মানুষ মরণশীল

প্রদীপ মার্সেল রোজারিও:

একটি বাচ্চা ছেলে। কতই বা বয়স। একুশ কিংবা বাইশ। নিমাই মাস্টারের মাথায় গোলমাল পাকিয়ে দিলো। পয়ষট্টি বছরের দীর্ঘ জীবনে এমন বিপদে কখনো পড়েনি নিমাই মাস্টার। বরং তিনিই প্রতিনিয়ত মানুষকে বিপদে ফেলেছেন। ঘটনাটি ঘটেছে সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে। কয়েক দিন যাবৎ নিমাই মাস্টারের মন ভীষণ খারাপ। বড় রাস্তার পাশের একটি জমি তাঁর পছন্দ হয়েছে। বুদ্ধির প্যাচ লাগিয়ে জমিটার উপর দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার বেশ কাছাকাছি পৌঁছেও গিয়েছিলেন নিমাই মাস্টার। কিন্তু বাধ সাধলো সদ্য গজিয়ে উঠা নেতা তুফান হালদার। নিমাই মাস্টার কখনো হারতে চান না। হার তাঁর পছন্দ নয়। জেতার জন্য যা কিছু করা লাগে সবই তিনি করেন। নীতি-নৈতিকতার ধার ধারেন না তিনি। তাই নিমাই মাস্টারকে সহজে কেউ ঘাটায় না। কিন্তু তুফান ঘাটাচ্ছে। হাঁটুর সমান বয়সের ছোকরাটাকে শায়েস্তা করতে হবে। কিভাবে তুফানকে শায়েস্তা করা যায় ভাবছিলেন নিমাই মাস্টার। এমন সময় ছোট নাতি রাজনের আগমন। এসেই বলা নেই কওয়া নেই নিমাই মাস্টারকে জিজ্ঞেস করলো-

দাদু, মানুষ মরণশীল, এ কথাটা চিন্তা করেছো কখনো?

নিমাই মাস্টার বললো- চিন্তা করবো না কেন? এটাতো চিরন্তন সত্য কথা।

বিষয়টা এতো সহজ নয়, দাদু। চিন্তা করো তো, তুমি বালিশে মাথা রেখে শুয়ে আছো। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। জেগে থাকা এবং ঘুমিয়ে থাকার মাঝামাঝি একটি সময়। এ সময় মানুষের মন পবিত্র থাকে। চাইলেও এ সময়টায় মানুষ অন্যের ক্ষতি করার চিন্তা কিংবা কু-মতলব মাথায় আনতে পারে না। ঠিক এ সময়টায় তুমি মনে করো- নিমাই মাস্টার নামে একদিন এ পৃথিবীতে কেউ থাকবে না।

রাজনের কাছ থেকে এ কথা শোনার পর থেকে নিমাই মাস্টার ঘুমোতে পারছে না। বাতি নিভিয়ে বালিশে মাথা রাখলেই তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। একদিন পৃথিবীতে তাঁর অস্তিত্ব থাকবে না। গ্রামের সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে গড়ে তোলা তাঁর অট্টালিকাসম বাড়িটা থাকবে। ভোরে বাড়ির পাশের কদম গাছে প্রতিদিন নাম না জানা পাখির কিচিরমিচির ডাক থাকবে। বাড়ির ফাঁক-ফোঁকরে আশ্রয় নেয়া চড়ুই পাখি বছরের পর বছর বাচ্চা দিয়ে যাবে। মানুষকে ঠকিয়ে দখল করা ভাল ভাল অবস্থানের জমিগুলো থাকবে। জমির ফসল থাকবে। ব্যাংক ব্যালান্স থাকবে। থাকবে না শুধু নিমাই মাস্টার। কোথায় যাবে সে মৃত্যুর পর? স্বর্গে না নরকে? সব তাল-গোল পাকিয়ে যাচ্ছে। ফেলে আসা জীবনের যে সিদ্ধান্তগুলো এতদিন খুব স্বাভাবিক আর যুক্তিসঙ্গত মনে হতো, এখন সব মনে হচ্ছে ভুল।

রাজন তাঁর বিবেকে নাড়া দিয়ে সব এলোমেলো করে দিয়েছে। এতো বছরের জীবনের পুরনো ছন্দ হারিয়ে গেছে। বাতি নিভিয়ে ঘুমোতে গেলেই চোখে ভাসে রাজন তাঁকে মুচকি হেসে উপদেশ দিচ্ছে-দাদু, ভুল ছন্দের উপর ভর করে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলে। শেষ জীবনে সঠিক ছন্দে ফিরে এসো। যাদেরকে ক্ষতি করেছো-মাফ চেয়ে নাও। যতটা সম্ভব ক্ষতিপূরণ দেয়ার চেষ্টা করো, দাদু। সময় কিন্তু খুবই কম। অনুতপ্ত হও। জমি-জমা, টাকা-পয়সার পেছনে ছুটতে গিয়ে তো ধর্মের পথ থেকে সরে এলে। কাজটা কি ঠিক করলা? ধর্মের পথে ফিরে এসো, দাদু। গীর্জায় যাও। পাপ-স্বীকার করো। ক্ষমা পেলেও পেতে পারো। জমি-জমা, টাকা পয়সার লোভে পড়ে মৃত্যুর কথা ভুলে গিয়েছিলে। ধনী-গরীব সকলের জন্যই মৃত্যু অনিবার্য্য, দাদু। কারণ মানুষ মরণশীল।

নিমাই মাস্টার ধমক দিয়ে রাজনকে থামাতে চান। কিন্তু পারেন না। ধমক দেয়ার নৈতিক জোরও যেন তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। অপরাধের পাল্লা ভারি হয়ে গেলে নৈতিক জোর কমে যায়- নিমাই মাস্টার কোথায় যেন পড়েছিলো। এ জীবনে তো কম অপরাধ করা হয়নি। নৈতিক জোর থাকবে কীভাবে?

পবিত্র রবিবারে দ্বিতীয় খ্রিস্টযাগ শুরুর মিনিট পাঁচেক পূর্বে গীর্জা কম্পাউন্ডে একটি গাড়ি এসে থামে। সবাই অবাক হয়ে দেখে গাড়ি থেকে নেমে পবিত্র গীর্জা ঘরের দিকে ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে নিমাই মাস্টার। তাঁর হাত ধরে আছে ছোট নাতি রাজন। খ্রিস্টভক্তগণ যারা নিমাই মাস্টারকে চেনেন তাঁরা ভাবেন- এ শয়তান লোকটাও অবশেষে গীর্জায় এলো। নিমাই মাস্টার ভাবেন- মৃত্যুর আগে আমার সকল পাপের ক্ষমা পাবো তো? রাজন ভাবে- ঠাকুর মাকে কথা দিয়েছিলাম, মৃত্যুর পূর্বে ঠাকুর দা’র মন পরিবর্তন করানোর চেষ্টা করবো। শুরু তো হলো। ঠাকুর মা নিশ্চয়ই স্বর্গ থেকে দেখছেন। রাজন উপরের দিকে তাকিয়ে ক্রুশের চিহ্ন করে মা মারীয়ার নিকট প্রার্থনা করে- হে মা মারীয়া, আমাকে শক্তি দাও যেন আমি আমার ঠাকুর মাকে দেয়া কথা রাখতে পারি। আমার ঠাকুরদা’র মন পরিবর্তন করার যে যাত্রা শুরু হলো আজ, তা যেন সুন্দরভাবে সমাপ্ত করতে পারি।

০০-০০