ে সুন্দর ড্রেসটা ও’ কিনবে। কিন্তু মুখে কিছু বলে না। বোনটাও হয় তো বা মানিয়ে নিতে শিখেছে।

মায়ের শুধু একটিই আবদার। এবার বড়দিনের ছুটিতেই যেন আমি বিয়েটা করে ফেলি। আমি প্রতিবারই বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ছুটির সময়টা পার করি।

বস চুপ হয়ে গেলেন। রুমে ফ্যান চলার শব্দ ছাড়া কোন শব্দ হচ্ছে না। বসের এসি সহ্য হয় না। তাই তিনি এসি চালান না।

বসই নীরবতা ভেঙ্গে রসিকতা করে বললেন- বিয়ে তো করোনি তা প্রেমিকাও নেই নাকি?

  • ছিলো স্যার। তবে দু’টো বড়দিনে ও’কে কিছু দিতে পারিনি। তাই ও’ আর আমার জন্য অপেক্ষা করেনি।

ছোট্ট একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমেল বেরিয়ে এলো বসের রুম থেকে।

বস্ খুব লজ্জা পেলেন। মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিলেন। ভাবতে লাগলেন-আসলেই তো অফিসের ব্যস্ততা আমার আবেগ-ভালোবাসা সব ভুলিয়ে দিয়েছে। অবশ্য আবেগ আসবেই বা কীভাবে? তিনি তো নিজের পরিবারকে হারিয়েছেন অনেক আগেই। তাঁর এখন একাকী জীবন। এ জন্য মেজাজ সব সময় রুক্ষ থাকে।

বসের রুম থেকে এসে নিজের ডেস্কে বসতেই মোবাইলে একটি মেসেজ দেখে রিমেলস্তব্ধ হয়ে গেল। বস্ মেসেজ পাঠিয়েছেন। হিসাব বিভাগ থেকে বোনাস নিয়ে সোজা বাড়িতেযাবে। বড়দিনটা পরিবারের সাথেই কাটাও। আসার সময় অবশ্যই পিঠা নিয়ে আসবে। আমি জানি,তোমাদের এলাকায় বড়দিনে অনেক রকমের পিঠা তৈরী হয়। ফিরে এসে আমার রুমে আসবে না। সবআনন্দ চোখে দেখতে নেই। অনুভব করতে হয়। তোমার আনন্দটা আমি অনুভব করতে চাই। সাবধানেযেও। শুভ হোক তোমার যাত্রা। শুভ হোক তোমার বড়দিন।

এই লেখকের আরো লেখা পড়ুন:

মানুষ মরণশীল

টিউশনি

০০-০০