ছোট খাটো বিষয় ১৬

আলো ডি’রোজারিও:

১। দক্ষতা ও জনপ্রিয়তা এক সাথে যায় না। অর্থাৎ যিনি যত দক্ষ তিনি তত জনপ্রিয় হন না। কারণ দক্ষ মানুষ তাঁর কাজ জানেন ও বুঝেন এবং সেই ভাবেই নিজের সন্তুষ্টি খুঁজেন। তিনি অন্যকে সন্তুষ্ট করার জন্যে ছাড় দিতে রাজী হন না। দক্ষ মানুষ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চান এটা জেনেও যে, তাঁর বিরুদ্ধে চলে যেতে পারেন অনেকে। নিরপেক্ষতা পেশাদারীত্বের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট। সঠিক পেশাদারীত্বের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব অবশ্যই বর্জনীয়। এই কলামে আগে হয়ত লিখেছি একবার যে, পৃথিবীতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হ’ল: মানুষ কী করে, কেন করে ও কীভাবে করে। এই প্রশ্নগুলো নৃ-বিজ্ঞানীদের প্রিয় প্রশ্ন। নৃ-বিজ্ঞানীরা এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেন এইসব প্রশ্ন সরাসরি না করেই! তাঁরা মানুষের সাথে আলাপ করে এটা-ওটা নিয়ে, যেমন তাঁরা জানতে চান, চালের দাম কত? প্রতিদিন রাতে কী কী খান? টেলিভিশন দেখার সুযোগ আছে কী? কোথায়? নিজের ঘরে? সর্বশেষ কবে গ্রামের বাইরে গেছেন, কেন? মামলার কারণে? কার সাথে মামলা? কত বছর ধরে চলছে? আপনাদের গ্রামের কতজন মামলার কারণে কোর্টে দৌঁড়ায়? কী রকম খরচ হয় তাতে? এতসব প্রশ্নের একটিই উদ্দেশ্য পূর্বোক্ত তিনটি প্রশ্নের উত্তর বের করা। এটা সত্য নৃ-বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন করার সময় বেশী আর সেসাথে তাঁদের প্রশ্নও আরো বেশী।

২। নৃ-বিজ্ঞান পড়ার তেমন কোন সুযোগ পাইনি, ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৫ সালে পিএইচডি করতে ইংল্যান্ডে যাবার পর আমার থিসিসের সুপারভাইজরের পরামর্শে নৃ-বিজ্ঞান কিছুটা পড়তে হয়েছিল। সেই থেকে সুযোগ পেলেই পড়ি। পড়তে পড়তে বুঝতে চেষ্টা করি, পোল্যন্ডের শ্রমিক নেতা লেচ ওয়ালেসা নোবেল প্রাইজ পাওয়ার আগে কেমন ছিলেন, কী বলতেন, কী করতেন। নোবেল প্রাইজ পাবার পর আমার এক কালের এই প্রিয় নেতা কী কী করেছেন, আর কী কী  বলেছেন। তিনি তাঁর আগের আদর্শ হতে বিচ্যুত হলেন কেন? সেসাথে মিয়ানমারের নোবেল বিজয়ী নেত্রী অং সান সূ চী কিছুকাল আগে কী বলতেন, কী করতেন আর বর্তমানে কি বলছেন ও কী করছেন। তাঁর কেন এত বড় পরিবর্তন! বড় রাজনৈতিক পরিবেশ বাদ দিয়ে যদি আমরা আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশের দিকে আসি, দেখব, সকল ক্ষেত্রেই নতুন ক্ষমতা প্রাপ্তদের আচরণের পরিবর্তন সবিশেষভাবে লক্ষ্য করার মতোন। পরিবারের প্রধানের, সামাজিক নেতার ও সেসাথে ধর্মীয় নেতার আচরণ নতুন নেতৃত্ব পেলেই পাল্টে যায়। তাঁরা ধারাবাহিক রক্ষা করতে চান বা পরিবর্তন আনতে চান তাঁদের নিজের স্টাইলে, নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তিকে পোক্ত করার জন্যে। তাঁরা অন্যদের বিশ্বাস করাতে সচেষ্ট হন যে, তাঁরা আগেকার নেতাদের চেয়ে ভাল ও তাই বেশী বরণীয়, গ্রহণীয় ও জনপ্রিয়। আর তাঁদের আশেপাশের তোষামোদকারীরা ‘ক্ষমতাসীনদের সব ভাল-মন্দের সাথে থাকাই প্রধান আদর্শ কর্তব্য’ জ্ঞান করে ঢাক-ঢোল বাজাতে থাকেন জোরে-শোরে। এখানে লক্ষ্যণীয়- পারিবারিক ও ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে কথা বলা এখনো আমাদের সমাজে রেওয়াজে পরিণত হয়নি। যেমনটা হয়েছে সামাজিক ও রানৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে, আর তাই আজ বলা হচ্ছে: অং সান সূ চি এর নোবেল প্রাইজ কেড়ে নেয়া হোক। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই দাবী তুলছে দেখে নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটা সম্ভব না । কেন সম্ভব না, সেই কারণও তারা জানিয়েছেন, তাঁদের কর্তব্য সারতে।

৩। নৃ-বিজ্ঞানের ও সমাজ বিজ্ঞানের প্রাপ্ত জ্ঞানের ধারা হতে বর্তমান বিশ্ব বরেণ্য মহামান্য পোপ ফ্রান্সিস একদম ব্যতিক্রম। তিনি পোপ পদে আসীন হয়ে পাল্টে যাননি, নিজের প্রভাব প্রতিপত্তিকে ক্ষমতা দেখাতে ব্যবহার করেননি, জীবন-ধারা একদম পাল্টাননি, প্রচলিত ছকেও তিনি আটকে যাননি। বর্তমান এই পদে আসার এই সুযোগকে তিনি কাজে লাগাচ্ছেন জন কল্যাণে, আধ্যাত্মিক উন্নয়নে, প্রচলিত ব্যবস্থার সংস্কার আনয়নে। যা বলা উচিত, তা তিনি বলছেন, কখনো কখনো অন্যদের বিরুক্তির কারণ হলেও। ভাটিকানে সকল পর্যায়ে জবাবদিহিতা বাড়াতে, সেখানে খরচ যুক্তিযুক্ত পর্যায়ে রাখতে, সকল খরচের নিরীক্ষা বাইরের নিরীক্ষক দ্বারা করাতে, লোকবল প্রয়োজনের অতিরিক্ত না রাখতে, পৃথিবীর সকল অন্যায্যতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে, নির্যাতিত মানুষের পক্ষ নিতে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন সরবে ও দৃঢ় পদক্ষেপে। তাঁর সাথে আছেন নয়জন কার্ডিনালের একদল পরামর্শক। প্রথমে অবশ্য দশজন কার্ডিনাল ছিলেন পরামর্শক দলে, একজন সম্প্রতি বাদ পড়েছেন নিজ দেশের বিচারের সম্মুখীন হতে ফিরে যাবার কারণে। ইতিমধ্যেই মহামান্য পোপ ফ্রান্সিস বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কর্মরত ভাইবোনদের ন্যায্য মুজুরীর পক্ষে কথা বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্তদের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করে সাহায্য করতে বিশ্ববাসীকে আহ্বান করেছেন। বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গা ভাই-বোনদের মানবিক সাহায্য ও তাদের নিজ দেশে পুনর্বাসনের অধিকারের কথাও একাধিকবার বলেছেন। তিনি বাংলাদেশে আসছেন এই বছরের শেষ দিকে, আরো অনেক কথাই তিনি বলবেন। আমরা আশায় আছি, তাঁর কথা শুনতে, সততা ও ন্যায্যতার পক্ষে সাহসী পদক্ষেপ নিতে।

লেখক: ড. বেনেডিক্ট আলো ডি’রোজারিও, সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কারিতাস বাংলাদেশ

আরো পড়ুন: ছোট খাটো বিষয় ১৫