সময়ের বিকল্প ভাবনা- ৫

ফাদার সুনীল রোজারিও:

কিছু লোক একসঙ্গে বাস করলে সেখানে শান্তি থাকবে এমন নয়। তারা একজন অন্যজনকে নাও জানতে পারে বা জানা চেনা থাকলেও ভালোবাসা নাও থাকতে পারে।. শান্তি হলো একসঙ্গে বাস করা, একজন অন্যজনকে জানা এবং একে অন্যকে ভালোবাসা। একটা ইটের স্তুপকে ঘর বলা যাবে না, কিছু শব্দ জোড়াতালি দিলেই বাক্য হয় না, কিছু সুর একসাথে গেঁথে দিলেই সংগীত হয় না। তেমনি কিছু লোক একসঙ্গে বসবাস করলেই শান্তি থাকবে তেমনও নয়। ভালোবাসার মধ্যদিয়ে যখন সম্পর্ক গড়ে ওঠে তখনই সেখানে শান্তি বিরাজ করে। শান্তি হলো শর্তহীনভাবে অন্যকে সাহায্য করতে প্রস্তত থাকা। যে যেমন তাকে সেভাবে গ্রহণ করা। শান্তির অর্থ হলো সহিংসতা না থাকা, সাম্প্রদায়িক মনোভাব না থাকা, ভেদাভেদ না থাকা, যুদ্ধ না থাকা, সন্ত্রাস না থাকা, ইত্যাদি। শান্তি হলো ঈশ্বরের একটি আহবান-তাই সবাই শান্তির দূত। সষ্টিকর্তা আমাদের প্রত্যেককে প্রেরণ করেছেন একজন শান্তির দূত করে। পোপ ষষ্ঠ পল বলেছিলেন যে, ‘শান্তি তোমার উপরও নির্ভর করে।’

শান্তি প্রথমে নিজের মধ্যে শুরু করতে হয়। আমি নিজেকে প্রশ্ন করতে পারি, আমি কী অন্যায়কারী? আমি কী অন্যকে উস্কানী দেই? আমি কী মিথ্যা বলি- মিথ্যা মামলা করি- মিথ্যা স্বাক্ষ্য দেই? আমি কী অন্যের জমির আইল কাটি? আমি কী অন্যকে ঠকাই? আমি কী অন্যকে খারাপ পরামর্শ দেই? আমি কী চুরি করি? আমি কী পরের জিনিস পরের মানুষ লোভ করি? কতোভাবেই না আমি শান্তি বিঘিœত করতে পারি। বেশীর ভাগ সময় আমরা অশান্তির জন্য অন্যকে প্রশ্ন ও দোষ দিয়ে থাকি। নিজে দোষী হতে চাই না।

শান্তি স্থাপনে পরিবার হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়। পরিবারেই সন্তানের জীবন শুরু হয়। কিন্তু আমরা এমন সময়ে পৌছেছি যেখানে পরিবারেই শান্তির অভাব। ছেলেকে তো কাছে পাওয়াই যায় না। মেয়ের সঙ্গে তো কথাই বলা যায় না। লেখা পড়ার প্রতি আগ্রহ কমে আসছে। সংসারের প্রতি বউয়ের মনোযোগ নেই। খালি সাজগোজ। দুই বউয়ের মধ্যে ঝগড়া। ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া। বাড়ির কর্তা সারাদিন বাইরে বা বাজারে বসে থাকে। কোনোদিন একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করে না। একসঙ্গে ধর্মকর্ম করে না। এই যে পরিবারের দৃশ্য এর জন্য দায়ী কে? বাড়ির কর্তা হিসেবে আমিই আগে দায়ী। শুরু থেকে উপযুক্ত শিক্ষা না দিয়ে ভুল হয়ে গেছে, দেরী হয়ে গেছে। পারিবারিক অশান্তি হলো বড় অশান্তি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শান্তি স্থাপনে একটা বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রতিষ্ঠানে বাংলা, ইংরেজি, অংক, আরো অনেক কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক স্কুল আছে যেখানে প্রতিদিন ধর্ম ক্লাশ হয় না। আমরা ভালো ভালো ইংরেজি বাংলার শিক্ষক খুঁজি- আর ধর্ম শিক্ষক একজন হলেই হয়। বাইবেল শিক্ষা দেওয়া কী এতোই সহজ? শিক্ষকদের কথা হলো, ধর্মে ছাত্ররা এমনিতেই ভালো নম্বর পায়। এখন টার্গেট হলো- জিপিও ৫, গোল্ডেন প¬াস পাওয়া।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় নেতাদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। ধর্মের ব্যাখ্যা দিতে হয় যুগের চাহিদা মোতাবেক। যুগ লক্ষণ আমার কাছে কী বলে? পৃথিবী জুড়ে এখন যুগ লক্ষণ হলো, যুদ্ধ আর যুদ্ধ। এই যুদ্ধের জন্মস্থান হলো মানুষের মস্তিষ্ক। ধর্মীয় নেতাদের উচিৎ ছাত্রদের যুদ্ধবিহীন মন তৈরী করা। তাদের কথায়, কাজে, আচরণে যেনো যুদ্ধ যুদ্ধ মানসিকতা প্রকাশ না পায়। মারামারি, দাঙ্গা হাঙ্গামা এগুলো যুদ্ধেরই মনোভাব। অন্যের সঙ্গে মিলে মিশে থাকা শান্তির অংশ। ছোটো থেকেই সন্তানদের মধ্যে ভালোবাসার মনোভাব তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশে শান্তি বড় বাধা হলো রাজনীতি। এবাড়ি ওবাড়ির বউ ঝগড়া করে আবার পুকুর ঘাটে গিয়ে মিল হয়ে যায়। কিন্তু রাজনীতির ঝগড়া মিটে না। আমাদের দেশে রাজনীতি পাড়া গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। হাটে বাজারে দোকানে সবাই রাজনীতি, দুর্র্নীতি অবসানের কথা বলে। কিন্তু আমার নেতা দুর্নীতি করে জেলে গেলে আমি মুক্তির জন্য বিক্ষোভ করি। জামিনে মুক্তি পেলে মিষ্টি খাওয়াই। রাজনীতির কারনে আন্তরিকতা নেই। তাই আমরা যৌথভাবে কাজ করতে পারি না।

উন্নত বিশ্ব, উন্নত প্রযুক্তি ও প্রাচুর্য বিশ্বকে অনেক দিয়েছে। অন্যদিকে অনেক অশান্তিরও জন্ম দিয়েছে। ক্রাইম বা সন্ত্রাস কোত্থেকে সৃষ্টি হচ্ছে? বা কারা এর পিছনে মদত যোগাচ্ছে? ক্রিমিনাল তৈরি করতে হলে বিশাল অর্থের প্রয়োজন হয়- যে অর্থ আমাদের নেই। অস্ত্র তৈরি করতে বিশাল বাজেটের প্রয়োজন হয়- সে বাজেট আমাদের নেই। যুদ্ধ করতে গেলে কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন হয়- যা আমাদের নেই। আমাদের তৃতীয় বিশ্বে আছে বিশাল জনসংখ্যা। কেভীন ভাল্স তার ‘ডিসপোজেবল পিপোলস’ গ্রন্থে ২৭ মিলিয়ন মানুষ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। এই ২৭ মিলিয়ন মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিলো। কাজ যখন হাশিল হয়ে গেলো তখন তারা আর পরিবারে ফিরে যেতে পারলো না। অস্ত্র হাতে তারা গোপন আস্তানায় চলে গেলো। এরা যদি বাঁচার তাগিদে বিশ্বে অশান্তি তৈরী করে, তাহলে দায়ী কে হবে। পোপ জন পল ইরাক যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ নয় সন্ত্রাসের কারন খুঁজে বের করতে হবে।’

সৃষ্টা তাঁর শক্তি প্রকৃতির মধ্যদিয়ে আমাদের দেখিয়ে দেন। আইলা সিডর সুনামি যার বড় প্রমাণ। আমরা এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলছি, যার কারনে নানা দুর্যোগ, অশান্তি আমাদের সামনে। মানুষের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রকৃতির যে ক্ষতি হয়েছে তা ইতিমধ্যেই আজ বিশ্ব শান্তিকে হুমকীর দিকে ঠেলে দিয়েছে। ঈশ্বর বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির পর আদম ও হাওয়াকে তা দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এই সবকিছু তোমাদের দিলাম তোমরা এগুলো লালন পালন করো, তোমরা বংশ বিস্তার করো।’ মানুষের বংশ বিস্তার হলেও প্রকৃতির বিস্তার বিপন্ন। প্রকৃতিকে ধবংস করে আমরা উৎসবে মেতে উঠি। প্রকৃতিতে আমরা যা কিছু পেয়েছি তার সঠিক আবিষ্কার আমরা আজো করিনি। প্রাচীন ভারতের চার্বাক দার্শনিকরা বলেছিলেন, বিশ্ব-প্রকৃতির মধ্যে রয়েছে চারটি উপাদান, আলো, বাতাস, পানি এবং মাটি। এই চারটি উপাদানের মধ্যে সমস্ত শক্তি নিহিত। আমরা এই শক্তিকে মানুষের কল্যাণের জন্য সঠিকভাবে ব্যবহার না করে দূষিত করেছি, অশান্তি বানাচ্ছি। দার্শনিক সাধু টমাস আকুইনাস বলেছেন, ‘বিশ্ব ব্রহ্মান্ড একটা অসমাপ্ত সৃষ্টি। বাকীটুকু সৃষ্টির ভার মানুষের উপর। আর যে কেউ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হবে, তার জন্য স্বর্গের দরজা বন্ধ থাকবে।’ মানুষ তো ঈশ্বরের সৃষ্টির মধ্যে এক উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। বাইবেলে লেখা আছে, “ঈশ্বর মানুষেকে বুনে বুনে রচনা করেছেন।” একমাত্র মানুষকেই ঈশ্বর নিজের হাতে রচনা করেছেন। আর সবকিছু মুখের ভাষায় সৃষ্টি করেছেন। তাই বিশাল সৃষ্টিকে লালন-পালন ও মহোৎসবগুলো প্রকৃতিকে নিয়েই করতে হয়। কিন্তু আমরা অনেক দেরী করে ফেলেছি। নিজেরাই প্রকৃতি ধবংস করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে ক্লাইমেট চেঞ্জ, পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য বলছি, এরা দায়ী ওর্ াদায়ী। আমরা আত্ম মূল্যায়ন করে দেখিনি যে, এই দায়ীদের মধ্যে আমারও ভূমিকা রয়েছে। আমরা মেধাবী হয়েছি কথায়, আমাদের পান্ডিত্যে, কিন্তু বুকে ধারন করিনি প্রকৃতির সৌন্দর্যকে। বিশ্বে মানুষই একমাত্র জীব এই প্রকৃতি ধ্বংস বন্ধ করে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।

আসল কথা হলো, শান্তি স্থাপন আমাকে ছাড়া হবে না। আমি, আপনি যদি শান্তি চাই, তাহলে শান্তির কাজ নিজ থেকে শুরু করতে হবে। অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। আসল কাজ হবে আমি কী করতে পারি। মানুষ সৃষ্টির মধ্যে সেরা, ঈশ্বরের স্রেষ্ঠ উপহার। তাই ঘরে, বাইরে, বিশ্বে শান্তি স্থাপন স্রেষ্ঠ জীব- মানুষের পক্ষেই সম্ভব। পাঠকবৃন্দের প্রতি শুভেচ্ছা।
লেখক: পরিচালক, রেডিও জ্যোতি