বাড়ছে আত্ম-হত্যা, উদ্বিগ্ন পিতা-মাতারা

সুমন কোড়াইয়া:

পূর্ণিমা। বয়স ২২। বিয়ের কথা বার্তা চলছে। বাগদানও সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানতে পারেন তার হবু স্বামীর অন্য একটি মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে। এ নিয়ে মনোমালিন্য হয় তাদের দু’জনার মধ্যে। রাগে দুঃখে নিজেকে শেষ করে দেন কলেজ পড়–য়া পূর্ণিমা । গলায় দড়ি দিয়ে আত্ম-হত্যা করেন তিনি।

সোহাগের বয়স মাত্র ১৮। ছোট ভাইয়ে সাথে ঝগড়া হয়। বাড়িতে কেউ ছিল না তাদের। এরপর গলায় দড়ি দিয়ে আত্ম-হত্যা করেন তিনি। নিজেকে মারার আগে পত্র লিখে যান। বাবা-মাকে ‘বেষ্ট’ বাবা-মাও বলেন। কিন্তু বাবা-মা কিছু বুঝার আগেই ঈশ্বর প্রদত্ত তাদের সব চেয়ে মূল্যবান সম্পদ ‘সন্তান’কে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছেন। এই নিয়ে তাদের দুঃখ আর আক্ষেপের শেষ নাই।

রোদেলা। বয়স ২৯। স্বামীর সাথে ঝগড়া করে হারপিক খেয়ে নিজেকে শেষ করতে চান। পরে স্বজনরা টের পেয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে অনেক কষ্টে তাকে বাঁচানো হয় তাকে।

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে নিলয় ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বিষ পানে আত্ম-হত্যা করেন।

উপরের সব কটি চরিত্রের নাম কাল্পনিক, তবে ঘটনা সত্য। এ বছর ক্ষুদ্র খ্রিস্টান সমাজে কমপক্ষে ১০জন আত্ম-হত্যা করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।যাদের বেশির ভাগ বয়স ত্রিশ এর কম। আত্মা-হত্যার চেষ্টো চালিয়েছেন আরো অনেকে। আরো অনেকে আত্ম-হত্যার চেষ্টাও করছেন। এই সব ঘটনায় সন্তানদের পিতা-মাতারা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নানামুখি চাপ, ব্যস্ততা, সম্পর্কের বন্ধন মজবুত না থাকা, আত্ম-কেন্দ্রিকতা, যৌন নির্যাতন ইত্যাদি কারণে আত্ম-হত্যার ঘটনা বাড়ছে।

অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড  প্রিভেনশনের (আইএএসপি) মতে, সারাবিশ্বে বছরে আট লাখ মানুষ আত্ম-হত্যা করেন। এদের প্রত্যেকেই আত্ম-হত্যার আগে গড়ে ২৫বার এই অপচেষ্টা চালান। আইএএসপি’র বাংলাদেশের প্রতিনিধি মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের আত্ম-হত্যা একটি জনস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা। তিনি জানান, দেশে বছরে গড়ে ১১ হাজার মানুষ আত্ম-হত্যা করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক বলেন, চারিদিকে এত আত্ম-হত্যার ঘটনা দেখে আমি নিজেই চিন্তিত। জানি না কী করবো। তবে সন্তানদের এখন বেশি সময় দেওয়ার চেষ্টা করছি।

কিন্তু কেন এই অপতৎপরতা? কেন নিজেকে শেষ করতে হচ্ছে? বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বর্তমান আধুনিক ও তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে- যুগের সাথে তাল মিলাতে পারছেন না অনেকে। চাপ সামলাতে না পেরে অনেকে বেছে নিচ্ছেন আত্ম হননের পথ।

এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ কালথিক ডক্টরস এর সাধারণ সম্পাদক এবং কারিতাস বাংলাদেশের স্বাস্থ্য  কো-অডিনেটর ডা. এডুয়ার্ড পল্লব রোজারিও বিডি খ্রিস্টান নিউজকে বলেন, অনেকে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। চাপ সামলাতে না পেরে অনেক যুবক-যুবতী আত্ম-হননের পথ বেছে নিচ্ছেন।

আত্ম-হত্যার প্রতিকার কী এই বিষয়ে তিনি বলেন, গতকালও ফার্মগেটে একজন খ্রিস্টভক্ত আত্ম-হত্যার চেষ্টা করেছে বলে খবর পেয়েছি। এটা বর্তমান সময়ে চরম একটা সামাজিক সমস্যা। এই বিষয়টা নিয়ে আমারদের কাজ করার সময় এসেছে।

তিনি বলেন, চাকুরীজীবী পিতা-মাতারা সন্তানদের সময় কম দিচ্ছেন। সন্তানরা কী করছে তা খোঁজ নিচ্ছেন না। স্কুলে চাপ, পরিবারে চাপ সব মিলিয়ে অনেক সন্তান মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর না দেওয়াটাও আত্ম-হত্যার একটি কারণ।

ড. এডুয়ার্ড পল্লব রোজারিও আরো বলেন, ‘সন্তানদের যেমন বাড়তি সময় দিতে হবে, স্কুলের শিক্ষকদের কাউন্সিলিং করতে হবে। পরিবারগুলো ছোট হয়ে যাচ্ছে। তাই বাড়াতে হবে পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধন’।

‘সন্তানরা এখন ব্যস্ত মোবাইল, ফেসবুক, ইউটিউব নিয়ে। ধর্মগুরুরা যদি বাড়ি পরির্দনে যায় তাহলে ভাল হয়,’ বলেন ডা. এডুয়াড।

নৃত্য শিল্পী ঝোটন সিলভেষ্টার ছেরাও মনে করেন, পিতামাতারা যদি সন্তানদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারেন তবে কমবে আত্ম-হত্যার প্রবণতা। ‘সন্তান যদি দিনে এক দুই ঘন্টা নাচ, গান বা অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করে, তবে তারা ভাল সময় পার করবে। আত্ম-হত্যার দিকে পা বাড়াবে না’।