শিশু পেলে অধিকার, খুলবে নতুন বিশ্বদ্বার

প্রদীপ মার্সেল রোজারিও: 

 ১৯৫৩ সনের অক্টোবর মাসে ইউনিসেফ এবং আন্তর্জাতিক শিশু কল্যাণ ইউনিয়নের উদ্যোগে শিশুদেরকে বিশেষ বিবেচনায় আনার লক্ষ্যে প্রথমবার বিশ্ব শিশু অধিকার দিবস পালিত হয়। বর্তমানে এ বিশ্ব শিশু অধিকার দিবসকে ঘিরে শিশু অধিকার সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর বিশ্ব শিশু দিবস উপলক্ষে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত  শিশু অধিকার সপ্তাহ পালন করা হয়। এ বছর পূজা ও মহররমের কারণে ৫ অক্টোবর থেকে পিছিয়ে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এবারের শিশু অধিকার সপ্তাহের প্রতিপাদ্য হচ্ছে “শিশু পেলে অধিকার, খুলবে নতুন বিশ্বদ্বার”।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতি বছর বাংলাদেশ শিশু একাডেমী কেন্দ্রীয় অফিসসহ ৬৪টি জেলায় বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকে। সপ্তাহজুড়ে থাকে শোভাযাত্রা, আলোচনাসভা, প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচন, ভিডিও শো, লিফলেট, বুকলেট, পোস্টার, ক্রোড়পত্র প্রকাশ, থিয়েটার এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

শিশুদের নিয়ে ভাবনার শুরুটা হয়েছিল ১৯১৯ সালে। তখন সবেমাত্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। বিশ্ববাসী উপলব্ধি করছে সদ্য শেষ হওয়া যুদ্ধের ভয়াবহতা। যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে দুই কোটিরও বেশী মানুষ। ইউরোপের অবস্থা তখন সবচেয়ে নাজুক। গোটা ইউরোপ জুড়ে তখন এমন কোন পরিবার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না, যাদের পরিবারের সবাই বেঁচে আছে। প্রায় প্রতিটি পরিবারই গড়ে একজন করে প্রিয় মানুষকে হারিয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেল সবচাইতে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিশুরা, অকালে প্রাণ হারিয়েছে কয়েক লক্ষ শিশু। আর যাঁরা বেঁচেছিল, তাদের অধিকাংশকেই মুখোমুখি হতে হয়েছিল নির্মম শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় এবং সর্বোপরি আশ্রয়হীনতার।

ইংল্যান্ডের শ্রপসিয়ারে এলসমেয়ার নামক একটি ছোট্ট শহর আছে। সেই শহরে একটি বনেদী পরিবারের মেয়ে ইগল্যানটাইন জেব। পেশা হিসেবে প্রথম জীবনে তিনি স্কুল শিক্ষকতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ বিধ্বস্ত পরিস্থিতিতে হাজারো অসহায় ও দুঃস্থ শিশুদের দুরবস্থা তাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন এ সকল অধিকার বঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়াবার। শিশুদের প্রতি তাঁর এ অকৃত্রিম ভালোবাসা আর সাহায্যের মনোভাব তাকে বাইরের জগতের কাছে পরিচিত করে তোলে ‘হোয়াইট ফ্লেম’ হিসাবে। এ মহৎ কাজে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর প্রিয় বোন ডরোর্থি বাক্সটন। পরবর্তীতে ১৯১৯ সালের ১৫ই এপ্রিল জেব এবং তাঁর বোন ডরোর্থির হাত ধরেই মূলত যাত্রা শুরু করে ‘সেফ দি চিলড্রেন’ নামক একটি ফাউন্ডেশন। শিশুদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে এ দিনটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু অধিকারকে আলাদাভাবে গুরুত্ব আরোপ করার কারণে ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘Convention of League of Nation’ বা জেনেভা কনভেনশনের উল্লেখ করা হয়েছিল, “মানব জগতে সর্বোত্তম যা কিছু আছে তা শিশুরাই পাওয়ার যোগ্য।” কিন্তু একটি প্রজন্ম এ বিপর্যয় থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়ার পূর্বেই শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আবার যুদ্ধের বিভৎসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারায় হাজার হাজার শিশু। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হয় কয়েক লাখ শিশু। ১৯৪৫ সালের ২৪শে অক্টোবর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে শিশুদের জন্য প্রথমবারের মতো দশটি অধিকার ঘোষিত হয়। পরবর্তীতে এ ধারাগুলোকে কিছুটা পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করে ১৯৮৯ সালের ২০শে নভেম্বর চারটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে চুয়ান্নটি ধারা সম্বলিত একটি সনদ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এর নাম  দেয়া হয় ‘শিশু অধিকার সনদ’। তার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯০ সালে এ সনদটিকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা হয়। গর্বের বিষয় হচ্ছে, ১৯৯০ সালের ৩রা আগষ্ট বিশ্বের প্রথম যে ২২টি দেশ এ সনদে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশে তার মধ্যে অন্যতম।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় দশ লাখেরও বেশী শিশু বাড়িতে, শ্রেণীকক্ষে, কর্মক্ষেত্রে নীরব নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার, পৃথিবীর অনেক দেশেই শিশুদের উপর এ ধরণের নির্যাতন সমাজে প্রচলিত জীবন ব্যবস্থার অংশ হিসাবে বিবেচনা করা্ হয়। আরো লজ্জাজনক বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশও এ অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৪৫ ভাগের বেশী শিশু তাদের সার্বিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৭৯ লক্ষ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। দেশে বাল্য বিবাহের হার প্রায় ৬৬%।

তবে আশার কথা হলো বিশ্ব শিশু পরিস্থিতিতে একটি পরস্পর বিরোধী অবস্থা বিরাজমান থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যাচ্ছে আর তা হলো শিশু অধিকার সম্পর্কে পূর্বেকার যে কোন সময়ের চেয়ে আরও অনেক বেশী সচেতনতা। শিশুর প্রতি দায়িত্ববোধ এখন আর শুধু নীতিবোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং তা ক্রমবর্ধমান হারে বৃহত্তর সামাজিক ও আইনানুগ বাধ্যবাধকতার আওতায় চলে আসছে। শিশুদের উন্নয়নের জন্য সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে এসেছে। তারা নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে শিশুদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ফলে শিশুশ্রম হ্রাস পাচ্ছে, শিশুদের স্বাক্ষ্রতার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে্‌ এবং কিছুটা হলেও নির্যাতন কমেছে।

আজকের শিশু জাতির সোনালী ভবিষ্যতের স্থপতি। সুন্দর, কল্যাণকর জাতি গঠনের জন্য প্রয়োজন এমন সুন্দর পরিবেশ যেখানে জাতির ভবিষ্যৎ স্থপতিগণ সকল সম্ভাবনাসহ সুস্থ, স্বাভাবিক ও স্বাধীন মর্যাদা নিয়ে শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং সামাজিকভাবে পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারবে। এ জন্য প্রয়োজন শিশুর অধিকার সম্বলিত উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও এর সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। যা মোটেও কঠিন কিছু নয়। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছায় মোড়ানো উদ্যোগ গ্রহণ এবং তা অব্যাহত রাখা।