বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশনের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ১৪২৫

বিভাস রোজারিও:
বাঙালীর প্রাণের মেলা পহেলা বৈশাখ। বাংলা নতুন বছরের দিনটি উদযাপনে দেশের মতো আমেরিকার অঙ্গরাজ্য মেরিল্যান্ডের সিলভার স্প্রিং শহরেও বাঙালী প্রবাসীদের ছিল নানা আয়োজন। আর এই আয়োজনটি বরাবরের মতো এইবারও সম্পূর্ণভাবে সার্থক করে তুলেছে “বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশন ইংক “।
শুরুতে সগঠনের প্রেসিডেন্ট মিস্টার মাইকেল খোকন রোজারিও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। রোসকো আর নিক্স এলিমেন্টারি স্কুলে ১৪ ই এপ্রিল, শনিবার বিকেল ছয় ঘটিকায় সিলভার স্প্রিং শহরে যখন তাপমাত্রা ৮০ ডিগ্রি ছুই ছুই সেই সময় চক চকে রোদ্দের আভায় যেন লাল সবুজের খেলায় মেতে উঠেছে গাছে ফুঁটে থাকা সেই চেরী ফুল গুলি আর বৈশাখীর আনন্দে যেন মেতে উঠে এই শহেরের ছোট ছোট বাচ্চা, ছেলে-মেয়ে, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী এমনকি বয়স্করাও। বর্তমান বোর্ডের সেক্রেটারী মিসেস নিয়তী রেগো সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেন এবং বর্তমান বোর্ডের সবাইকে পরিচয় করিয়েদেন। তারপর বিপুল উৎসাহে প্রবাসী বাংলাদেশীরা বাদ্যযন্ত্র সহকারে আনন্দ শোভাযাত্রার মধ্যে দিয়ে শুরু করা হয় বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশন এর বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ১৪২৫।
সুকুমার পিউরিফিকেশন ও মুক্তা রোজারিওর পরিচালনায় হলের ভীতরে মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রবেশের সাথে সাথে ঝাঁকঝমক পূর্ণভাবে শুরু হয় দেশীয় বিভিন্ন রকমের বাদ্যযন্ত্রের উপর মিউসিক আর তাতে ফুটে উঠে আধুনিক,লালন,বাউল,রবীন্দ্র, নজরুল সংগীত থেকে দেশীয় সকল প্রকারের গানের মিউসিক। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে গানটি ছাড়া পহেলা বৈশাখ অসম্পূর্ণ থেকে যায় সেই “এস হে বৈশাখ এস এস” গানটি গেয়েছেন এঞ্জেলিনা, মেঘা, এমেলিন, মনিশা, অনন্ত, এমি, রূপকথা, এরিকা, অড্রি, পিটার এবং রোদেলা। সিনথিয়া গোমেজ এর পরিচালনায় নৃত্য “মঙ্গল দ্বীপ জেলে” ও “বাজে বংশী রাজহংসী নাচে” এবং মঞ্জুরী নৃত্যালয় থেকে শিল্পী গ্লোরিয়া রোজারিওর পরিচালনায় নৃত্য “হা রে রে রে”, “ময়নারে তোর লম্বা মাথার কেশ” এবং “বাজেরে বাজে ডোল” দর্শকদের মন কেড়ে নেয়। আর এইসমস্ত নাচে অংশ নেয় সিনথিয়া, লরেন, রিয়া, মুন, অর্চি, পিওন, এঞ্জেল, মাতৃ, শ্রেয়া, রিচেল, হলি, এলিনিয়া, আরিয়ানা, লোৱা, জুলিয়া, রূপকথা, সামান্তা, এলিজাবেথ, সেন্ড্রা, রিতি, সারোল, পিটার এবং মনিশা। একক গান নিয়ে আসেন অড্রি, রূপকথা, এরিকা এবং বৈশাখী গানে নৃত্য নিয়ে আসেন হৃদি পেরেরা। সুকুমার পিউরিফিকেশনের ডোলের তালে এবং বাল্টিমোর থাকে আসা অতিথী শিল্পী মিস্টার টমাস গোমেজের “তাকডুম তাকডুম বাজে বাংলাদেশের ডোল” ও “কেমনে ভুলিবো আমি” গানের টানে দর্শকদের মাঝে আনন্দের ও নাচের ঝড় তুলে দেন। বর্ষবরণ বাঙালীদের জন্য হয় মিলন মেলা। দীর্ঘ ব্যস্ততার অবসরে বৈশাখী মেলা প্রবাসী বাঙালিদের দেয় অফুরন্ত আনন্দ আর সেই আনন্দের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিয়েছে এসোসিয়ানের শিল্পীবৃন্দ “যে দেশেতে শাপলা শালুক ঝিলের জলে ভাসে” এবং “নবীন আশা জাগলো যে রে আজ” এই দুটি গানের মাধ্যমে। সুকুমার পিউরিফিকেশন এবং মুক্তা রোজারিওর পরিচালনায় লোকজ গীতিতে অংশনেয়া মেঘা,ত্রপা, ঐশী ও মুক্তা রোজারিওর গান উপস্থিত সবার মাঝে প্রাণচঞ্চলতা যেন আরো বাড়িয়ে দেয়। সেই সাথে রেমন্ড পলাস রোজারিওর বৈশাখের “নববর্ষ” কবিতা আবৃতিটি ছিল অসাধারণ। শিউলী রোজারিও, নিয়তি রেগো ও চৈতালী কোড়াইয়ার পরিচালনায় “আমার মাইজ্জা ভাই সাইজ্জা ভাই কৈ গেলা রে” গানের সাথে চমৎকার ভাবে গ্রাম বাংলার ধান কাঁটার দৃশ্য তুলে ধরেন সৈকত, রায়েন, এইডেন, এরিয়ানা, এরিকা, লোৱা, মেঘা, এঞ্জেলিনা ও অড্রি। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে গ্রেসি রোজারিও এবং যোসেফ গোমেজ এর পরিচালনায় নিয়ে আসেন নাচে গানে বৈশাখী মেলার ফ্যাশন।
আর আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য জারীগান নিয়ে আসেন মিস্টার জীবন পেরেরা এবং মিস্টার নির্মল গোমেজের বাউলের গানও ছিলো লক্ষণীয়। অনুষ্ঠানের সর্বশেষ চমক ছিল বিভাস রোজারিও ও শিউলী রোজারিওর পরিচালনায় বাস্তবসম্মত নাটক “বৈশাখী মন, বৈশাখী ভালোবাসা” যা উপস্থিত দর্শকদের মন কেরে নেয়। আর অভিনয় শিল্পীবৃদ্ধরা হলেন মারিও নির্মাণ মন্ডল, প্রিয়াঙ্কা রোজারিও, চৈতালি কড়াইয়া, জীবন পেরেরা , জিনিয়া ফার্নান্ডেজ , এরিক নিক্সন মন্ডল, খ্রীষ্টফার গোমেজ এবং শিউলী রোজারিও। হৃদয়, কাজল এবং সুকুমার পিউরিফিকেশনের ব্যান্ড সংগীত যেন সবাইকে বৈশাখীর আনন্দে মাতিয়ে রাখে। নববর্ষ উযাপনে খাবার ও পোশাক অন্যতম বিষয়। খাবারের টেবিলে সাজানো ছিল পান্তা-ইলিশ, বিভিন্ন ধরণের ভর্তা, চটপটি, ঝালমুড়ি, বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি এবং আমাদের ঐতিহ্যের সকল ধরণের পিঠা এবং আরো হরেক রকমের খাবার যা এসোসিয়েশনের লোকজন বাড়ী থেকে স্বেচ্ছায় নিজ উদ্যোগে বানিয়ে নিয়ে আসে। সেই সাথে বসে বিভিন্ন বাঙালী পোশাকের দোকান যেখানে উল্লেখ্য ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের কাপড়ই বেশী দেখা যায়।
সেইসাথে মিস্টার অনীল বার্নার্ড রোজারিও বাংলার ঘরোয়া ঐতিহ্য সুন্দরভাবে প্রদর্শন করেছেন। অনুষ্ঠানের সর্ব শেষ আকর্ষণটি ছিল লটারি পর্ব এবং তা পরিচালনা করেন শ্যামল ডিকস্টা, স্ট্যালিন লাহেড়ী এবং জেনী এস লাহেড়ী। আর গ্র্যান্ড পুরুস্কার ৫৫” টেলিভিশনের স্পনসর করেছেন বিশিষ্ট রিয়ালেটর ব্যাবসায়ী মিস্টার আলবার্ট গোমেজ এবং লোন অফিসার তৌফিক মতিন। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে স্বল্পসময়ে জন্য উপস্থিত হন সেন্ট ক্যামিলাস ক্যাথলিক গির্জার পালপুরোহিত ব্রাদার ক্রিস পশ্চ এবং তিনি সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান। সেই সাথে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিসিসিএস ক্রেডিটের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিস্টার বাবলু ডি কস্তা এবং সেই সাথে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশন এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান বি.সি.এ.সি.সি.ইউ ক্রেডিটের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিস্টার খৃস্টফার রড্রিগীস। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশন এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মিস্টার জুড গোমেজ, মিস্টার সম্পদ পেরেরা, মিস্টার ডেনিশ রিবেরু এবং প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মিস্টার লিও রড্রিগীস এবং বি.সি.এ.সি.সি.ইউ ক্রেডিটের সাবেক প্রেসিডেন্ট মিস্টার সুবোধ আর্থার রোজারিও ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মিস্টার সুনীল বেঞ্জামিন গোমেজ সহ আরো অনেক উপদেষ্টা মন্ডলী ও এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তি বর্গ।
অনুষ্ঠানটির সার্বিক সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন বিভাস রোজারিও এবং গ্রেস ডিকস্টা এবং সাউন্ড কন্ট্রোলে ছিলেন ডেনিম রোজারিও এবং স্ট্যালিন লাহেরী। আর মঞ্চ সজ্জায় ছিল রাখি রোজারিও, নির্মাণ মারিও মন্ডল, এরিক নিক্সন মন্ডল, জীবন পেরেরা, সুমিত গোমেজ, রেশমা রোজারিও এবং আরোও অনেক যুবক যুবতীরা । অনুষ্ঠানে সর্বক্ষণ তবলায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন সুকুমার পিউরিফিকেশন এবং ড: পল ফেবিয়ান গোমেজ। আর পুরো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি অর্গানাইজ করেন এসোসিয়েশনের বর্তমান সংস্কৃতিক সম্পাদিকা ড: প্যাট্রিসিয়া শুকলা গোমেজ। পরিশেষে সংঘঠনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডলি রড্রিগীস সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি করেন। উল্লেখ্য মেরিল্যান্ডের সিলভার স্প্রিং শহরে “বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশন” প্রতি বছরই অনেক ঘটা করে আয়োজন করে থাকে বৈশাখী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।