ফাদার জ্যোতি গমেজ ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

এলড্রিক বিশ্বাস:

নমস্য ফাদার জ্যোতি এলেক্সিয়াস গমেজ (৭৬) গত ১৫-০৭-২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ ভোরে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন। এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে কেউই চায় না। নিয়মের বেড়াজালে তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন। বয়সের ভারে ও নানাবিধ জটিল রোগের চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ:নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

ফাদার জ্যোতি এলেক্সিয়াস গমেজ ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের তুমিলিয়া ধর্মপল্লীর বোয়ালী গ্রামের সন্তান। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ধর্মীয় গানের মানুষ। তাঁরা বংশপরস্পরায় মন্ডলীর জন্য অবদান রেখে যাচ্ছেন। তাঁর বোন সিস্টার, ভাগিনাদ্বয় ফাদার ও ব্রাদার। বাংলাদেশ মন্ডলীকে তিনি করেছেন সংস্কৃতিতে সম্পদশালী যতদিন তিনি ছিলেন কর্মক্ষম। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি যাজক হিসেবে অভিষিক্ত হন।

১৯৮২ থেকে ফাদার জ্যোতি এলেক্সিয়াস গমেজ এর সাথে আমার পরিচয়। চট্টগ্রাম ধর্মপ্রদেশের পক্ষে খ্রিষ্টিয় যোগাযোগ কেন্দ্রের পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে। তখন সিবিসিবি এর অধীন কমিশনের সভা বিভিন্ন স্থানে হত। মোহাম্মদপুরে সিবিসিবি বিল্ডিং এর কাজ চলছে। লক্ষèীবাজার অফিসে হত যোগাযোগ কমিশনের সভা। সভায় ইংরেজীতে টাইপ করা সমস্ত মিনিটস্ ও অন্যান্য ডকুমেন্ট ফাদার জ্যোতি উপস্থাপন করতেন। তিনি দক্ষ ছিলেন বাংলা ও ইংরেজী উভয় ভাষায়। সভায় তাঁর মিষ্ট কথায় তিনি সবাইকে বিমোহিত করতেন। তাঁর আলোকছটা ছিল জ্যোতির মতই। তিনি যা স্পর্শ করতেন তা জ্যোতিময় হয়ে উঠতো।

চট্টগ্রাম ধর্মপ্রদেশের বিশপ যোয়াকিম রোজারিও, সিএসসি সাথে আলাপকরে আমাকে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় আসার সুযোগ করে দেন ফাদার জ্যোতি এলেক্সিয়াস গমেজ। সম্পাদকের সহকারী হিসেবে প্রতিবেশীতে কাজ শুরু করি। সেই আশির দশকে মিডিয়া জগতে এখনকার মত এতো সুযোগ সুবিধা ছিল না। নানা প্রতিকূলতায় মিডিয়া চালাতে হত। লক্ষèীবাজারে ছিল প্রেস, প্রকাশনা ও রেকডিং স্টুডিও বাণীদীপ্তির কার্যক্রম। লেটার প্রেসে প্রতিবেশী ছাপা হত। শিষা দিয়ে তৈরী অক্ষর একটির পর একটি সাজিয়ে কম্পোজ করা হত, প্রুফ দেখার পর ছাপার উপযোগী হলে মেশিনে তোলা হত ছাপার জন্য। অনেক দূরহ কাজ। এখন কম্পিউটার কম্পোজে ছাপার কাজ কত সহজ।

ফাদার জ্যোতি এলেক্সিয়াস গমেজ হোন্ডা ৫০ নিয়ে প্রতিদিন রমনা থেকে প্রতিবেশী অফিসে আসতেন, সারাদিন থেকে সন্ধ্যায় চলে যেতেন। উনি ছিলেন খ্রিষ্টিয় যোগাযোগ কেন্দ্রের পরিচালক। আমি প্রতিবেশীতে আসার আগে যেরোম ডি’ কস্তা ( প্রতিবেশীর প্রাক্তন সম্পাদক) জর্জ রুরাম, উইলিয়াম অতুল কুলুন্তুনু, গডফ্রে প্রাণতোষ হালদার ও আরো অনেকে চাকুরী করেছেন। আমি এসে পেয়েছি মার্ক ডি; কস্তা (ছোটদের আসরের নির্মলদা), নিধন ডি’ রোজারিও, হেবল ডি’ ক্রুজ, ফ্রান্সিস গমেজ, এইচ ফ্রান্সিস, ম্যাথিও দীপক বোস, কনস্ট্যান্ট ভানু গোমেজ ও আরো অনেকে ছিলেন। এখনও আছে প্রতিবেশীতে অনুকুল রোজারিও, মেরী তেরেজা বিশ্বাস। খ্রিষ্টিয় যোগাযোগ কেন্দ্র ছিল খ্রিষ্টিয় সংস্কৃতিক কর্মকান্ডের একটি প্লাটফরম ছিল যেখান থেকে যোগাযোগের সব মাধ্যম পরিচালিত হত। দীর্ঘ ৫ বৎসর ফাদার জ্যোতির সাথে কাজ করেছি, মিডিয়া লাইনের অনেক কিছু শি

খেছি। ফাদার জ্যোতির সময় ঈশ্বরের সেবক আর্চবিশপ গাঙ্গুলী স্মৃতি পুরষ্কার প্রদান ও সুন্দর একটি স্লাইড শো তৈরী করেছিলেন।

যাতায়াতের নানা সমস্যা থাকলেও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ও অন্যান্য দিনে লেখক, শিল্পী, কলাকুশলী সকলেই চলে আসতো লক্ষ্মীবাজারে প্রতিবেশী অফিসে। গান লেখা, সুর দেয়া, স্বরলিপি তৈরী, শিল্পীদের খবর দেয়া, গানের রির্হাসেল, রেকর্ডিং সবই হত বাণীদীপ্তিতে। প্রতিবেশী প্রকাশনী থেকে ধর্মীয় বই প্রকাশ, প্রেসে প্রতিবেশী ছাপা সবই ছিল প্রাণবন্ত কার্যক্রম। ফাদার জ্যোতির সাথে সবার ছিল সুন্দর যোগাযোগ। তিনি এই মিডিয়া সেন্টারটি তৈরী বা সেটআপের জন্য বিদেশে ডোনারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।

ফাদার জ্যোতি এতজন ভাল এডমিনিস্ট্রেটর, লেখক, সঙ্গীতজ্ঞ, (চেতনায় সঙ্গীতের ধারক), প্রকাশক ও ভাল যোগাযোগ রক্ষাকারী ছিলেন। অনুসন্ধানী চোখে তিনি প্রতিভাকে খুঁজতেন। সাপ্তাহিক প্রতিবেশীতে অনেকে সম্পাদক হয়েছেন কিন্তু ফাদার জ্যোতির মত কতজন নতুন নতুন মুখ উপহার দিয়েছেন। লেখায়, গানে ও অন্যান্য প্রতিভাকে তুলে ধরেছেন। তখনকার সব অডিও ক্যাসেটই ছিল হিট। বহু গুণের অধিকারী ফাদার জ্যোতি নিজের গুণ ও অপরের গুণকে যোগ করেছেন। তার সেই সময় বাংলাদেশ খ্রিষ্ট মন্ডলীতে ছিল রেঁনেসার যুগ। তিনি খ্রিষ্টিয় চেতনাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ছিলেন লোকায়ত শিল্পের একজন ভক্ত। তিনি কোলকাতার অবনী সরদারের যীশুর গান ও সাধু সাধ্বীর নামে গ্রাম বাংলার গানকে ক্যাসেটে ধারণ করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। খ্রিষ্টিয় সমাজের জন্য গান, ধর্মীয় বই, ক্যাসেট বেশীর ভাগই ফাদার জ্যোতির সময় প্রকাশ।

সাধু পোপ দ্বিতীয় জন পল যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন, ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ শে নভেম্বর, তখন ফাদার জ্যোতি ছিলেন মিডিয়া কমিটির আহ্বায়ক। তখন আমিও মিডিয়া কমিটির একজন সদস্য। প্রকাশনার সমস্ত কাজ যতœসহকারে তিনি করেছিলেন। অবশ্য ঈশ্বরের আশির্বাদে এবারও পোপ ফ্রান্সিস এর বাংলাদেশে আগমন ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ শে নভেম্বর ও ১লা ডিসেম্বরে আমি মিডিয়া কমিটিতে ছিলাম ও কিছু কাজ করার সুযোগ হয়েছিল।

ফাদার জ্যোতির সাথে পাকিস্তানের করাচীর ক্রাইস্ট দ্যা কিং সেমিনারীতে যাঁরা ছিলেন কার্ডিনাল ও ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের আর্চ বিশপ প্যাট্রিক ডি’ রোজারিও, সিএসসি, ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা, ফাদার বানার্ড পালমা, ফাদার ফান্সিস গমেজ সীমা, মি: বার্থলোমিয় সাহা, মি: জর্জ রুরামসহ আরো অনেকে।

ফাদার জ্যোতির কর্মক্ষমতা ছিল বিশাল। তিনি তেজগাঁও ও হাসনাবাদ ধর্মপল্লীর পাল পুরোহিত ছিলেন। খ্রিষ্টিয় সমাজের একজন সফল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ছিলেন ফাদার জ্যোতি এ গমেজ। আমরা একজন সিনিয়র ফাদারকে হারিয়েছি। ঐ দিন সকাল ১০:৩০ মিনিটে তেজগাঁও চার্চে প্রথম খ্রিষ্টযাগ ও বিকেল সাড়ে ৪ টায় তুমিলিয়া চার্চে খ্রিষ্টযাগের পর তুমিলিয়া কবরস্থানে ফাদার জ্যোতি এ গমেজ চিরনিদ্রায় শায়িত হন।