আপনি কি চাকুরীজীবী বা চাকুরী প্রার্থী?

স্টিফেন কোয়েল সরেন:

অনেককেই বলতে শুনেছি চাকরি মানেই চাকর কথাটা হয়ত মিথ্যা, হয়ত আংশিক সত্য বা পুরো সত্য। কথাটির ব্যাখ্যা একেক জনের কাছে একেক রকম হতে পারে। আপনি হয়ত কোন কোম্পানী, এনজিও, সরকারী প্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস, স্কুল বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, সারাদিন কাজ করতে করতে পরিবারকে ভুলে যান। পরিবারকে সময় দেয়ার কথা মনেই থাকে না, আবার অনেকে অফিসের কাজ বাসায় নিয়ে আসেন, এমনকি ছুটির দিনেও অফিসের কাজ করেন। অনেককে বলতে শুনেছি “আমি ছাড়া অফিসের একটা কাজও হয় না, বস আমাকে ছাড়া কিছু বোঝে না, খুব ব্যাস্ত থাকি, কাজের অনেক চাপ। পরিবারকে সময় দেব কি ভাবে…ইত্যাদি ইত্যাদি”

কখনও কি ভেবে দেখেছেন আপনি এই কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানে জয়েন করার আগে এই কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠান কিন্তু ঠিকই চলত, আপনি ঐ কোম্পানীতে না থাকলেও ঐ প্রতিষ্ঠান আপনার পরিবর্তে ঠিকই অন্য একজন কর্মচারীকে খুজে নেবে, আপনার থাকা না থাকাতে ঐ কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের কিছু যায় আসে না। কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতে হবে কিন্তু তাই বলে অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে না, কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের কাছে থেকে যতটুকু পারিশ্রমিক পাচ্ছেন তার জন্য ততটুকু কাজ করুন। কারণ কোম্পানী আপনাকে ত্রিশ হাজার টাকা বেতন দিলেও আপনাকে দিয়ে যে ভাবে খাটিয়ে নিচ্ছে তাতে কোম্পানী একলক্ষের বেশী টাকা আয় করে নিচ্ছে। তাই খাটতেই যদি হয় নিজের জন্য খাটুন।
মনে রাখবেন, কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের কাছে আপনি শুধুমাত্র একজন কর্মচারী, যতদিন আপনাকে তাদের প্রয়োজন পড়বে ততদিন তারা আপনাকে রাখবে, যখন তাদের কাছে আপনার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে, তখন তারা আপনাকে ছুড়ে ফেলে দেবে।
কখনও কি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, যখন আপনার চাকরি থাকবে না তখন আপনার শেষ আশ্রয় কোথায় হবে?? উত্তর হচ্ছে আপনার পরিবার। পরিবারের জন্য, আত্মীয় স্বজনের জন্য সময় রাখুন, তাদের সাথে সময় কাটান, শুধু কাজ নয় নিজের পরিবারকেও ভালবাসুন।

চাকরি কেন করতেই হবে
চাকরি ছাড়া কি অন্য কিছু করা যায় না? আমি বলব চাকরির পিছনে না ঘুরে উদ্যোক্তা হবার চেষ্টা করুন। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে বাধা বলে কিছু নেই, মাত্র বিশ হাজার টাকা পুজি নিয়ে ব্যাবসা শুরু করেও লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করা যায়। আর প্রযুক্তি খাতে টাকা আয় করতে হলে চাকরির প্রয়োজন হয় না, একটা কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই চাকরির চেয়ে বেশী টাকা আয় করা যায়, কিন্তু তার জন্য চাই আইসিটিতে দক্ষতা। আপনি বলতে পারেন আপনি মফস্বল থেকে পড়াশুনা করেছেন আপনার কম্পিউটার নাই, আপনি কিভাবে আইসিটিতে দক্ষ হবেন? নিজের ইগোকে দূরে সরিয়ে আপনার যে বন্ধুর কম্পিউটার আছে তার হাতে পায়ে ধরে তার কাছে থেকে প্রতিদিন কম্পিউটার শেখার জন্য তিরিশ মিনিট করে সময় চান, বন্ধুদের সাথে আড্ডা কমিয়ে ইউটিউব থেকে প্রোগ্রামিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ই-মেইল মার্কেটিং, ওয়েব ডিজাইনিং, ওয়েব ডেভলপমেন্ট শিখুন। বুঝতে সমস্যা হলে আমারা যারা আইসিটিতে কাজ করি, আমাদের কাছে আসুন, দেখবেন নিজে কাজ করতে করতে একসময় নিজের একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে। আইসিটি যদি কঠিন লাগে কৃষি কাজে আসুন, কোন কাজকেই ছোট করে দেখবেন না, বর্তমানে আধুনিক বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কৃষি ক্ষেত্র অনেক এগিয়ে গেছে।

মাস্টার্স পাশ করা একটি ছেলে চাকরি বাদ দিয়ে লিচুর বাগান করে এক মৌসুমে ১৮ লক্ষ টাকা আয় করছে, অনার্স পাশ করা একটি মেয়ে চাকরি বাদ নিজের ফ্যাশন হাউজ গড়ে তুলে আরো ৫ জন মেয়ের কর্ম সংস্থানের সৃষ্টি করেছে। মাস্টার্স পাশ করা একটি আদিবাসী ছেলে চাকরি বাদ দিয়ে হাঁসের খামার করে বছরে ২০ লক্ষ টাকা আয় করছে।
বর্তমানে আমাদের দেশের বেশীর ভাগ বাবা মা সন্তানকে বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বড় সরকারী অফিসার হবার জন্য বলেন কিন্তু কোন বাবা মা তার সন্তানকে বলে না তুমি বড় হয়ে মার্ক জাকারবার্গের মত একটি বড় সোশ্যাল মিডিয়া সাইটের প্রতিষ্ঠাতা হবে বা ল্যারি এলিসনের মত বড় একটা সফটওয়্যার কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করবে, স্বপ্নটা সবসময় বড় দেখতে হয়, গাড়ী কিনতে হলে বি এম ডাব্লিউ কেনার স্বপ্ন দেখা ভালো, বি এম ডাব্লিউ কিনতে না পারেন দেখবেন একটা নোয়া গাড়ী ঠিকই কিনে ফেলেছেন। কিন্তু আপনি যদি শুরু থেকেই নোয়া গাড়ী কেনার স্বপ্ন দেখেন আপনার কপালে দেখবেন একটা সাইকেল জুটেছে।
মনে রাখেবন উদ্যোক্তা হবার জন্য মনের ইচ্ছাটাই সর্ব প্রথম দরকার, আপনার কাছে কি আছে আর কি নেই সেটা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট না করে যা আছে তাই নিয়েই শুরু করুন। আপনার কাছে কি আছে আর কি নেই সেটা বড় বিষয় না, আপনি কি পেতে চান সেটাই আসল বিষয়।

জীবনটা খুব বেশী বড় না, তাই এই সুন্দর জীবনটাকে চাকরির যাঁতাকলে পিস্ট করার কোন মানে হয় না। নিজের মত করে বাঁচুন, জীবনটাকে উপভোগ করুন এবং অবশ্যই পরিবারকে ভালবাসুন।