টিউশনি

প্রদীপ মার্সেল রোজারিও:

আমার বাবা সবজি বিক্রি করতেন। পাড়ার সম-বয়সীরা আমাকে সবজি বিক্রেতার ছেলে বলে তাচ্ছিল্য করতো। ও’দের আচরণে ভীষণ কষ্ট পেতাম। কিছু বলতাম না।  কিছু বলার মতো অবস্থা এবং অবস্থান কোনটাই আমাদের ছিলো না। আমার কষ্টটা মা বুঝতে পারতেন। বাবাও বুঝতেন। কিন্তু কিছু করার ছিলো না। চার-পাশে একটা অনাদর, অবহেলা আর বঞ্চনার আবহ নিয়ে আমাকে বেড়ে উঠতে হয়েছে।

কৃষকের ছেলে কৃষক হবে। কামারের ছেলে কামার হবে। জেলের ছেলে জেলে হবে। সবজি বিক্রেতার ছেলে হবে সবজি বিক্রেতা । আমার তো হওয়ার কথা সবজি বিক্রেতা জুনিয়র।  তা না, মা আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। সবাই অবাক! পাড়া-প্রতিবেশীরা ঠাট্টা করে বললো- ঘরে খাবার নেই, স্কুলে যাওয়ার সখ! ও’ বেশী দূর যেতে পারবে না। সবজি বিক্রেতার ছেলে লেখা-পড়া করে কি হবে? কয়েকটা দিন যাক না- বাবার সাথে ঠিকই সবজি বিক্রিতে লেগে যাবে। কেউ কেউ বললো- সবজি বিক্রেতার ছেলে তো কি হয়েছে? পড়াশুনা তো করতেই পারে। মা বললেন- পড়াশুনাটা ভালভাবে করো বাবা। লেখা-পড়া কেউ কেড়ে নিতে পারে না।

ad

বাবার কাজে সহযোগিতা করার পাশাপাশি পড়া-লেখাও চললো। পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে তো সবাই অবাক। সবজি বিক্রেতার ছেলে ক্লাশে প্রথম হচেছ? সকলের চোখ কপালে উঠলো! মা বললেন- মানুষের চোখ কপালে উঠলো কি মাথায় উঠলো তা তোমার দেখার দরকার নেই। তোমার কাজ পড়াশুনা করা। তুমি নিয়ম মেনে পড়াশুনা করো। গরীবের জন্য পড়াশুনাই এক মাত্র উপায় ধনীদের সাথে টক্কর দেয়ার।

এসএসসিতে ভাল রেজাল্ট করে ঢাকায় আসলাম। মেধাবী ছাত্রদের জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা আছে এমন একটি হোস্টেলে উঠলাম। কিন্তু পড়াশুনার ব্যয় নির্বাহ করা হবে কিভাবে? পরিচিত এক বড় বোন টিউশনি যোগাড় করে দিলেন।

জীবনের প্রথম টিউশনী। ছাত্রীর বাসা ইন্দিরা রোডে। ছাত্রীর বাবা অঢেল টাকার মালিক। বছরে বেশীর ভাগ সময় ব্যবসায়ের কাজে বিদেশে যাওয়া-আসা করেন। আমার কাছে পড়ার পর মেয়েটির রেজাল্ট ভাল হচ্ছিলো। ভাল রেজাল্টের জন্য আমার বাহবা পাওয়ার কথা। তা  না। বরং মাস শেষে বিভিন্ন অজুহাতে ছাত্রীর মা আমার পাওনা থেকে কিছু টাকা কম দিতেন। আমি কিছু বলতাম না। সবজি বিক্রেতার ছেলে। শরীরে গেয়ো গন্ধ। তখন পর্যন্ত কিছু বলার মতো সাহস অর্জন করা হয়ে উঠেনি। এভাবে আমার প্রায় পাঁচ হাজার টাকা পাওনা হয়ে গিয়েছিলো। ঐ সময় পাঁচ হাজার টাকা আমার নিকট অনেক কিছু। ছাত্রীরা পরিবারসহ বিদেশ চলে যাওয়ার আগে আমার পাওনা টাকার কথা তুললে ছাত্রীর মা আমার সাথে এমন ব্যবহার করলেন যেন টাকা চাওয়াটা আমার অপরাধ হয়েছে। পরবর্তীতে শুনেছি ছাত্রীর পরিবার লন্ডনে বিশাল বিত্ত্ব-বৈভবের মালিক হয়েছেন। ঐ পরিবারের নিকট এখনও আমার পাঁচ হাজার টাকা পাওনা রয়ে গেছে।

সারা বছর টিউশনি করানোর পর ডিসেম্বর মাসে এক ছাত্রের মা বললেন- স্যার, এক হাজার টাকা কম রাখেন। হাতে আর টাকা নেই। ভাবলাম দেই মাফ করে। নেই যখন কি আর করা। মণিপুরীপাড়ায় সে বছর তাদের একটি নতুন ফ্লাট হয়েছিলো।

১৯৮৮ সনের বন্যায় বাড়িতে পানি উঠায় গ্রামের বাড়িতে যেতে হয়েছিলো। মাস শেষে  ছাত্রের মা আমার পাওনা থেকে অর্ধেক টাকা কর্তন করলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম- আন্টি, টাকা অর্ধেক কেন? স্যার, এ মাসে বেশ কয়েক দিনতো আপনি পড়ালেনই না। টাকা চাহিয়া আর লজ্জা পাইলাম না।

তেজকুনীপাড়ায় এক পূর্ব-পরিচিত এডভোকেটের বাসায় এক ছাত্রকে ডিসেম্বর মাসে বিশেষ অনুরোধে পনেরো দিন পড়িয়েছিলাম। বিনিময়ে সন্ধ্যার নাস্তাটুকু দিয়েছিলেন নিয়ম করে। টাকা চাওয়ার পর বললেন- স্যার, এখন তো বাসায় টাকা নেই। দুই একদিন পরে দিবো। পরে অনেকবার ফোন দিয়েছিলাম তাঁকে। প্রথম দিকে ধরতেন পরে আর ফোনই ধরেন না। শিক্ষক হয়ে বিরক্ত করা ঠিক হবে না ভেবে আর যোগাযোগ করিনি।

তেজতুরী বাজারে বিখ্যাত এক বাড়িতে পড়াতাম ফ্রান্স প্রবাসী একজনের ছেলেকে। এক মাসের বেতন দেননি তিনিও। কারণটা আজও জানতে পরিনি।

একবার এক মা খুব অনুরোধ করলেন তাঁর ছেলেকে পড়ানোর জন্য। পড়ানো শেষে টাকা দিলেন দুই হাজার টাকা কম। জিজ্ঞেস করলাম- কি ব্যাপার, টাকা কম দিলেন যে? বললেন- স্যার, বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য এতো টাকা নেবার কি দরকার আছে? কিছু কম নেন। কিছু কম মানে দুই হাজার টাকা? অনেক বলার পর আরও  এক হাজার টাকা দিলেন। কি আর করা। তর্ক না করে চলে আসলাম।

মোহাম্মদপুরে এক দূর-সম্পর্কীয় আত্মীয়ের ছেলেকে পড়িয়েছি কিছুদিন। এক শনিবার ছাত্রকে পড়াতে গেলে ছাত্রটি আস্তে আস্তে আমাকে বললো- স্যার, আপনার বাবা নাকি সবজি বিক্রি করতো?

হ্যাঁ, করতো। তাতে কী? তোমার পড়া বুঝতে কি কোন অসুবিধা হচ্ছে?

না স্যার, গতকাল মামা বললো তো তাই।

আমি সবজি বিক্রেতার ছেলে, এটা বলে যে আমার ছাত্রের নিকট আমাকে ছোট করতে চেয়েছিলো তাকে আমি চিনতে পেরেছিলাম। মধ্যপ্রাচ্যে চাকুরী করা বাবার বখে যাওয়া সন্তান। পরবর্তীতে ঐ ছেলের সাথে আমার অনেকবার দেখা হয়েছিলো। আমি কিছু বলিনি। ও’রা তো জানে না- আমার বাবা সবজি বিক্রেতা ছিলেন- এটা নিয়ে আমি গর্ববোধ করি। সবজি বিক্রেতার ছেলে ভাল রেজাল্ট করে ঢাকায় এসে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করছে- এটা তো গর্বেরই বিষয়। তাই নয় কি?

টিউশনি করা নিয়ে এ সকল  তিক্ত অভিজ্ঞতা আমি একদিন আমার বড় দাদার সাথে শেয়ার করেছিলাম। যার কিনা টিউশিনির উপর অগাধ অভিজ্ঞতা। মা-বাবা, ভাই-বোনদের খরচ মেটানোর জন্য হিসাব করে করে তিনি টিউশনি করতেন। ছাত্র-জীবনে সকলেরই কিছু সাধ-আহলাদ থাকে। টিউশনির কারণে এসব সাধ-আহলাদকে তিনি নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। তিনি যা বললেন তা শোনে তো আমি তাজ্জব! প্রতিজ্ঞা করলাম- আর কখনো টিউশিনি নিয়ে কোথাও কিছু বলবো না। আমাদের এক নিকট আত্মীয় দাদার এক মাসে টিউশনি থেকে পাওনা পুরো টাকাটাই মেরে দিয়েছিলেন। এখন ঐ আত্মীয় অঢেল টাকার মালিক। ঐ অঢেল টাকার মধ্যে দাদার পাওনা টাকাটাও নিশ্চয়ই আছে!

সবজি বিক্রেতার ছেলে টিউশনি করে করে পড়াশুনা করেছি। তাই বাসায় গিয়ে পড়ানো প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর বাবা-মায়ের প্রতি সবসময় একটা কৃতজ্ঞতা বোধ কাজ করে । সকল  ক্ষেত্রেই কিছু বাজে অভিজ্ঞতা থাকে। তাই টিউশনি করার সময় অনেক অনেক ভাল অভিজ্ঞতার মাঝে কিছু বাজে অভিজ্ঞতা নিয়ে কখনো আলোচনা করার ইচ্ছা ছিলো না। লেখালেখি করা তো দূরের কথা। কিন্তু না লিখে পারলাম কই। গতকালই যে এক ছাত্রের বাবা আসাদ গেইটে আমার গা ঘেষে চলে যাচ্ছিলেন।  আমি জিজ্ঞেস করলাম- ভাইয়া, কেমন আছেন? মনে হলো- এমন প্রশ্ন তিনি জীবনে প্রথমবার শুনেছেন। উত্তর দেয়া তো দূরের কথা। আমার দিকে তাকালেন না পর্যন্ত। এমন আচরণের হেতু কি ভাবতেই মনে পড়লো- এ লোকের কাছে তো আমার এক মাসের টিউশনির টাকা পাওনা আছে।