সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীকে মনোনয়ন দিলে ভোট বর্জন

কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট আগামী নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কাউকে মনোনয়ন দিলে ওই আসনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদসহ ১৭টি ধর্মীয় ও জাতিগত  সংখ্যালঘু সংগঠনের সমন্বয় কমিটি। একই সঙ্গে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার, রাজনৈতিক দল ও জোট এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে ৫-দফা দাবি উত্থাপন করেছে এ সমন্বয় কমিটি। শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সমন্বয় কমিটির আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট রানা দাসগুপ্ত।

তিনি বলেন, নির্বাচন যেখানে জাতির সামনে উৎসব হিসেবে আসার কথা, সেখানে এদেশের ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নির্বাচনের কথা শুনলেই ভয় পায়, আঁতকে উঠে। কারণ, নির্বাচন তাদের কাছে নির্যাতনের ভয়াবহ রূপ হিসেবে দেখা দেয়। রানা দাসগুপ্ত বলেন, ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমবাদে সেসব নির্বাচনের পূর্বাপর সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় একতরফা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়েছে। কিন্তু এ সহিংসতা চলাকালে এসবের প্রতিরোধে, প্রতিবাদে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, সরকার কারো কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা আমরা দেখিনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব সহিংসতার পেছনে জনপ্রতিনিধিদের ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। এসব কারণে অতীতের নির্মম অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিশাল একাংশের মধ্যে নির্বাচন বিমুখতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে যা দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য কিছুতেই শুভ ফল বয়ে আনবে না।

সংবাদ সম্মেলনে প্রথম দাবিটি উল্লেখ করে রানা দাসগুপ্ত বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে এমন কাউকে মনোনয়ন দেবে না যারা অতীতে বা বর্তমানে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বা রাজনৈতিক নেতৃত্বে থেকে সংখ্যালঘু স্বার্থবিরোধী কোনো প্রকার কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল বা আছে। এমন কাউকে নির্বাচনে প্রার্থী দেয়া হলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সেসব নির্বাচনী এলাকায় তাদের ভোটদানে বিরত থাকবে বা ভোট বর্জন করবে বলে জানান তিনি।

সমন্বয় কমিটির অন্যতম দাবি নির্বাচনে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার  না করা। এ বিষয়ে রানা দাসগুপ্ত বলেন মন্দির, মসজিদ, গীর্জা, প্যাগোডাসহ সকল ধর্মীয় উপাসনাল

য়কে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না করা এবং নির্বাচনী সভাসমূহে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলসহ তাকে অন্যূন এক বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রেখে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী আইনের যুগোপযোগী করতে হবে। নির্বাচনের পূর্বাপর ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সকল রাজনৈতিক দল বা জোট এবং প্রার্থীকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এ মর্মে অঙ্গীকার করতে হবে যে, নির্বাচনের পূর্বাপর সময়ে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর তারা কোনো প্রকার সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নির্যাতন করবে না। যদি কেউ সংঘটিত করে বা উদ্যোগ নেয় তবে রাজনৈতিকভাবে তা প্রতিহত করবে। তিনি বলেন, যে রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সংখ্যালঘুদের প্রাণের দাবি ঐতিহাসিক ৭-দফার পক্ষে নির্বাচনী অঙ্গীকার ঘোষণা করবে এবং তাদের স্বার্থ ও অধিকার নিশ্চিতকরণে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করবে সে দল বা জোটের প্রতি সংখ্যালঘুদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত ৫-দফা দাবি পূরণের মধ্য দিয়ে সংখ্যালঘু জনমনে বিদ্যমান হতাশা দূর করে গণতন্ত্রের স্বার্থে তাদেরকে নির্বাচনমুখী করা সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণসহ জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে সংসদে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহকে দায়িত্ব নেয়ার দাবি জানান রানা দাসগুপ্ত। এ ছাড়া নির্বাচনের পূর্বেই সরকারকে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠন, বর্ণবৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন এবং পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের বাস্তবায়নসহ পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানান তিনি।

রানা দাসগুপ্ত বলেন, সন্ত্রাসী-সাম্প্রদায়িক হামলার মাত্রা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণার পর আগের চেয়ে খানিকটা কমলেও গত কয়েক মাসে রাঙ্গামাটির লংগদুর পাহাড়ি জনপদে সংঘটিত সন্ত্রাসী সাম্প্রদায়িক হামলাসহ মূর্তি অপসারণে ধর্মান্ধ শক্তির হুমকির মুখে জয়পুরহাট, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বেশ কয়েকটি উপাসনালয়ে হামলা, বিগ্রহ ভাঙচুর ও চুরি, জায়গা জবর-দখলের ঘটনা ঘটেছে এবং তা অব্যাহত আছে। শুধু তা-ই নয়, ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক মহলবিশেষ কর্তৃক বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালসহ বরেণ্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কল্পিত  মিথ্যাচারে হত্যার হুমকি প্রদানের মাধ্যমে মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার চর্চার কণ্ঠরোধের অপপ্রয়াস দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা গেছে। তিনি বলেন, ইউএনডিপি’র সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে উগ্র সাম্প্রদায়িক চরমপন্থার ক্রমাগত বিস্তারের যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে তা-ও গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার। সংবাদ সম্মেলনে জননিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদরোধে সকল সন্ত্রাসী ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং হুমকিদাতা ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি লংগদুর পাহাড়ি জনপদের অসহায় আদিবাসীদের পুনর্বাসনের কার্যক্রম জোরদারে সরকারের কাছে জোর দাবি জানানো হয়।

দেশের আপামর ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী অস্তিত্বের সংকটে  ভুগছে উল্লেখ করে রানা দাসগুপ্ত বলেন, এই সংকট থেকে উত্তরণ এবং সম-অধিকার ও সম-মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ২০১৫ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত লক্ষাধিক জনতার মহা-সমাবেশে গৃহীত হয় সংখ্যালঘুদের প্রাণের দাবি ৭ দফা। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্ঠান ঐক্য পরিষদ এ মহা-সমাবেশের আয়োজন করলেও গৃহীত এ দাবিনামায় স্বাক্ষর করে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় সব ক’টি সংগঠন। ইতিমধ্যে স্বাক্ষরকারী এসব সংগঠনসহ আরো বেশ কয়েকটি সংগঠন সমন্বিতভাবে সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব রক্ষায় ও অধিকার আদায়ের নিমিত্তে যুগপৎ ও সমন্বিতভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনার লক্ষে সংখ্যালঘু ঐক্যমোর্চা গঠন করেছে, গড়ে তুলেছে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু সংগঠনসমূহের জাতীয় সমন্বয় কমিটি। এ মোর্চাকে ভবিষ্যতে অধিকতর সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বস্তুত এ সংখ্যালঘু ঐক্য মোর্চার  কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বা উচ্চাভিলাষ নেই। তবে, প্রাণের দাবি ৭ দফার আলোকে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, সাংবিধানিক বৈষম্যের বিলোপকরণ, সম-অধিকার ও সম-মর্যাদা নিশ্চিতকরণ, সংখ্যালঘু স্বার্থবান্ধব আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন, শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য বিলোপকরণ, দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে উত্তরণ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন, সংগ্রাম পরিচালনা এ মোর্চার বিঘোষিত লক্ষ্য।

৫-দফা দাবিতে আগামী ১৪ই সেপ্টেম্বর বিকাল ৩টায় কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে জমায়েত শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি এবং ওইদিন সারা দেশে জেলা ও মহানগর সদরে জমায়েত শেষে স্ব স্ব জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ছাড়াও সমন্বয় কমিটিতে আরো যেসব সংগঠন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সেগুলো হলো- বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশি মাইনোরিটিজ (এইচআরসিবিএম), বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন, বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি, বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোট, জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ মাইনোরিটিজ সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ হিন্দু লীগ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি, শ্রী শ্রী ভোলানন্দগিরি আশ্রম ট্রাস্ট, অনুভব, স্বজন (সাংবাদিকদের সংগঠন), বাংলাদেশ ঋষি পঞ্চায়েত ফোরাম, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্যপরিষদ নেতৃবৃন্দ। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ, সুব্রত চৌধুরী, বাসুদেব ধর, যুগ্ম সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ, নির্মল কুমার চ্যাটার্জি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জয়ন্ত সেন দীপু, সাধারণ সম্পাদক তাপস পাল, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি সঞ্জীব দ্রং, সাধারণ সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা প্রমুখ। (মানব জমিন)

 

 

You May Like to Read:

গরমে কেমন পারফিউম ব্যবহার করবেন?