রোহিঙ্গারাও মানুষ, মানবতার জয় হোক

এলড্রিক বিশ্বাস:

বর্তমানে যে ইস্যুটি সবচাইতে হট ইস্যু তা হল রোহিঙ্গা ইস্যু। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার সাবেক বার্ম্মার একটি প্রদেশ হচ্ছে রাখাইন। এরা আরাকানী নামেও পরিচিত।

বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়।দীর্ঘ ৪৬ বৎসরে স্বাধীনতাত্তের বাংলাদেশ এখন ঝুড়ি পূর্ণ একটি দেশ। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার পররাস্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে মন্তব্য করেছিলেন। সেই ঝুড়ি সময় গড়িয়ে এখন পূর্ণতার পথে।সেই ঝুড়ি অনেক লোডও নিতে পারে।

কক্সবাজার, বান্দরবানসহ মায়ানমারের সীমান্ত ঘেসা বাংলাদেশের বর্ডারে রোহিঙ্গারা আসছে তো আসছেই।তারা কোন বাঁধা মানছে না, সুযোগ পেলেই চলে আসছে। আমার মনে পড়ে সেই ১৯৭১ এর উত্তাল দিনগুলির কথা। ১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানী সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছিল বাঙ্গালী জাতিকে। তারা চেয়েছিল বাঙ্গালী জাতিকে নিশ্চিন্ন করে দিতে। সেই একই লক্ষ্যে  মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের উপর নিযার্তন চালাচ্ছে।

তাঁকে লন্ডন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম চ্যানেল ফোর টেলিভিশনের মাদার অব হিউমেনেটি (মানবতার জননী) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রবেশ করেন, আনাস নামের আহত রোহিঙ্গা শিশুর সাথে কথা বলেন। এরপর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে চ্যানেল ফোর, তা দেখেছে তাৎক্ষণিক প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। সেখানে ওয়াই ওয়েন্সটন মিন নামের এক নারী লিখেছেন – ‘ না বাংলাদেশ তোমরা কোনভাবেই গরীব নও, বরং তোমরা হৃদয়ের দিক থেকে অনেক ধনী।বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কথিত ধনী রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষা নেয়া উচিত।’

মানুষ কখন নিজ ঘরবাড়ী ছাড়ে। যখন দেখে আর থাকা যাচ্ছে না তখন সিদ্ধান্ত নেয় প্রিয় ঘরবাড়ী, ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাবে অনিশ্চিয়িত যাত্রা পথে। মিয়ানমার থেকে বালাদেশে আসতে জীবন বাজী রেখে অনেক কষ্টের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বিশেষভাবে মহিলা ও শিশুরা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অত্যাচারের স্বীকার। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের ছবি, গল্প ও ঘটনা বর্তমান প্রজম্ম জেনেছে। এইরূপ নির্যাতন হয়েছিল ১৯৭১ এ বাংলাদেশে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী মানবতা ও সহমর্মিতার টানে বাংলাদেশের এক কোটির বেশী শরনার্থীদের জন্য পশ্চিমবঙ্গে ও আগরতলায় থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই একই ভালবাসার টানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের বর্ডার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। ইন্দিরা  গান্ধীর বিশাল হৃদয় মিশে গিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে।পার্থক্য ইন্দিরা গান্ধীর সময় ছিল ১৯৭১ ও বর্তমান রোহিঙ্গা ইস্যু ২০১৭। ৭১ উল্টালে ১৭ হয়।

পিছনের দিকে তাকালে আমরা কি দেখতে পাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকা ও চীন পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে অনেক টালবাহনা করেছিল। বাংলাদেশের মিত্র শক্তি ছিল ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মানে রাশিয়া।এখন অনেকে আমেরিকা যেতে চায়, আমেরিকার প্রশংসায় গদগদ, কিন্তু ১৯৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল আমেরিকা। সপ্তম নৌ বহর আমেরিকা পাঠিয়েছিল বঙ্গোপসাগরে বাঙ্গালী নিধনে পাকিস্তানকে সহায়তা করতে। তবে রাশিয়ার হুমকিতে আমেরিকা পিছিয়ে যায়। আর চীন অস্ত্র দিয়েছিল পাকিস্তানকে স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালীদের দমন করতে ও মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করতে। চীন এখন নীরব রোহিঙ্গা ইস্যুতে। আমাদের সচেতন হতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশ জঙ্গীবাদীদের ঘাটির জন্য একটি বিশেষ স্থান হিসেবে বিবেচিত না হয়। এখান থেকে মিয়ানমারে ও ভারতে জঙ্গী হামলা চালানো যায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বড়ই জটিল।

অনেকে ফেইসবুকে না বুঝে অনেককিছু লিখে, তাদের সতর্ক হতে হবে। আমরা যেন মানবতা রক্ষার নামে জঙ্গীবাদকে উস্কে না দেই। ইতিহাস জানুন, তারপর মতামত দিন। আবেকপ্রবণ হয়ে কিছু লিখবেন না।

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দানের জন্য দরজা উন্মুক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মানবতার রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন।তাঁর উদ্যোগের ফলে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা জীবন ফিরে পেয়েছে। তাঁকে লন্ডন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম চ্যানেল ফোর টেলিভিশনের মাদার অব হিউমেনেটি (মানবতার জননী) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রবেশ করেন, আনাস নামের আহত রোহিঙ্গা শিশুর সাথে কথা বলেন। এরপর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে চ্যানেল ফোর, তা দেখেছে তাৎক্ষণিক প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। সেখানে ওয়াই ওয়েন্সটন মিন নামের এক নারী লিখেছেন – ‘ না বাংলাদেশ তোমরা কোনভাবেই গরীব নও, বরং তোমরা হৃদয়ের দিক থেকে অনেক ধনী।বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কথিত ধনী রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষা নেয়া উচিত।’

শুনহে মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্র, তাহার উপরে নাই। তাই রোহিঙ্গারা মানুষ, তাদের রক্ষা করা মানবিক দায়িত্ব সবার। আমরা রোহিঙ্গাদের জন্য কি করতে পারি। তারা ভিটে মাটি সহায় সম্বল সব ছেড়ে জান বাঁচাতে অনেকে এক কাপড়ে বর্ডার পার হয়ে চলে এসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে।

আমরা সাধারণ মানুষ যা করতে পারি:

১) নিজের সামর্থ অনুযায়ী অর্থ সাহার্য দিতে পারি, কোন বিশ্বস্ত সংগঠন বা সংস্থাকে।

২)নিজের অব্যবহৃত ভাল মানের জুতা, স্যান্ডেল দিতে পারি, দিতে পারি কাপড় (শাড়ী, প্যান্ট, শার্ট, বাচ্চাদের কাপড় ইত্যাদি)

৩) রোহিঙ্গাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে পারি।

আমরা আজ মানুষ সত্যকে প্রাধান্য দিতে চাই। রাখাইন এর রোহিঙ্গাদের ভাষা ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা একই ঢং এর। সকলে মানবতার জয়ে এগিয়ে যাই।

আমি ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে মায়ানমারের রাজধানী ইয়াংগুনে (রেঙ্গুনে) ছিলাম ২১দিন। Asia YMCA র একটি সামাজিক নেতৃত্ব বিষয়ক ট্রেনিং এ যোগদান করি। তখন আমি চট্টগ্রাম ওয়াই এমসিএ’র এডমেনেট্রিটিভ সেক্রেটারী।সেই সুবাদে ট্রেনিং এ অংশগ্রহণের সুযোগ আসে। সেই সময় মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর তৈরী সরকারের শাসন। অং সান সুকী মায়ানমার ডেমক্রেডিট পার্টির লিডার। তিনি গৃহবন্দী। কোথাও যেতে পারেন না। আমাদের ট্রেনিং এর শেষদিকে একদিন শনিবার আমরা ট্রেইনীরা রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে গেলাম। একজন বার্মিজ ইয়ানগুন ওয়াইএমসিএ স্টাফের সাথে আমি সু সম্পর্ক তৈরী করি। তার মাধ্যমে অং সান সুকির বাসার গেইটে যাই। গিয়ে দেখি রাস্তায় অনেক লোক বসা। দু পার্শ্বের রাস্তার একপাশ বন্ধ। একটু পরে মিয়ানমারের গণতন্ত্রের নেত্রী অং সান সুকী এলো একটি জপি গাড়ীতে। জীপ গাড়ীর পিছনে দাঁড়িয়ে তিনি ভাষণ দিলেন বার্মিজ ভাষায়। কিছুই বুঝলাম না। আসার আগে ওনাকে হাত উঠিয়ে অভিভাদন জানালাম, সাথে বললাম বাংলাদেশ। ফটো উঠালাম। পরে ওয়াইএমসিএতে আসার পর আমাকে মিয়ানমার ওয়াইএমসিএ’র জেনারেল সেক্রেটারী বললেন বিদেশী হিসেবে যাওয়া ঠিক হয়নি। কারণ সামরিক সিভিল সরকারের ৩ স্তরের ইন্টালিজেন্স সকল মুভমেন্ট নজরে রাখে। তিনি সন্দিহান আমাকে কেহ ফলো করেছে কি না, তবে কিছুই হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে অং সান সুকী মিয়ানমারের আর্মির বাহিরে কোন কথা বলতে পারছেন না। প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা আর্মিরা আবার সচল। সুকী ক্ষমতায় গিয়ে নিজের দলের লোকদের প্রশাসনে বসাতে পারেনি।যেটাকে বলে রিফরমেশন, তা করতে পারেনি সুকি। এছাড়া মায়নমারে বিভিন্ন প্রদেশে বিদ্রোহী দলগুলো সুকির প্রতি একাত্নতা প্রকাশ করেনি। সুকি এখনও আর্মির হাতের পুতুল।আমাদের দেশে প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা বিএনপি ও জামাত পন্থীদের কি সম্পূর্ণ চিহিৃত করা গেছে। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জঙ্গীবাদ যেন প্রাধান্য না পায়, ধর্মের নামে কোন ইস্যু তৈরী না হয়, মানবতার যেন জয় হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বিশ্বে এটা প্রমাণিত হোক বাংলাদেশের মানুষ নিম্নমধ্য আয়ের দেশের লোক হলেও সকলের হৃদয়ে আছে বিশাল মানবতা।

লেখক: সাংবাদিক