সময়ের  বিকল্প ভাবনা- ৬

ফাদার সুনীল রোজারিও:

বিমান বন্দর সড়তে ২৯ জুলাই সড়ক হত্যার প্রতিবাদে রাজধানী জুড়ে কিশোর আন্দোলন শেষ হওয়ার একমাস শেষ হলো। গত এক মাসে নয় দফা, বিশ দফা, মামলা-জরিমানা, গাড়ির ফিটনেস, চালকের লাইসেন্স নবায়ন, গাড়ির গর্ভনর সীল, এক লাখ চালককে প্রশিক্ষণ সহ কতো প্রতিশ্রুতি-অঙ্গিকার শোনা গেলো আর দেখা গেলো। কিন্তু শেষ মেষ কাজের কাজটা কী হলো। যেই লাউ সেই কদু। ঈদুল আযহা ছুটি থেকে শুরু করে গত প্রায় এক মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় যতো লোক মারা গেছে, মনে হয় এর আগে এতো সংখ্যক লোক আর কখনো মারা যায়নি। সব জাতীয় দৈনিকে এখন সড়ক দুর্ঘটনার একটা স্পেশাল কলামই থাকছে। এতো দেন দরবারের পরেও কেনো থামছে না সড়ক দুর্ঘটনা, এটাএখন অনেকের প্রশ্ন।

ওকালতি পাশ করলে একজনকে উকিল বলা হয়। ডাক্তারি বিদ্যা পাশ করলে একজনকে ডাক্তার বলা যাবে। একজন উড়োজাহাজের পাইলটকে প্রথমে অবশ্যই একাডেমিক ডিগ্রি নিতে হয় তারপর তার থাকে পেশাগত ডিগ্রি ও কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন সার্টিফিকেট। তারপর সেই পাইলট শতশত মানুষের জীবন সঙ্গে নিয়ে উড়ে যায় গন্তব্যে। তবুও দেখা যায় পাইলটের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে উড়োজাহাজের দুর্ঘটনা ঘটে এবং মানুষের মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে একজন বাসের ড্রাইভারও বহু মানুষের জীবন হাতে নিয়ে গন্তব্যেও দিকে যায়।

তবে উড়ো জাহাজের পাইলট আর বাসের ড্রাইভারের মধ্যে তফাৎটা হলো- বাসের ড্রাইভারকে কম পক্ষে মাত্র অষ্টম শ্রেণি পাশ করলেই হবে। এই ডিজিটাল যুগে এই শিক্ষাগত যোগ্যতা পেশার কোনো মাপ কাঠি হলো?

ডশক্ষা নাকী মানুষের জ্ঞানপ্রসারিত করে, আক্কেল-জ্ঞান বৃদ্ধি করে। ফিলিপাইনে মহিলারা এভাবে বলেন, When David drives, I can sleep with him. তার মানে, ডেভিড যখন ড্রাইভ কওে আমি তখন গাড়িতে ঘুমাতে পারি।

ড্রাইভিং একটা আর্ট এবং বিজ্ঞানও বললে ভুল হবে না। এই আর্ট ও বিজ্ঞান একজন মাত্র অষ্টম শ্রেণি পাশ ছাত্র কীভাবে অর্জন করতে পারে, তাতে আমার বোঝার অভাব রয়েছে। এখন বুঝতে পারছি কেনো আমার ঠাকুরমা বলতেন, “লেহা পড়া শিখলে শিখ, নইলে ঢাহায় গিয়া ট্যারাক চালা।”ঠাকুর মার এই ধমক অভিশাপ মনে করে লেখাপড়াই শিখতে হলো। একজন অষ্টম শ্রেণি পাশ ড্রাইভার কী কোনো দূতাবাসের গাড়ি চালাতে পারবে বা কোনো মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে ড্রাইভিং পেশায় চাকুরি পাবে? একজন ড্রাইভারকে চালক হিসেবে হতে হবে দক্ষ এবং সেই সঙ্গে কথায় ও ব্যবহারে ভদ্র।

এখন ভেবে দেখুন কয়জন বাসের চালক এইসব গুণের অধিকারী। যাত্রিদের সঙ্গে বাসের ড্রাইভার এবং হেলপাররা যে ভাষায় খিস্তি খেউর করে, তা লজ্জাজনক। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, একজন চালকের কমপক্ষে এবং অবশ্যই উচ্চ মাধ্যমিক পাশ থাকতে হবে। এতে করে দেশে শিক্ষিত বেকারত্বেও সংখ্যাও কমবে এবং আশা করি সড়ক দুর্ঘটনাও কমবে।।

নাটোওে আমার পৈত্রিক এলাকায় গত আগস্ট মাসের ২৫ তারিখে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫জন মারা গেলো। নিহতের তালিকায় এক পরিবারের তিনজন খ্রিস্টভক্তও ছিলেন। এই দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার একটু আগেই ঐ সড়ক ধওে আমি আমার গন্তব্যে গিয়েছি। কিন্তু যে বাসে চড়ে গিয়েছি- মনে হলো ঐ বাসের ড্রাইভার এবং হেলপার  কোনো দিন শোনেনি যে বেপরোয়া গাড়ি চালালে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পুরো রাস্তাই হেলপার মোবাইলে কথা বলে মোবাইল ড্রাইভারকে দেয়, ড্রাইভার কথা বলে আবার হেলপারকে দেয়। ঈশ্বরের নাম জপ করে সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম। ঐদিনই পওে শুনতে হলো নাটোরের সেই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার খবর। শুধু এটুকুই নয়, আমার মনে হয় গত একমাস ধরে দেশ জুড়ে আলোচনার পরও আন্তঃজেলা বাস চলাচলে নূন্যতম পরিবর্তন আসেনি। এখনো বাসে ওঠেই যাত্রিরা বাসের ড্রাইভার ও হেলপারদের কাছে জিম্মী হয়ে যায়। ওরা যাত্রিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে পিষে মারতেও কলিজা কাঁপে না।

অর্থের কাছে মানুষের জীবন অর্থহীন হয়ে গেছে। অর্থের লোভে বাসের হেলপাররা যাত্রি তোলার জন্য যে পরিশ্রম করে, এই পরিমাণ পরিশ্রম দেশের অন্য কোনো সেবা খাতে সচরাচর শ্রমিকদের  করতে দেখা যায় না।সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে গাড়ির ইজারা বা চুক্তিভিত্তিক নিয়ম কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।বিডি খ্রিস্টান নিউজ পাঠকদের প্রতি রইলো শুভেচ্ছা।

লেখক: পরিচালক, রেডিও জ্যোতি