সে যে হোক না কালো

খোকন কোড়ায়া:

ইস্টার্ন প্লাজায় একটা জুতার দোকান থেকে বের হয়ে আরেকটিতে ঢুকছিলাম। হঠাৎ শুনতে পেলাম আরে জীবনদা না! এক ঝলক তাকিয়েই চিনতে পারলাম মারীয়া ওরফে রিয়া। তবে ওর সঙ্গী ওই সুপুরুষটিকে আমি চিনতে পারলাম না।

রিয়া এগিয়ে এসে বলল- অনেক দিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হলো জীবনদা। সঙ্গে নিশ্চয় বৌদি। পরিচয় করিয়ে দেই। ও আমার হাসবেন্ড আতিক। আর আতিক এ সেই জীবনদা, যার কথা তোমাকে অনেকবার বলেছি।

রিয়ার স্বামী আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমার স্ত্রী শান্তাকে সালাম জানিয়ে হেসে বলল- এখনো নাটকে অভিনয় করেন নাকি দাদা?

আমি চুপসে গিয়ে বললাম- না, মানে।
– মানে আপনাদের গ্রামে বড়দিনের নাটকে প্রেমের অভিনয় করতে গিয়েইতো দু’জনের মধ্যে সত্যিকারের প্রেম হয়ে গিয়েছিল, তাইনা দাদা? কিন্তু আপনাদের বিয়েটা যেন কেন হলো না?
– রিয়া বলল- সেটাও তো তোমাকে অনেকবার বলেছি।
– বলেছিলে নাকি, কই আমার মনে নেইতো!
– আমি তো কালো। একটা কালো কুৎসিত মেয়েকে তাদের একমাত্র ছেলের বউ করে ঘরে তুলতে জীবনদার বাবা-মা কিছুতেই রাজি হলেন না। তাই আমাদের বিয়েটা হলো না।

আতিক হেসে বলল- ভাগ্যিস আপনি রিয়াকে বিয়ে করেননি, নইলে আমার কী অবস্থা হতো বলুন তো? এই দুর্মূল্যের বাজারে এত গুণে গুণান্বিতা এমন লক্ষ্মী বউ আমি কোথায় পেতাম!

রিয়া রাগের ভান করে বলল- ফাজলেমো হচ্ছে, না! তবে জীবনদা, বৌদি কিন্তু খুবই সুন্দরী।

ঘটনার আকস্মিকতায় এতটাই অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম যে, শান্তার দিকে এতক্ষণ তাকাতেই পারিনি। এবার সাহস করে চেয়ে দেখলাম শান্তার মুখটা ফ্যাকাশে। রিয়ার দিকে তাকিয়ে ও বলল- ধন্যবাদ। তবে আপনিও কিন্তু সুন্দর।
– কী যে বলেন বৌদি, আমি তো কালো।
– কালো হলেই অসুন্দর আর ফর্সা হলেই সুন্দর এটা কোন কথা নয়। আমি মনে করি শুধু গায়ের
রঙই একটি মেয়ের সৌন্দর্যের পরিচায়ক নয়। তার মুখের গড়ন, শরীরের গঠন, কথা বলার ভঙ্গি, আদব-কায়দা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এ রকম আরও অনেক কিছু মিলিয়ে একটি মেয়েকে সুন্দরী বলা যায়। সে হিসাবে শুধু গায়ের রঙ কালো বলেই আপনাকে অসুন্দর মনে করার কোনো কারণ নেই।

আতিক উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল- যর্থাথ বলেছেন বৌদি। একেবারে আমার মনের কথা বলেছেন।

রিয়া শান্তাার দিকে তাকিয়ে বলল-আমাকে তুমি করে বললে খুশি হবো বৌদি। গ্রাম সম্পর্কে আমি কিন্তু আপনার ননদ হই। অনেক দিন হলো গ্রামে যাওয়া হয় না। আমাদের সমাজপতিরা ফতোয়া জারি করেছেন- আমার বিধর্মী স্বামীকে নিয়ে আমি যদি বাড়িতে যাই তবে উনারা আমার বাবা-মাকে একঘরে করবেন। ভাবতে কষ্ট হয় বৌদি, আমরা এখনো সেই মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারনা নিয়েই আছি।

আতিক বলল- আজ তাহলে আসি জীবনদা। আমরা শান্তিনগর থাকি। কার্ডটা রাখুন, বাসার ঠিকানাও আছে। বৌদিকে নিয়ে চলে আসুন একদিন। জমিয়ে আড্ডা দেয়া যাবে।

আমিও পকেট থেকে আমার ভিজিটিং কার্ড বের করে বললাম- বাসার ঠিকানাটা আমি লিখে দিচ্ছি।

রিয়া বলল- আসি জীবনদা। আমরা কিন্তু একদিন ঠিকই চলে আসব বৌদি।

শান্তা বলল- অবশ্যই। এলে আমি খুব খুশি হবো।

রিকশায় বসে অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলছিলাম না। গুমোট ভাবটা কাটানোর জন্য আমি অপরাধীর ভঙ্গিতে বললাম- তুমি কি মাইন্ড করেছ?

শান্তা নির্বিকার কণ্ঠে বলল- কী ব্যাপারে?

– না মানে রিয়ার কথা তোমাকে কখনো বলিনিতো।

– বলাটা কিন্তু উচিত ছিল।

– আসলে বিযয়টাকে …। শান্তার অতি গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে কথাটা শেষ করার সাহস পেলাম না আমি। বাসায় গিয়েও আর কোনো কথা হলো না শান্তার সঙ্গে। কাজের মেয়েটা যথাসময়ে টেবিলে খাবার সাজিয়ে ডাকল। দু’জন টেবিলের দু’প্রান্তে বসে যন্ত্রের মতো কিছু ভাত-তরকারি গলাধঃকরণ করলাম। এরপর অন্যান্য দিনের মতোই শান্তা টুকিটাকি সাংসারিক কাজ করতে লাগল আর আমি ড্রইং রুমের সোফায় বসে রিমোট হাতে নিয়ে টিভির চ্যানেল পরিবর্তন করতে লাগলাম।

প্রায় মিনিট বিশেক পরেই শান্তা ড্রইং রুমে এসে আমার উল্টোদিকের সোফায় বসে বলল- সাউন্ড কমাও ।

আমি রিমোটে আঙ্গুল স্পর্শ করে শান্তার দিকে তাকাতেই ও বলল- রিয়ার বিয়ে হয়েছে কবে?

– তা প্রায় দু’বছর হয়।
– অর্থাৎ আমাদের বিয়ের তিন বছর পরে। রিয়া লেখাপড়া করেছে কদ্দুর?
– তখন তো বিএ পাস করেছিল। শুনেছি পরে মার্স্টাস করেছে। এখন একটা এনজিওতে চাকরি করে।
– লেখাপড়া জানা ছাড়া আর কোন গুণ আছে ওর?
– ভালো গাইতে পাড়ত, আবৃতি করতে পাড়ত, আর নাটক ……… শুনেছি একটা গ্রুপ থিয়েটারের সঙ্গে
যুক্ত আছে এখন।

– এমনিতে রিয়া কেমন মেয়ে, মানে তোমরা যাকে স্বভাব-চরিত্র বলো। শান্তার গতিবিধি আমি বুঝতে পারছিলাম না, বললাম- ভালোই তো ছিল …….।
– খারাপ হলো অন্য ধর্মের ছেলে বিয়ে করে, তাই না?

আমি কেনো উত্তর দিলাম না। শান্তা এবার আমার চেখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল- তুমি রিয়াকে বিয়ে করলে না কেন? ও তো তোমার অযোগ্য ছিল না!

– না মানে, তুমি তো জানো আমি বাবা-মার একমাত্র ছেলে। ওরা যে কিছুতেই রাজি হল না।
– বাবা-মা রাজি হলো না আর ল্যাঠা চুকে গেল! তুমি না রিয়াকে ভালবাসতে! চেষ্টা করলে তুমি কি পারতে না বাবা-মাকে রাজি করাতে! আর যখন প্রেম করেছিলে তখন কি দেখনি রিয়ার গায়ের রঙ কালো। নাকি ভেবেছিলে কালো মেয়েদের সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলা করা যায়; কিন্তু তাদের বিয়ে করা যায় না।

– তুমি কিন্তু অযথা উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছ শান্তা।

– উত্তেজিত হচ্ছি, তবে সঙ্গত কারণেই হচ্ছি। শুধু গায়ের রঙ কালো বলেই একটা মেয়েকে বিয়ে করা যায়

না , তোমার মতো একটা শিক্ষিত ছেলে যখন এরকম ধারণা পোষণ করে তখন…।

– এটা আমার কথা নয় শান্তা। আর তা ছাড়া রিয়ার সঙ্গে আমার অতটা গভীর সম্পর্ক ছিল না যে ওকে আমার বিয়ে করতেই হবে।
– বেশ বললে এবার। একেই বলে কাপুরুষ। প্রেম করেছ অথচ সেটা স্বীকার করার সাহসটুকুও নেই। তোমার মতো ছেলেদের জন্যই আমাদের মেয়েরা আজ অন্য ধর্মাবলম্বী ছেলেদের হাত ধরে ঘর ছেড়ে, সমাজ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তোমরা ওদের সঙ্গে প্রেম করবে (চেষ্টা করবে শয্যাসঙ্গী করতে) কিন্তু বিয়ে করবে না কিছুতেই। তারপর ওরা যখন একটু সুখের সন্ধানে সমাজের বাইরে পা রাখবে তোমরা ওদের বলবে কলঙ্কিনী, দুঃশ্চরিত্রা। ওদের পরিবারকে করবে সমাজচ্যুত। আসলে তোমার মতো আধুনিকতার খোলস পরা ভীরু, কপট আর সংকীর্ণমনা, হৃদয়হীন মানুষদের জন্যই আমাদের সমাজ এতটা পিছিয়ে আছে।
– তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ শান্তা।
– শান্তা বেডরুমে গিয়ে বাতি নিভিয়ে দিল। আমিও টিভি আর লাইট অফ করে সোফায় শুয়ে পড়লাম। ভাবতে ভাবতে এক সময় মনে হলো শান্তা কথাগুলো ভুল বলেনি। রিয়াকে বিয়ে না করে আমি ওর প্রতি ভীষণ অবিচার করেছি এবং সমাজের ক্ষতি করেছি। আসলে রিয়াকে আমি সস্তা ভেবেছিলাম। আমি তো জহুরী নই, জহুর চিনবো কি করে!

– আমার অশান্ত মনটা দু’টি কারণে শান্ত হয়ে এল। এক, রিয়া সুখী। উদার মনের একজন স্বামী পেয়েছে ও। দুই, আমার সঙ্গে রিয়ার প্রেম ছিল বলে শান্তা কষ্ট পায়নি, কষ্ট পেয়েছে আমি রিয়াকে বিয়ে করিনি বলে।

সুপ্রিয় পাঠক, আমার গল্প এখানেই শেষ। তবে অবিবাহিত যুবক ভাইদের প্রতি আমার একটা অনুরোধ আছে, আপনার আশপাশে রিয়ার মতো অনেক কালো মেয়ে আছে। একটু ভালো করে লক্ষ্য করুন, দেখবেন, ওদের মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক সৌন্দর্য। ওদের মাঝে খুঁজে পাবেন অনেক গুণ। পাবেন মমতা, ভালবাসা। ওদের একজনকে বিয়ে করে ফেলুন, নিশ্চিত আপনি সুখী হবেন।