ফোনে মত্ত না থেকে মা-বাবা, দাদা-দাদির সঙ্গে সময় দিতে তরুণদের প্রতি পোপের আহ্বান

মা-বাবা, দাদা-দাদি ও নানা-নানির সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতা ও দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করতে তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পোপ ফ্রান্সিস। শনিবার ঢাকার নটর ডেম কলেজ মাঠে যুব সমাবেশে দেওয়া ভাষণে পোপ বলেন, আশপাশের পারিবারিক সম্পর্কের প্রতি অমনোযোগী হয়ে ফোনে মত্ত থেকো না। মা-বাবাসহ পরিবারকে সময় দাও। তাদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন কর।

অনুষ্ঠানে ঢাকার আর্চবিশপ কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’ রোজারিও, রাজশাহীর বিশপ জের্ভাস রোজারিও, যুব প্রতিনিধি আন্তনী তরঙ্গ নকরেক ও উপাসনা রুথ গোমেজ বক্তব্য রাখেন।

তরুণ সমাজের উদ্দেশে পোপ বলেন, তোমাদের সঙ্গে যখন সাক্ষাৎ করি তখন মনে হয় যেন আমি যুবক/তরুণ হয়ে গেছি। তোমরা সবাই উদ্দীপ্ত। এই যৌবন-দীপ্ত উদ্দীপনা নতুন অভিযাত্রার চেতনার সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত।

তিনি আরও বলেন, আমি আনন্দিত এই জন্য যে, এখানে আমাদের সাথে একত্রে ক্যাথলিক যুবক-যুবতীদের পাশাপাশি আছে অনেক মুসলিম বন্ধু এবং অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসী বন্ধুরা। আজকের এই সমাবেশের মধ্যদিয়ে তোমরা পারস্পরিক সহাবস্থানের পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করবে, এমন প্রত্যয়ের কথাই প্রকাশ করছ; তোমরা প্রকাশ করছ যে, ধর্মীয় মতপার্থক্য থাকলেও তোমরা অন্যদের নিকটজন হয়ে উঠবে।

পোপ ফ্রান্সিস কলেজ প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছালে বরিশালের বিশপ লরেন্স সুব্রত হাওলাদার, নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও, নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর ফাদার প্যাট্রিক গাছনী পোপ তাকে স্বাগত জানান। এ সমাবেশে বিভিন্ন ধর্মের প্রায় ১০ হাজার তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করে।

নটর ডেম কলেজে আয়োজিত যুব সমাবেশে পোপ মহোদয় যে বক্তব্য দিয়েছেন তার  বাংলা অনুবাদ নিচে দেয়া  হলো।

শুভ সন্ধ্যা, প্রিয় যুববন্ধুগণ!

অবশেষে আমরা এখানে সমবেত হলাম! তোমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য আমি তোমাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। বিশপ জের্ভাসকে আমি ধন্যবাদ জানাই সুন্দর বক্ত্যবের জন্য; আরও ধন্যবাদ জানাই উপাসনা ও আন্তনীকে, তাদের জীবন অভিজ্ঞতা সহভাগিতা করার জন্য। যুবদের একটা স্বাতন্ত্র আছে ঃ তোমরা সব সময়ে উৎসাহে ভরপুর। তোমাদের সাথে যখনই আমি সাক্ষাৎ করি, তখনই আমি উপলব্ধি করি যে, আমি যুবক হয়ে গেছি। উপাসনা, তোমার জীবন সাক্ষ্যে তুমি এ বিষয়েই বলেছ; তুমি বলেছ তোমরা সবাই “খুবই উদ্দীপ্ত”। সেটি আমি দেখছি এবং উপলব্ধি করছি। এই যৌবন-দীপ্ত উদ্দীপনা নতুন অভিযাত্রার চেতনার সাথে সম্পর্কযুক্ত। তোমাদের জাতীয় কবিদের একজন, কাজী নজরুল ইসলাম এটাই প্রকাশ করেছেন- যখন তিনি দেশের যুব শ্রেণীকে নির্ভীক হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন: “আঁধার নিঙ্গাড়ি আলো আনিত যে…”। যুবরা সদা প্রস্তুত সামনে এগিয়ে চলতে কোন কিছু বাস্তবায়নের জন্য; ওরা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। আমি তোমাদেরকে সুসময়ে এবং দুঃসময়ে এমন উদ্দীপনা নিয়ে সামনে এগিয়ে চলা অব্যাহত রাখতে অনুপ্রাণিত করছি। “এগিয়ে চলো,” বিশেষভাবে তখন- যখন সমস্যা ও দুঃখে নুয়ে পড়ার উপলব্ধি তোমাতে আসে, যখন তুমি বাইরে তাকিয়ে দেখ, অথচ মনে হয় যেন ঈশ্বর প্রান্ত-সীমা পর্যন্ত কোথাও নেই।

কিন্তু সামনে অগ্রসর হবার সময় তোমরা কিন্তু অবশ্যই সঠিক পথটিই বেছে নিও। এর মানে কি? এর মানে হচ্ছে জীবনের ভিতর দিয়ে “যাত্রা করা”, “লক্ষ্যহীনভাবে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানো” নয়। আমাদের জীবন দিক নির্দেশনাহীন নয়, এ জীবনে ঈশ্বরের দেয়া একটা উদ্দেশ্য আছে। তিনি তাঁর কৃপা দিয়ে আমাদের পরিচালনা দান করে, আমাদের দিক নির্দেশনা দেন। তিনি যেন আমাদের ভেতরে একটি কম্পিউটার সফ্ট ওয়্যার বসিয়ে দিয়েছেন, যা তাঁর স্বর্গীয় প্রোগ্রামকে খুঁজে পেতে সাহায্য করে এবং স্বাধীন ভাবে তাতে সাড়া দিতেও সাহায্য করে। কিন্তু সকল সফ্ট ওয়্যারের মতো এটিরও প্রয়োজন আছে আপ-ডেইটেড হওয়ার। তোমাদের প্রোগ্রামকে আপ-ডেইট করার কাজ চালিয়ে যাও ঈশ্বরের বাণী শুনে এবং তাঁর ইচ্ছা পালনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে।

আন্তুনী, তোমার জীবন সাক্ষ্যে তুমি এই চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বলেছ যে, যুবক-যুবতী হিসেবে “তোমরা বেড়ে উঠছ এমন একটি ভঙ্গুর পৃথিবীতে, যে পৃথিবী প্রকৃত জ্ঞানের জন্য আর্তনাদ করছে”। তুমি “প্রকৃত জ্ঞান” কথাটি ব্যবহার করেছ আর আমাদের কাছে প্রকাশ করেছ একটি যুৎসই নীতি। যখনই তোমরা “অভিযাত্রা” থেকে সরে গিয়ে “লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরাঘুরি” শুরু কর, তখনই কিন্তু সব প্রকৃত জ্ঞান হারিয়ে যায়। একটি বিষয় যা আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করে ও দিকনির্দেশনা দেয়, তা হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞান, যেটির জন্ম হয় ঈশ্বরে বিশ্বাস থেকে। এটি এ পৃথিবীর মেকি জ্ঞান নয়। এটি সেই প্রজ্ঞা, যা আমরা দেখি আমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদী, নানা-নানীর চোখে, যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেছিলেন। খ্রীষ্টান হিসেবে আমরা ঈশ্বরের উপস্থিতির আলো দেখতে পাই তাঁদের চোখে। এই আলোই তাঁরা যীশুতে আবিষ্কার করেছেন, যিনি ঈশ্বরের প্রকৃত প্রজ্ঞা (দ্রষ্টব্য ঃ ১ম করি: ১ঃ২৪)। এই প্রজ্ঞা লাভ করতে হলে জগতের দিকে, আমাদের পারিপার্শিকতার দিকে, আমাদের সমস্যাগুলোর দিকে, সব কিছুর দিকেই তাকাতে হবে ঈশ্বরের দৃষ্টি দিয়ে; অন্যদের কথা শুনতে হবে ঈশ্বরের কান দিয়ে, ভালবাসতে হবে ঈশ্বরের হৃদয় দিয়ে এবং সবকিছুর বিচার করতে হবে ঈশ্বরীয় মূল্যবোধ দিয়ে।

এই প্রকৃত জ্ঞানই মিথ্যা সুখের প্রতিশ্রুতিকে চিনতে এবং প্রত্যাখ্যান করতে সাহায্য করে। যে কৃষ্টি এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই কৃষ্টি কখনও মুক্তিদায়ী হতে পারে না; এটি শুধুই আত্ম-কেন্দ্রীকতার দিকেই নিয়ে যায়- যার ফলে মানুষের অন্তর অন্ধকার ও বিতৃষ্ণায় ভরে উঠে। ঐশ প্রজ্ঞা আমাদের বলে দেয়, আমাদের চেয়ে ভিন্ন কাজ ও চিন্তার মানুষকে কি করে স্বাগত জানাতে হয়, গ্রহণ করতে হয়। এটি সত্যিই দুঃখের, যখন আমরা আমাদেরকে নিজেদের ক্ষুদ্র পৃথিবীতে গন্ডিবদ্ধ করে ফেলি, যখন আমরা শুধু নিজেদের দিকেই তাকাই। যখন আমরা “আমার কথা ছাড়া অন্য কিছু চলবে না”Ñ এই নীতি চাপিয়ে দেই, তখনই আমরা ঘেরা-টোপে আটকে যাই এবং নিজেদেরকে আবদ্ধ করে ফেলি। যখন একটি জনগোষ্ঠী, একটি ধর্ম বা একটি সমাজ একটি “ছোট্ট পৃথিবীতে” গিয়ে আবদ্ধ হয়, তখন তারা মহত্তমকে হারিয়ে ফেলে এবং হঠাৎ করে ‘আমিই সঠিক’ ধরণের মনোবৃত্তিতে ঢুকে পড়ে এই ধারণা নিয়ে ঃ “আমি ভাল, আর তুমি খারাপ”।

উপাসনা, তুমি এই ধরণের চিন্তাধারার পরিণাম সম্পর্কে আলোকপাত করেছ ঃ “আমরা দিক ভ্রান্ত হই আর হারিয়ে যাই” এবং “জীবন আমাদের কাছে হয়ে উঠে অর্থহীন।” ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া প্রকৃত জ্ঞান আমাদেরকে অন্যদের কাছে উন্মুক্ত করে। এটি আমাদের সাহায্য করে ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ ও অর্থহীন নিশ্চয়তার উর্ধ্বে উঠতে, যা আমাদেরকে মহৎ আদর্শের দিকে তাকাতে বাধা দেয়। এই মহৎ আদর্শগুলিই আমাদের জীবনকে করে তোলে আরও সুন্দর, আরও মূল্যবান।

আমি আনন্দিত এই জন্য যে, এখানে আমাদের সাথে একত্রে কাথলিক যুবক-যুবতীদের পাশাপাশি আছে অনেক মুসলিম বন্ধু এবং অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসী বন্ধুরা। আজকের এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে তোমরা পারস্পরিক সহাবস্থানের পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করবে, এমন প্রত্যয়ের কথাই প্রকাশ করছ; তোমরা প্রকাশ করছ যে, ধর্মীয় মতপার্থক্য থাকলেও তোমরা অন্যদের নিকটজন হয়ে উঠবে। এটি আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় বুয়েনস আইয়েরেস-এর দরিদ্রতম স্থানের একটি নতুন ধর্মপল্লীর অভিজ্ঞতার কথা। একদল ছাত্র সেই ধর্মপল্লীর জন্য কয়েকটি কক্ষ তৈরী করে দিচ্ছিল; আর পালক পুরোহিত আমাকে নিমন্ত্রণ দিয়েছিলেন তাদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য। তাই আমি সেখানে গেলাম আর পালক পুরোহিত একে একে তাদের সবার সাথে আমাকে এই বলে পরিচয় করিয়ে দিলেন ঃ “এ হচ্ছে স্থপতি। সে একজন ইহুদী। আর এ হচ্ছে একজন কম্যুনিষ্ট। আর এ হচ্ছে একজন সক্রিয় কাথলিক” (দ্রষ্টব্য ঃ ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে ভাষণ, হাভানা, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫)। এই ছাত্রদের সবাই বিশ্বাসের দিক থেকে ছিল আলাদা; কিন্তু তবুও তারা সার্বজনীন কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছিল। তারা সামাজিক বন্ধুতের প্রতি ছিল উন্মুক্ত। একই সাথে একত্রে মিলিত হয়ে একে অন্যকে সাহায্য করার পথে কোন প্রতিবন্ধকতাকে “না” বলার ক্ষেত্রে তারা ছিল স্থির-প্রতিজ্ঞ।

ঈশ্বরের প্রজ্ঞা আমাদেরকে নিজেদের গন্ডির উর্ধ্বে উঠে আমাদের কৃষ্টিগত  ঐতিহ্যের শুভ দিকগুলো দেখতে সাহায্য করে। তোমাদের কৃষ্টি তোমাদের শিখায় বয়ঃজেষ্ঠ্যদের সম্মান করতে। আমি আগেই বলেছি যে, বয়স্করা প্রজন্মের ধারাবাহিকতাকে মূল্য দিতে আমাদের শিক্ষা দেন। তাঁরা তাঁদের সাথে বহন করেন অনেক স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতালব্ধ প্রজ্ঞা- যা আমাদেরকে অতীত ভুলের পুনরাবৃত্তি পরিহারে সাহায্য করে। বয়োজেষ্ঠ্যদের আছে “ফাঁক পূরণ করার বিশেষ শক্তি”। এ ভাবেই তাঁরা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধগুলোকে তাঁদের ছেলেমেয়ে এবং নানী-নাত্নীদের কাছে রেখে যাওয়া নিশ্চিত করেন। তাঁদের কথা, ভালবাসা, ¯েœহ-বাৎসল্য এবং উপস্থিতি আমাদের এই উপলব্ধি দান করে যে, ইতিহাস আমাদের থেকে শুরু হয়নি; বরং আমরা সুপ্রচীন এক প্রবহমানতার অংশ; আর সেই বাস্তবতা আমাদের থেকেও সমৃদ্ধ। তোমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদী, নানা-নানীর সাথে সব সময় আলাপ করবে। তোমার আশে-পাশে যারা আছে তাদের প্রতি অমনোযোগী হয়ে তোমার ফোনের সাথে সারাদিন খেলায় মত্ত থেকে সময় কাটিয়ে দিও না।

উপাসনা ও আন্তুনী, তোমাদের জীবন-সাক্ষ্য তোমরা শেষ করেছ প্রত্যাশার কিছু অভিব্যক্তি দিয়ে। ঈশ্বরের প্রজ্ঞাই আমাদের ভেতরে প্রত্যাশাকে পুনর্জাগরিত করেন; সেই প্রজ্ঞাই সাহসের সাথে ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে আমাদের সাহায্য করে। আমরা খ্রীষ্টানগণ এই ঐশ প্রজ্ঞা লাভ করি প্রার্থনায় যীশুর সাথে আমাদের ব্যক্তিগত সাক্ষাতে, সাক্রামেন্তসমূহে এবং সুনির্দিষ্টভাবে দরিদ্র, অসুস্থ্য, কষ্টভোগী এবং পরিত্যক্তদের জন্য আমাদের সেবায়। যীশুর মধ্যেই আমরা ঈশ্বরের সাথে একাত্মতাকে আবিষ্কার করি, যে যীশু অনবরত আমাদের পাশে পাশে চলেন।

সুপ্রিয় যুব বন্ধুরা, আমি যখন তোমাদের মুখের দিকে তাকাই, তখন আনন্দ ও প্রত্যাশায় আমার মন ভরে উঠে ঃ আনন্দ ও প্রত্যাশা তোমাদের নিজেদের জন্য, তোমাদের দেশের জন্য, তোমাদের ম-লীর জন্য এবং তোমাদের অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্য। ভালবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও মহত্বে বেড়ে উঠতে ঐশ প্রজ্ঞা তোমাদেরকে অনুপ্রাণিত করুক। আজ তোমাদের দেশ থেকে বিদায় নেয়ার সময়ে আমি তোমাদের এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের জন্য প্রার্থনা করব, যেন তোমরা অব্যহতভাবে ঈশ্বরের ও প্রতিবেশীর ভালবাসায় বৃদ্ধি পেতে পার। এবং হ্যাঁ, আমার জন্যেও প্রার্থনা করতে ভুলো না যেন!

ঈশ্বর বাংলাদেশকে আর্শীবাদ করুন।