আসুন রোহিঙ্গা ভাইবোনদের পাশে দাঁড়াই

সুমন কোড়াইয়া:

প্রহেলা সেপ্টেম্বর। দুপুর বারটা। ঈদের আগেরদিন। কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংবাজার। গাড়ি থেকে নামতেই দেখা গেল শত শত রোহিঙ্গা রাস্তার দুই পাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। গায়ে পুরনো, ময়লা, ভেজা কাপড়। তিন চারদিন কেউবা ছয় সাতদিন পায়ে হেঁটে এসে পৌঁছেছেন বাংলাদেশে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে।

তারা এখন কে কোথায় যাবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না।

দুইজনকে দেখা গেল একজন বৃদ্ধাকে কাপড়ে ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তার নাম আলি মাহাতি (৬০)। মায়ানমারের/বার্মার রাখাইনের মংডু জেলা এই নারীকে নির্মমভাবে পিটিয়েছে বার্মার আর্মি। তিনি হাঁটতে পারেন না বলে তার ছেলেরা তাকে এভাবে কাঁধে করে নিয়ে আসছেন।

একজন নারীকে পাওয়া গেল যিনি উদাস হয়ে বসে আছেন। কোলে দেড় মাসের বাচ্চা। তিনি বলেছেন, মায়ানমারের আর্মিরা তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। স্বামী বেঁচে আছে না মরে গেলে তিনি তা জানেন না। এই অবুঝ বাচ্চা নিয়ে তিনি কী করবেন কোথায় যাবেন তা কিছুই জানেন না। তিনদিন ধরে কিছুই খাননি বলে জানালেন ভেজা কাপড়ে বসে থাকা রাখাইন নারীটি। তখন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিলো। তিনি বৃষ্টির মধ্যেই খোলা আকাশের নিতে বসে আছেন।

পনের পছরের একটি ছেলের হাতে ব্যন্ডিজ দেখা গেল। সে জানাল তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করে বার্মার সেনারা। কোনভাবে নিজেকে প্রাণে বাঁচাতে  পেরেছে সে।

হাবিবুর রহমান নামে একজন রোহিঙ্গা তার পরিবারের ১১ সদস্যকে নিয়ে বসেছিলেন কুতুপালংবাজারের রাস্তার ধারে। তারা ছয়দিন হেঁটে আসতে পেরেছেন বাংলাদেশে। হাবিবুরের এক বোন জামাইকে মেরে ফেলেছে ঐদেশের সেনারা। তাই জীবন বাঁচাতে চলে এসেছেন তারা সপরিবারে।

একজন রোহিঙ্গা নারী বলেন, “সেনারা নারীদের শরীরে হাত দেয়, ধর্ষণ করে। আকাশ থেকে বোমা ফেলে। বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দেয়। মার ধোর করে। গুলি করে। কিভাবে থাকবো ঐ দেশে?”

আরেকজন রোহিঙ্গা পুরুষকে পাওয়া গেল, যার কথাবার্তা শুনে মনে হলে তিনি বেশ শিক্ষিত। তিনি ইংরেজীতে অর্নগল কথা বলেন। তিনি জানালেন, বার্মায় তার প্রায় পাঁঞ্চাশ বিঘা জমি আছে, আছে মাছের ব্যবসা। আছে চার চাকার গাড়ি। ছিল স্বচ্ছল জীবন। কিন্তু জীবনের ভয়ে তিনি সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে এদেশে এসে রিফিউজি হয়ে অন্যের উপর নির্ভর করে দিন কাটাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ভদ্রলোক বললেন, আমরা বার্মায় শান্তি চাই। মানুষ হিসেবে বাঁচার পূর্ণ অধিকার চাই। তিনি আরো বলেন, এক সময়  আমরা রোহিঙ্গারা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারতাম। ২০১৫ সালের নির্বাচনে আমাদেরকে ভোট দেওয়ার অধিকারও হরণ করা হয়েছে। আমাদেরকে সেদেশ থেকে বিতাড়ন করার জন্য ঐদেশের সরকার পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন চালাচেছ।

ঈদের দিন দেখা গেল কয়েকজন রোহিঙ্গাকে ভিক্ষা করতে। স্থানীয় বাঙ্গালিরা কুতুপালংবাজার দিয়ে যাওয়ার সময় ১০ কেইবা ২০ টাকা দিয়ে সহযোগিতা করছেন। যারা সাহায্য দিচ্ছেন তারাওযে খুব বৃত্তশালী তা কিন্তু নয়, কিন্ত তারা তা করছেন বিবেকের তাড়নায়।

রিফিউজি রোহিঙ্গারা খাবার, আশ্রয় পাওয়ার জন্য বাঙ্গালিদের কাছে হাত পাতছেন। একটি ফার্মেসীতে দেখা গেল অনেক ভীড়। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ওষধ নিতে আসা ৯৫ ভাগই রোহিঙ্গা। তারা বেশি কিনছেন ব্যথা নাশক ওষধ। কারণ তারা পায়ে হেঁটে এসে এবং অনেকে ঐদেশে মার খেয়ে এসে ব্যথার ওষুধ কিনছেন।

গণমাধ্যমের তথ্যানুসারে এই পর্যন্ত চারশর মত রোহিঙ্গাকে মেরে ফেলেছে বার্মার আর্মি, তাদের মধ্যে ৮৬জন ঐদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুও আছেন।

বাবা-চাচা-মামাদের কাছে শুনেছি ১৯৭১ সালের মুক্তি যুদ্ধের গল্প। বার বার মনে হচ্ছে, এদেশের মানুষ যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তেমনি রোহিঙ্গা ভাইবোনেরাও এদেশে স্রোতের মত আসছেন। আমরা তো আশ্রয় পেয়েছিলাম ভারতে, আমাদের কি উচিত নয় রোহিঙ্গাদের আশ্রয়  দেওয়া, অভুক্ত থাকা রোহিঙ্গাদের খাবারের ব্যবস্থা করা?

অনেকে বলবেন, রোহিঙ্গারা অনেক অপরাধের সাথে জড়িত, এমনিতে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি কিন্তু তারপরও বলবো মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদেরও বাঁচার অধিকার আছে। অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

দেশের বন্যার্তদের পাশে অনেক সংস্থা, ব্যক্তি ত্রাণ নিয়ে গিয়েছেন। এখন আমাদের উচিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো। তাই আসুন, আমরা যেযেভাবে পারি রোহিঙ্গা ভাইবোনদের পাশে দাঁড়াই। কারণ মনবতাই সবচেয়ে বড় ধর্ম। আসুন রোহিঙ্গাদের প্রতি আমরা মানবিক হই।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, বিডি খ্রিস্টান নিউজ