ছোট খাটো বিষয় – ২৪

।। আলো ডি’রোজারিও।।

১। আমি লেখক না, একজন অনিয়মিত পাঠক। লেখক হতে হলে নিয়মিত পাঠক হতে হয়। ইচেছ ছিল নিয়মিত পাঠক হবার, ছোটবেলা হতেই। পারিনি। তার অনেক কারণ, কেবল একটি লিখব আজ। তখন ছয় বা সাত ক্লাশে পড়তাম। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হ’ল – আমি আমার স্কুলের পড়ার বই না পড়ে শুধু গল্পের বই পড়ি, এমনকি বড়দের বই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ি। অভিযোগের প্রথম অংশ সঠিক ছিল না, আমি স্কুলের পড়ার বই শেষ না করে কখনো  গল্পের বই পড়তাম না। আমি যে স্কুলের বই পড়তাম তার প্রমাণ দেয়া এখনো কঠিন কিছু না। আমি ক্লাশে বরাবর প্রথম হতাম, স্কুলের নির্দিষ্ট ক্লাশের বই না পড়ে কী কখনো কেউ প্রথম হতে পারে? না, পারেনা। অভিযোগের দ্বিতীয় অংশ পুরোপুরি সঠিক ছিল, হাতের কাছে ছোটদের বই না থাকলে আমি বড়দের বইও পড়তাম। সব অভিযোগ সত্য ধরে আমাকে অনেক বকাঝকা করা হ’ল, উপরি হিসেবে পাওয়া গেল কয়েকটা কানমলা। বকাঝকায় ব্যবহৃত একটি বাক্যাংশ এখনো আমার মনে আছে আর তা হ’ল – ’পুব পাড়ার বান্দর’। আমাদের গ্রামের পূর্ব পাড়াতে আমাদের নিজ বাড়ী, দক্ষিণ পাড়াতে মামার বাড়ী। আমি তখন মামা বাড়ীতে থাকতাম।

২। একাধিক জনের বকা একসাথে খেয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মনের অবস্থা কারো সাথে সহভাগিতা করতে পারলাম না। না বাবা-মা’র সাথে, না ভাই-বোনদের সাথে, কারণ তারা তো থাকতেন দূরে, একই গ্রামের পূর্ব পাড়াতে। একা একা ভাবলাম, অনেকক্ষণ। ভেবে-টেবে রাগের মাথায় একটা খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। আমার সংগ্রহে থাকা এক শতেরও বেশী বই এক সাথে করে শুকনা খড় সহযোগে আগুন লাগিয়ে দিলাম। মুহূর্তের মধ্যে সব ক’টি বইয়ে ছড়িয়ে গেল আগুন, আগুনের লেলিহান শিখা পুড়ে ছারখার করে দিল আমার পাঠক হবার প্রাথমিক স্বপ্ন। আমি কাঁদতে কাঁদতে সরে গেলাম দূরে, মিশে গেলাম অন্ধকারের সাথে, কয়েক ঘন্টার জন্যে, পরে ফিরে এসে অভিমান করে না খেয়ে শুয়ে পড়লাম, দিদিমার শত সাধাসাধিতেও কিছু খেলাম না। কিশোর বয়সে রাগে-অভিমানে ঘটানো সেই কথা মনে করে এখন ভাবি, কী বোকাটাই না ছিলাম আমি! আসলেই আমি বেশ বড় বোকাই ছিলাম তখন। বড় বোকা না হলে কেউ কখনো বই পোড়ায়?

৩। কিশোর বেলাকার সেই ঘটনার পর বাড়ীতে পাঠ্যবই বহির্ভূত বই পড়া কমিয়ে দিলাম আমি। তবে স্কুলে তা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। স্কুল শুরুর আগে, দুই ক্লাশের ফাঁকে, এমনকি ক্লাশ চলাকালেও আমি গল্প বই পড়া শুরু করে দিয়েছিলাম। একদিন কøাশ চলাকালে গল্পের বই পড়তে গিয়ে অরুণ ফ্রান্সিস রোজারিও স্যারের কাছে ধরা পড়লাম। ক্লাশে গল্প বই পড়ছি দেখে তিনি ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন,

–              আলো, দাঁড়াও, বলো আমি কী কী পড়াচ্ছি?

–              আমি গড় গড় করে ঐ অধ্যায়ের সবটাই পৃষ্ঠা ধরে ধরে বললাম, আমার আগেই সেসব মুখস্থ করা ছিল।

–              বসো, ক্লাশে আর গল্পের বই পড়বে না, স্যার স্বাভাবিক ও সহজ সুরে বললেন। আমি বসে পড়ে যা যা ভেবেছিলাম তা বলা যায়, লেখা যায় না।

৪। বাড়ীতে বই পড়লে নালিশ, ক্লাশে বই পড়ে পড়লাম ধরা, এসব কারণে যখন আমি বেশ একটু বেকায়দায় তখনই আমার জন্যে এসে গেল বই পড়ার এক মহাসুযোগ। এই সুযোগটা করে দিয়েছিলেন মনীন্দ্র চন্দ্র মন্ডল স্যার। তবে গভীরভাবে ভেবে দেখলে বুঝতে পারি, ঈশ্বর নিজেই স্যারের মাধ্যমে সেসময় এই কাজটি করিয়েছিলেন। আমরা নিজে থেকে কিছু করি না, যদি ঈশ্বর আমাদের দিয়ে তা না করান। আমরা নিজে থেকে কিছু হই না, যদি ঈশ্বর আমাদের সেজন্যে সহায়তা না দেন। ঈশ্বর তাঁর পরিকল্পনা মাফিক আমাদের প্রয়োজনে সাড়া দেন, সবসময় ও সবার জন্যে। সোটই হয়েছিল আমার ক্ষেত্রে। আমার বেকায়দার সময় একদিন মনীন্দ্র স্যার আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, ”তুমি আমাকে লাইব্রেরীতে সহায়তা করতে পারবে?”  আমি সানন্দে রাজি হয়ে তাঁকে সহায়তা করা শুরু করলাম। সেসময় তুমিলিয়ায় বালকদের নতুন স্কুলে নতুন লাইব্রেরী, আলাদা কোন জায়গাও ছিল না। শিক্ষক মহোদয়দের বসার কক্ষের এক পাশটা ব্যবহৃত হ’ত লাইব্রেরী হিসেবে। আমি স্কুল শুরুর আগে ও পরে, সেসাথে ক্লাশের ফাঁকে ফাঁকে স্যারকে কিছু সময়ের জন্যে সহায়তা করতাম। তেমন বেশী কাজ না থাকাতে বসে বসে বই পড়তাম! মাঝে মাঝে মনীন্দ্র স্যার নিয়ম ভেঙ্গে আমাকে একাধিক বই বাড়ীতে নিতে দিতেন, আমার বই পড়ার আগ্রহ তিনি জানতেন বলে। আমাকে বকা দেবার কিছুদিনের মধ্যে মামার বাড়ীতে কেউ কেউ আমার প্রতি সহানুভ’তিশীল হয়েছিলেন এই ধারণা থেকে যে আমার বয়সী অনেকেই লুকিয়ে লুকিয়ে বড়দের বই পড়ে। তারা আমাকে বড়দের বইও পড়তে দিতেন।

৫। আজকালকার ’অনলাইন জেনারেশন’ দেখছে বেশী, পড়ছে কম। কী কী পড়ছে তা-ও চিন্তার বিষয়। পড়ায় ও দেখায় বিস্তর ফারাক। আমরা যখর বই পড়ি, নিজের কল্পনায় পরিবেশ, পাত্র-পাত্রী, ঘটনাপ্রবাহ, ইত্যাদি সিনেমার মতো তা দেখি, নিজে নিজে সব কিছু নির্মাণ করে নেই। বই পড়া আমাদের কল্পনা শক্তি বাড়ায়, সেসাথে বাড়ায় সৃজনী শক্তি। উপরন্তু, বই পড়লে বাড়ে আমাদের জ্ঞান। চেতনা শক্তি বাড়াবার নিমিত্তেও বই। আসুন, আমরা ছোট বড় সকলে বেশী বেশী বই পড়ি।

লেখক: প্রাক্তন পরিচালক, কারিতাস বাংলাদেশ

ছোট খাটো বিষয় ২৩