বাদল বিরহ

গল্প

সুমন কোড়াইয়া

বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় মুক্তার। বিছানা ছেড়ে বারান্দায় যায় সে। সকাল বেলার এরকম বৃষ্টির সময় শুধু শুয়ে থাকতেই ইচ্ছে করে। কিন্তু আকাশের বৃষ্টি দেখে তার মনটা আবসাদে ভরে গেল। সে ঘরে গিয়ে দীপকে জগালো। বললো, উঠ। সকাল হয়ে এসেছে। দীপ উঠলো ঘুম থেকে। সে বললো, কী ব্যাপার সকাল সকাল মনটা ভার কেন?

কই না তো?সুমন কোড়াইয়া

তোমার মুখ দেখেই সব বুঝতে  পারি।

না-হ কিছু হয়নি।

সকাল বেলা এত কথা না বাড়িয়ে দীপ ফ্রেস হয়ে নিল। মুক্তা  সকালের নাস্তা তৈরি করে দীপকে খাইয়ে দিল। দীপ অফিসে যাওয়ার আগে স্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে বললো, কই বললে না তো তোমার মনটা খারাপ কেন?

কেন জান না আজকে ১লা আষাঢ়?

ও! দীপের মুখটা কালো হয়ে গেল। সে বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললো। স্ত্রীকে সান্ত¦না দিয়ে বললো, আমি আজ তাড়াতাড়ি ফিরব।

বৃষ্টির মধ্যে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে গেল দীপ। সেদিকে তাকিয়ে রইল মুক্তা। তাকে এখন সারাটিদিন বাসায় একা থাকতে হবে। গত দুই বছর ধরে তাকে এভাবে একাই থাকতে হয়।

চার বছর আগের কথা। মুক্তা ১লা আষাঢ়ে জন্ম দেয় এক কন্যা সন্তানের। মেয়েটির পা থেকে কোমড় পর্যন্ত অবশ। মাধা অস্বাভাবিক বড়। প্রতিবন্ধী শিশু। অনেক কষ্ট হয়েছিল ওকে জন্ম দিতে। ডাক্তার বলেছিলেন, মা বাঁচলে বাচ্চা বাঁচবে না, বাচ্চা বাঁচলে মা বাঁচবে না। কিন্তু ঈশ্বরের কৃপায় মা ও মেয়ে দু’জনই জীবিত থাকে। শুধু মেয়ে বর্ষা প্রতিবন্ধী হয়। মেয়ের নাম আগেই ঠিক করে রেখেছিল মুক্তা-দীপ দম্পতি।

বাবা মায়ের এক মাত্র সন্তান দীপ। তার বাবা মা প্রথম নাতনির মুখ দেখলো। নাতনির জন্মের আগে বৌমায়ের কত যত্ন-আত্তি। বৌমাও দেখতে রূপবতী। অহংকার নেই। বাড়ির কাজ কর্মেও ভালো। কিন্তু শাশুড়ি বৌমার এমন প্রতিবন্ধী মাথা মোটাওয়ালা নাতনি জন্ম দেওয়ায় সন্তুষ্ট না। মুক্তার শ্বশুরও খুশি নন। তারা দু’জন ছেলেকে রাজি করতে চেষ্টা করলেন এ বাচ্চা এতিম খানায় দিয়ে দেওয়ার জন্য। ছেলে এ কথা শুনে কোন ক্রমেই রাজী হতে চায় না। বাবা-মা তাকে বললেন, এ বাচ্চা আমাদের বংশের প্রথম প্রদীপ হতে পারে না। ওকে এতিম খানায় এখনি দিয়ে দিই। এই বাচ্চা থাকার চেয়ে না থাকা অনেক ভালো! শুধু শুধু কষ্ট। তোদের কষ্ট আমাদেরও কষ্ট। মানুষের সামনে কীভাবে নিয়ে যাবি এ বাচ্চাকে? তার বাবা অনেক কথা শোনালেন দীপকে। দীপ এতিম খানায় দিয়ে দিলো মেয়েকে। কিন্তু একথা শুধু দীপ ও তার বাবা-মা জানে। মুক্তাকে তখনো জানানো হয়নি। তাকে বলা হয়েছে বর্ষা মারা গেছে। এই কথা বলে খুব অভিনয় করেছিলেন মুক্তার শ্বশুর-শাশুড়ী। তারা নাতনি শোকে হাউ মাউ করে কোঁদেছিলেন। কান্নাকাটির মাধ্যমে শেষ হয় তখনকার নাটক।

মুক্তা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে আসে। শুরু হয় নতুন জীবন। আবার আগের মত সুখ তাদের জীবনে ফিরে আসতে থাকে। শাশুড়ির কথা মতে, আমার বৌমা ঘরের লক্ষ্মী।

দুই বছর পর এক মাস আগে পিছে দীপের বাবা-মা মারা যান। বাবা ছিলেন ডায়বেটিসের রোগী আর মার ছিলো হার্টের সমস্যা। দীপ তার কিছু দিন পরই খবর পায় এতিম খানায় তার মেয়ে বর্ষাও মারা গেছে। দীপ সবার অজান্তে মেয়ের খোঁজ খবর রাখতো। বাবা-মা’র পর মেয়ের বিয়োগ ব্যথা সে আর সহ্য করতে পারলো না। শোকে পাথর হয়ে গেল। মুক্তা জিজ্ঞেসা করলো, তোমার কী হয়েছে? তুমি এমন হয়ে গেছ কেন? দীপ সাহস করে প্রিয়তম  স্ত্রীকে বললো, আমি অনেক বড় পাপ করেছি। এই পাপের আগুনে গত দুটি বছর দাউ দাউ করে জ্বলেছি। আমি আর সহ্য করতে পারছি না মুক্তা।

মুক্তা অভয় দিয়ে বললো, বল কী হয়েছে?

তার আগে বল তুমি আমাকে ক্ষমা করবে?

স্বামীর হাত দু’হাতের মুঠো করে ধরে মুক্তা বললো, ঠিক আছে ক্ষমা করবো।

দীপ দু’বছর আগে বর্ষার মারা যাবার মিথ্যে নাটকের কথা স্বীকার করলো এবং বললো, আমাদের বর্ষা আজ মারা গেছে। বিকালে ওকে সমাহিত করা হবে।

এমন কথা শুনে মুক্তা আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। বাঘিনীর মতন ঝাপিয়ে পড়ে স্বামীর উপর। প্রথমে স্বামীর কলা চেপে ধরে বলে, তুমি আমার বর্ষাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারলে? তারপর স্বামীকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকে সে।

তারা বিকেলে দেখতে যায় মেয়েকে। কাকতালীয়ভাবে সেদিনও আষাঢ়ের প্রথম দিন। মুক্তার মনে আছে, দুবছর আগে যখন বলা হয়েছিলো বর্ষা মারা গেছে কিন্তু লাশ তাকে দেখতে দেওয়া হয়নি। তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি বাদে কোন আত্মীয়-স্বজনই বর্ষার মৃতদেহ দেখেনি। হাসপাতাল থেকে অন্য একটি মৃত বাচ্চা নিয়ে তাকে কবরস্থ করা হয়েছিলো।

পর পর তিনটি বর্ষা চলে গেছে। আজ চতুর্থ বর্ষা এলো। মুক্তার মেয়ের জন্ম দিন ও মৃত্যুবার্ষিকী একই দিনে। এই দিনটিতে সে দু’টি কারণে কষ্ট পায়। অনেক কষ্টে একটি প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম এবং সেই মেয়েটিকে নিয়ে তার স্বামী-শ্বশুর-শ্বশাড়ির মিথ্যা নাটক। মুক্তা ভাবে, সবাই আমাকে ঠকিয়েছে। ঈশ্বর দিল এক প্রতিবন্ধী মেয়ে। সেই মেয়েকে নিয়েও নিকটাত্মীয়রা তাকে না জানিয়ে দিয়ে দিয়েছিল এতিম খানায়।

সংসারে কাজ কর্ম আর মেয়ের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে এলো টেরই পায়নি মুক্তা। কলিং বেলটা বাজতেই দরজা খুলে দেখে হাস্যোজ্জ্বল দীপ। তার হাতে দিলো একটি মেয়ে শিশুর ছবি। বললো, এই নাও। তোমাকে নতুন বর্ষাকে এনে দিলাম। ছবিটিকে নিজের মেয়ে মনে করে বুকে আকড়ে ধরে মুক্তা।