ছোট খাটো বিষয়-২৩

আলো ডি’রোজারিও: ১। সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরীপ মতে গত এক বছরে (২০১৭ সালে) গড় আয়ু বেড়েছে ছয় মাস। এখন আমাদের দেশের জনগণের গড় আয়ু ৭২ বছর। আমাদের সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ শতকরায়। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও পরিবেশের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপের কারণে গড় আয়ু ও শিক্ষার হার বেড়েছে। একই কারণে পূর্বের তুলনায় কমেছে জন্মকালে শিশুমৃত্যু হার (এক মাসের কম বয়সী শিশু প্রতি হাজারে এখন মারা যায় ১৭ জন) ও জন্মদানকালে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা (প্রতি হাজারে দুই জনেরও কম)। শিশুমৃত্যু হার ও মাতৃমৃত্যু হার কমাবার জন্যে ব্যাপক কর্মসূচী চলমান রয়েছে। আর খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর নজর দেয়া হয়েছে পুষ্টিমান সম্পন্ন খাবারের ওপর।

২। বর্তমানে বাংলাদেশের ৯৮ শতকরা মানুষ নিরাপদ পানি ব্যবহার করছেন। বিদ্যুতের সুবিধা ২০১৮ সালে পাচ্ছেন ৮৫ শতকরা মানুষ, পাঁচ বছর আগে বিদ্যুৎ সুবিধা পেতেন শতকরা ৬৭ জন। সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন শতকরা ৯ জন। বাকী মাত্র ছয় শতকরা ব্যবহার করছেন কেরোসিনের বাতি, যারা শীঘ্রই পেতে যাচেছন বিদ্যুৎ সুবিধা। বর্তমানে স্যানেটারী সুবিধা পাচেছন শতকরা ৮০ জন, বাকীরা স্যানেটারী সুবিধা পাবেন দ্রুতগতিতে। পানিবাহিত রোগাক্রান্তদের সংখ্যা দ্রুত কমছে, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার আওতা বৃদ্ধির কারণে।

৩। বাংলাদেশ যে দ্রুত এগিয়ে যাচেছ উপরোক্ত সূচকগুলোই তার প্রমাণ। সামাজিক এসব সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বের বহু দেশকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। এসব সূচকের বাস্তবতায় বর্তমান অর্থবছরে (জুলাই ২০১৮ – জুন ২০১৯) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে সাত শতাংশেরও বেশী। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল সাত শতাংশের কাছাকাছি, বিশ্বে এমন ধারাবাহিক ও উচ্চ হারের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি দেশে। বাংলাদেশে বর্তমানে যুবক ও মাঝবয়সী জনসংখ্যা বেশী, এরাই সরাসরি উৎপাদন কাজে জড়িত এবং এই সুবিধা বাংলাদেশ আরো বেশ কয়েক বছর ধরে পেতে থাকবে। তাই উচ্চ হারের গড় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সরকার সবিশেষ গুরুত্ব দিচেছ যুবসমাজের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর। এই বিষয়ে সরকারের সাথে একযোগে কাজ করছে বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা।

৪। বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে সফল। সফলতার ক্ষেত্রগুলো হ’ল: খাদ্যে স্বয়ংস্পূর্ণতা, কৃষির বহুমুখীকরণ, পোশাক শিল্পে রফতানি খাতে বিপুল প্রসার, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার স্বস্থিদায়ক রিজার্ভ তৈরী, নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ, গ্রামাঞ্চলে নানা ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোগের প্রসার, গড় আয়ু ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা, নারী সমাজের অগ্রগতি, উন্নয়ন মডেল হিসেবে খ্যাতি অর্জন, জঙ্গি দমন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি। যেসব ক্ষেত্রে খুব একটা সফলতা এখনো আসেনি এবং সেজন্যে গভীর আন্তরিকতার সাথে প্রচুর কাজ করতে হবে সেসব ক্ষেত্র হ’ল: সুশাসনের অভাব, দুর্নীতির প্রসার, শিক্ষার গুনগতমানের অবনতি, নীচের দিগের ২০ শতকরা মানুষের মৈালিক প্রয়োজন পূরণ না হওয়া, বিদেশে পুঁজি পাচার, সর্বত্র লাগামহীন দলীয়করণ, ক্রমবর্ধমান খেলাফী ঋণ, নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার অধ:পতন।

৫। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচেছ, এগিয়ে যাবেই। এই এগিয়ে যাবার পেছনকার প্রেরণা হ’ল: দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও সুর্নিদিষ্ট নেতৃত্ব, সর্বস্তরের জনগণের নব আত্মবিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ সরকারের জনকল্যাণে ও গণউন্নয়নে গৃহীত সর্বশেষ কর্মকান্ড সম্পর্কে আমরা কতটুকু অবহিত? বিশেষ করে দরিদ্রতম মানুষের কল্যাণে ও উন্নয়নে বাস্তবায়াধীন ১৬১টি প্রকল্পের আওতায় আমরা কতজন সুবিধা নিতে পারছি? সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত হ’ল ছোটবেলা হতে সততার অভ্যাস। সততার অভ্যাস সৃষ্টিতে স্কুলে স্কুলে ’সততা ষ্টোর’ স্থাপনে জাতীয় দুর্নীাত দমন কমিশনের উদ্যোগে আমাদের কয়টি স্কুল অংশ নিয়েছে? এমনিতরো অনেক প্রশ্নই তোলা যাবে হয়ত। মনে রাখতে হবে, দীর্ঘ মেয়াদে গণউন্নয়নে সরকারের সাথেই হতে হবে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত।

লেখক: প্রাক্তন পরিচালক, কারিতাস বাংলাদেশ

ছোট খাটো বিষয় ২২