সময়ের বিকল্পা ভাবনা- ৪

ফাদার সুনীল রোজারিও, অনলাইন রেডিও জ্যোতি:
ধর্মশিক্ষা ও আমাদের বিশ্বাস যদি আজকের বাস্তবতায় ব্যাখ্যা করতে বলা হয় তখন অবশ্যই আমাদের ফিরে যেতে হবে আগের দিনের বস্তবতায় এটা কেমন ছিলো, সেই বিষয়টির দিকে। ৫০ থেকে ৬০ দশকের মধ্যে যারা স্কুল জীবন শুরু করেছিলেন তাদের মনে আছে যে প্রতিদিনই স্কুলে ধর্মশিক্ষা দেওয়া হতো এবং তা ছিলো বাধ্যতামূলক। এছাড়াও বাড়ীতে বুড়াবুড়ীরা সন্ধ্যায় রোজারী প্রার্থনার পর বাইবেলের প্রাচীন নিয়ম থেকে গল্প শোনাতেন। আমরা বাইবেল যতোনা শিখেছি স্কুলে, বেশী জেনেছি বাড়িতে। বাংলার সংস্কৃতিতে গল্পবলা এবং শোনা ছিলো একটা ঐতিহ্য। দাদী বা মা যখন কাণা বুড়ীর গল্প বা এক রাজা আর সাত রাণীর গল্প বলতেন সেটা যেমন ঘুমঘুম চোখেও শোনতাম তেমনি ডেভিড গলিয়াত, ইস্রায়েলীয়দের লোহিত সাগর পার বাসিনাই পর্বতে মোশী ও ঈশ্বর ইত্যাদি গল্পও শোনতাম। যতো বড় হয়েছি রূপকাথার গল্পগুলো গুরুত্বহীন হয়ে গেছে আর নিজের হয়ে ওঠেছে বাইবেলের গল্পগুলোই। বড় হওয়ার পর আমার নিজের অস্থিত্ব, নিজের বিচার বিবেচনা স্বভাবতই আমাকে তাগাদা দিয়েছে ঈশ্বরকে বড় করে দেখার, মহান হিসেবে ভাবার।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ধীওে ধীরে স্কুলে প্রতিদিন ধর্মশিক্ষা দেওয়ার গুরুত্ব কমতে থাকে। সানডে বাইবেল ক্লাশ খুব আগেকার দিনের কথা নয়। এটা প্রথম চালু হয় প্রটেষ্টট্যান্টদের মধ্যে। পরে আমাদের ক্যাথলিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এই পদ্ধতি চালু করা হয়। প্রথমে ভালোই ছিলো রোববার অফিস ডে হয়ে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় ধর্মশিক্ষা প্রদানে আমাদের দৈন্যতা। এখন আমাদের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন আর ধর্ম শিক্ষা দেওয়া হয় না। ধর্ম যা মানুষের জীবনকে প্রবাহিত করে তা শুধু রবিবারের মিসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কেনো? তবে যতোই যা হোক ঐ পদ্ধতি থেকে আর আমরা বের হয়ে আসতে পরেনি। মিশন স্কুলগুলোতে প্রতিদিন বাইবেল ক্লাশ দেওয়া আবার বাধ্যতামূলক হওয়া দরকার। এক সময় জাঁকজমকভাবে বাইবেল কুইজ চালুছিলো। এখন সেটাও জ্বলছে তো নিভছে।
ধর্ম মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করে। আর আমার মধ্যেকার ঈশ্ব^র বিশ্বাস, অন্যকে বিশ্বাসের পথে টেনে আনে এটাই সত্য। আমাকে দেখেই অন্যে দেখবে এবং জানবে। বাইবেলেও আমরা তাই দেখি। চারজন লোক খাটিয়ায় করে একজন রোগীকে চালের ঢালা খুলে যীশুর সামনে নামিয়ে দিয়ে ছিলো। রোগীর কোনো বিশ্বাস এখানে দেখা যায়নি। চারজন লোকের বিশ্বাসই রোগীকে সুস্থ্য করে তুলেছিলো। বিশ্বস এমনই জিনিস যা বিলালে কমেনা বরং বাড়ে। বিশ্বাস কিন্তু অর্থ-সম্পদ নয় যে বিলালে কমে যাবে।

ad

আজকের বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। আজকের সন্তান স্কুলে ভর্তী হওয়ার আগে শতশত ঘন্টা ব্যয় করে টিভির সামনে। পরে যখন স্কুলে যায় শুনতে হয় ভিন্ন ধরনের কথা ও শিক্ষা এবং তা ভিন্নভাবে। ফলে টিভিতে যা দেখছে এবং শুনেছে তার মধ্যে একটা বিরোধ খুঁজে পায়। স্কুলে ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা দিতে হবে তাই মিডিয়ার সাহায্যে। বাস্তবতাকে কাজে লাগাতে হবে। আজকের দিনে মিডিয়ার আর কোনো প্রতিদ্বন্ডী নেই। আজকাল তো মিশনের পূজা-পার্বণে ধর্মীয় নাটক-পালা উঠেই গেছে। মিশনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে ধর্মনির্ভও অনুষ্ঠান যোগ করতে হবে। মিশনে মিশনে ধর্মীয় দ্রব্যাদি সহজলভ্য করতে হবে। অনেক সময় খ্রিস্টভক্ত একটা রোজারিমালা কিনতে এসে পায় না। আজকাল শহওে প্রচুর ক্রুশ, মেডেল ও ধর্মীয় বই পাওয়া যায়। এগুলো সংগ্রহ করতে হবে জনগণের জন্য। সবচেয়ে বড়কথা হলোধর্ম শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে ধর্ম প্রদেশের একটা বাৎসরিক দিকনির্দেশনা বা গাইডলাইন থাকতে হবে-যা দিয়ে ধর্ম প্রদেশের ধর্ম শিক্ষা পরিচালিতহবে।
লেখক:পরিচালক, রেডিও জ্যোতি