ছোট খাটো বিষয় ১৫

আলো ডি’রোজারিও:

১। এই কলামের বেশ কয়েকটি কিস্তির বিষয়বস্তু ছিল মদ্যপান বিষয়কে ঘিরে। এসব কিস্তিতে মদ্যপান সীমিত, পরিমিত, পারলে একদম বন্ধ করার আহ্বান ছিল। মদ বিক্রির বিষয়ে বক্তব্য ছিল- দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবসা করা। আর মদ বানানো পুরোপরি বন্ধ করবার জন্যেও জোর তাগিদ ছিল। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশন মাদক দ্রব্য গ্রহণ, বানানো ও ব্যবসা করার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলবার লক্ষে ভাওয়াল এলাকায় সাইকেল  র‌্যালি করেছে, যা সাভারে শুরু হয়ে বিভিন্ন ধর্মপল্লী ও এলাকায় সভা সমাবেশ করে দড়িপাড়ায় শেষ হয়েছে। এই সাইকেল র‌্যালির মূল লক্ষ্য ছিল- মাদক দ্রব্যের ব্যবহার একটি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা। তাদের এই উদ্যোগ সফল হোক, এই কামনা করি। ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশনের সভাপতি মি. নির্মল রোজারিও সহ অন্যান্যদেরকে।

বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশন কর্তৃক আয়োজিত মাদক বিরোধী সাইকেল র‌্যালিতে ঢাকা ক্রেডিটের বর্তমান সেক্রেটারী মি. পংকজ গিলবার্ট কস্তা একটি আশাব্যঞ্জক কথা বলেছেন। মদ বানানো ও বিক্রির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে সম্মানজনক পেশায় পুনর্বাসনে কম সুদে ঋণ দেবার কথা তিনি বলেছেন। তার এই বক্তব্যকে সাধুবাদ সহকারে গ্রহণ করে অপেক্ষায় থাকলাম, প্রকৃত উদ্যোগের জন্যেও।

২। মদ্যপান বিষয়ে লেখার একটি কিস্তিতে আমি প্রস্তাব রেখেছিলাম, মত বানানো ও বিক্রির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে অন্য কোন সম্মানজনক পেশাতে পুনর্বাসন করা। এই পুনর্বাসন কাজে এগিয় আসতে আহ্বান জানিয়েছিলাম, ভাওয়াল এলাকার সমবায় ঋণদান সমিতিগুলোকে। প্রস্তাবিত পুনর্বাসন কাজে প্রয়োজন হবে, মূলতঃ প্রশিক্ষণ ও পুঁজি। তবে আরো প্রয়োজন হবে পরামর্শ দান, আগ্রহ ও চাহিদা যাচাই, বিপনন ও নিরন্তর পর্যবেক্ষণ। উপরোক্ত কাজগুলো ধারাবাহিক ও বিজ্ঞানসম্মত হতে হবে। বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশন কর্তৃক আয়োজিত মাদক বিরোধী সাইকেল র‌্যালিতে ঢাকা ক্রেডিটের বর্তমান সেক্রেটারী মি. পংকজ গিলবার্ট কস্তা একটি আশাব্যঞ্জক কথা বলেছেন। মদ বানানো ও বিক্রির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে সম্মানজনক পেশায় পুনর্বাসনে কম সুদে ঋণ দেবার কথা তিনি বলেছেন। তার এই বক্তব্যকে সাধুবাদ সহকারে গ্রহণ করে অপেক্ষায় থাকলাম, প্রকৃত উদ্যোগের জন্যেও। আশা রাখি এই পুনর্বাসন কাজে ঋণদান সমিতিগুলোর সাথে ধর্মপল্লীভিত্তিক প্যারিশ কাউন্সিল, বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশন ও খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টও যোগ দেবে। তবে প্রাথমিকভাবে উদ্যোগ ও নেতৃত্ব আসতে হবে ধর্মপল্লী ভিত্তিক প্যারিশ কাউন্সিল হতেই।

৩। আজকাল মাদক দ্রব্য বলতে যা যা বুঝায় তা পুরোপুরি এখনো আমার জানার সীমানার মধ্যে নাই। মদ ছাড়িয়ে আজ আরো কত যে উন্নত স্তরে এই মাদক দ্রব্যের আওতায় তা জানতে রীতিমত বিশেষজ্ঞ হতে হয়। এই কলামে তেমন সুযোগ নেই যে তা আমি সহভাগিতা করব। কারণ আমার জ্ঞানের ভান্ডারে মাদক দ্রব্য বিষয়ক সব সর্বশেষ তথ্য নেই। তবে শুধুমাত্র মদ নিয়ে আমি ছোটবেলা হতে কী কী চিন্তা করতাম, তা বোধহয় পাঠকদের সাথে সহভাগিতা করা যায়। যেসব চিন্তা এখানে লিখব সেসব চিন্তার সময়কাল পাকিন্তান আমলের শেষ পাঁচ বছর ও বাংলাদেশ স্বাধীন হবার প্রথম দশ বছর।

৪। গ্রামে থেকে স্কুলে পড়েছি। বড়দিন আসলে আমাদের গ্রামে বেশ মদ খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। মদ দিয়ে আপ্যায়ন করত না এমন বাড়ির সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। এমনও দেখেছি, কোন কোন বাড়ির কর্তা সারাবছর বেশ হিসেবী থাকলেও বড়দিনে মদের ব্যাপারে খুবই উদার হয়ে যেতেন। বেশ আগেভাগেই বেশী করে মদ যোগাড় করে রাখতেন ও উদারভাবে সকলকে মদ দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এসব দেখে আমি তখন একা একা ভাবতাম, যদি তারা মদের পেছনে খরচ করা অর্থ অর্ধেক বাঁচাতে পারতেন, তবে যে পরিমাণ অর্থ বাঁচত, তা দিয়ে গ্রামের গরীব ছেলে-মেয়েদের বড়দিনের জামা কিনে দিতে পারতেন। তখনকার দিনে অনেক গরীব পরিবারের ছেলে-মেয়েরা বড়দিনে নতুন জামা-কাপড় পেত না।

৫। ঢাকায় এসে কলেজ পড়াকালে একটি দূতাবাস হতে প্রতি মাসে দুইশত টাকা প্রথম দিকে ও দুইশ পঞ্চাশ টাকা শেষের দিকে পেয়েছি। বিনিময়ে সপ্তাহান্তে বা বিশেষ বিশেষ পার্টিতে মাঝে-মধ্যে দূতাবাসে কাজ করতে যেতাম। পার্টিতে মদ খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। অনেক রকম বিদেশী মদ। শত শত লোক কয়েক ঘন্টা যাবৎ সে পার্টিতে যোগ দিতেন। বিভিন্ন বিদেশী মদের নাম ও তার পরিবেশন কৌশল রপ্ত না করতে পারাতে আমি শুধু ফলের রস ও কোমল পানীয় নিয়ে অতিথিদের সামনে দিয়ে ঘুরতাম। কিছু অতিথি সবসময়ই পাওয়া যেত যারা মদ স্পর্শ করতেন না। আমি তাদের খুব পছন্দ করতাম ও তাদের কাছে বার বার ফলের রস ও কোমল পানীয় নিয়ে যেতাম। পার্টি শেষে আমরা যারা পরিবেশনে থাকতাম তাদের অনেকেই ইচ্ছেপূরণ করে মদপান করতে পারতেন। কারণ ঐদিনের হিসেব বেশ সহজভাবেই করা হত। সব কিছু গোছানো শেষে বাসে করে হোস্টেলে ফিরতে ফিরতে ভাবতাম, যে পরিমাণ টাকার মদ খাওয়া হয় একটি পার্টিতে, সেই পরিমাণ টাকার অর্ধেক বাঁচানো গেলে আমাদের তুমিলিয়া ধর্মপল্লীর গরীব ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী যারা স্কুলে বেতন দিতে পারে না, তাদের বেতন দিয়ে দেয়া যাবে। স্কুলের বেতন আমাদের সমময়কালে নিয়মিত দেয়াটা আর্থিক দীনতার কারণে অনেকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না।

৬। চাকুরী হবার পরের বছরেই বিদেশে যাবার সুযোগ হ’ল। সেবারে আমি প্রয়াত শ্রদ্ধেয় বিশপ যোয়াকিম রোজারিও, সিএসসি; ও শ্রদ্ধেয় ফাদার টিম, সিএসসি’র সাথে গিয়েছিলাম। আমাদের সভাটি ছিল পাঁচদিনের। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক দেড় ঘন্টা ছিল ‘হ্যাপী আওয়ার’। সেখানে সব রকম নরম-গরম, কোমল-হাল্কা পানীয় থাকত। যার যা সুবিধা, যার যা ইচ্ছা তা সে নিতে পারতেন। আমি শুধু কমলার রস নিচ্ছি দেখে বিশপ যোয়াকিম আমাকে বলেছিলেন, ‘কী ব্যাপার আলো, তুমি দেখি কিছুই খাওয়া শেখনি?’ তার হাতে তখন ছিল, ঠান্ডা পানি। ঐসময় ‘হ্যাপী আওয়ারের’ সুযোগে আমি অনেক মদের নাম শিখলাম। সাথে সাথে এটাও দেখলাম কীভাবে কোনটা সরবরাহ করা হয় বা নিজে নিজে কীভাবে কি কি মিশিয়ে খাওয় যায়। তবে ছোট খাটো চিন্তা করার অভ্যাসের কারণে সেখানেও আমি ভাবলাম, এই মদের খরচ অর্ধেক কমানো গেলে বেঁচে যাওয়া অর্থ দিয়ে ঢাকা ধর্মপ্রদেশের যেসব ছেলে-মেয়ে অর্থাভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারে না তাদেরকে ভর্তি করা যায়। সেসাথে এটাও ভুলিনি যে, আমার কলেজে ভর্তির টাকা দিয়েছিলেন ব্রাদার নিকোলাস থিলম্যান, সিএসসি।

লেখক: ড. বেনেডিক্ট আলো ডি’রোজারিও, সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কারিতাস বাংলাদেশ

আরো পড়ুন: ছোট খাটো বিষয় ১৪