খ্রিস্টীয় পরিবারের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়

বিশপ জের্ভাস রোজারিও:

বর্তমান বিশ্বের বাহ্যিক উন্নয়ন ও সামাজবির্বতনের জটিল পরিস্থিতির কারণে পরিবার এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে পাড় হচ্ছে। বিগত ১০০ বছরে পৃথিবীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে তা অভাবনীয়। এর ফলে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের মানুষই কম বেশি উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়েছে, শুধু তাই নয়, বলা যায় মানুষ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে যেন ছুটে চলেছে। এখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে, প্রযুক্তি আবিষ্কার ও ব্যবহারে, ভ্রমণ ও পরিবহণ ব্যবস্থায়, গণযোগাযোগের ক্ষেত্রে, মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে, ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষ অনেক উন্নতি করেছে ও করে যাচ্ছে। এইসব উন্নতির কারণে সকল মানুষেরই উপকার হয়েছে, তবে অপকারও কম হয়নি। এইসব উন্নতির কারণে পরিবার তার স্বকীয়তা ও অখন্ডতা হারাচ্ছে। এখন কাজের কারণে মানুষকে নিয়তই ছুটে চলতে হয়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। আবার একইস্থানে অবস্থান করলেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগের প্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে পরিবারের অনেক চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা রয়েছে যা সমাজের জন্যও সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন পৃথিবীর জন্য আশীর্বাদ হলেও এর অপব্যবহারের প্রথম ভিক্টিম বা বিপন্নতার শিকার হচ্ছে পরিবার। কারণ পরিবারের সদ্যসদের উপর এই উন্নয়ন বিভিন্ন রকম প্রভাব ফেলছে। এখন পরিবারের সদস্যদের প্রায় সকলেই কোনো না কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার করছে। তাতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগের প্রকৃতি ও গুনাগুণ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা কাছের বা দূরের আত্মীয়দের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু এই যোগাযোগের সহজলভ্যতার কারণে তাদের অনেকে বিভ্রান্তও হচ্ছে এবং বিপদেও পড়ছে। পরিবারের জন্য মোবাইল ফোন ও টেলিভিশন হলো বর্তমানের আবশ্যকীয়তা। প্রত্যেক পরিবারেই এখন মোবাইল ফোন ও টেলিভিশন দেখা যায়। নিজে থেকেই এগুলি খারাপ নয়, কিন্তু এগুলির অপব্যবহারের ফলে পরিবারগুলি বিপন্ন হচ্ছে বেশি।  মোবাইল ফোনে অপ্রয়োজনীয় বন্ধুত্ব ও যোগাযোগ পরিবারের সদস্যদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে যুবক যুবতীরা বিপথগামী হয় ও বিপদে পড়ে। আর টেলিভিশন যদিও এখনো আমাদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম, এর মধ্যে ভারতীয় সিরিয়াল নাটক ও তদ্রুপ বিষয়গুলোর বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে আমাদের সকলেরই কম বেশি জানা আছে। এইসব সিরিয়ালের কারণে অনেক পরিবারে অঘটন ও দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে।

মোবাইল ফোনে অপ্রয়োজনীয় বন্ধুত্ব ও যোগাযোগ পরিবারের সদস্যদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

তাছাড়া এখন প্রায়ই দেখা যায় যে খ্রিস্টান ছেলে-মেয়েরা স্কুলে বা কলেজে ভালো রেজাল্ট বা ফলাফল করতে পারে না। যারা গরীব তাদের কথা না হয় বাদই দেওয়া গেল; কিন্তু যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো, বাবার আয় ভালো এবং ধনী পরিবারের সন্তান, তারাও লেখাপড়ায় ভালো করতে পারে না। এর কারণও আলসেমী, ভোগবাদী মনোভাব ও গা ভাসিয়ে চলা। গরীব ছেলেমেয়েরা তাদের সামর্থের তুলনায় ভালো রেজাল্ট করলেও, অবস্থাপন্ন খ্রিস্টান পরিবারের সন্তানেরা পড়াশোনায় মনোযোগী নয়। তারা যদিও লেখাপড়া কোনরকম চালিয়ে যায়, তাদের এই ব্যাপারে উৎকর্ষ লাভের কোনো চেতনা বা প্রতিযোগিতা নেই। যদি তা থাকতো তা হ’লে খ্রিস্টানদের মধ্যে থাকতে পারতো আরও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বৈজ্ঞানিক, বৈমানিক, উচ্চপদস্ত সরকারি কর্মকর্তা, সেনা বা পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমাদের খ্রিস্টান পরিবারগুলির চিত্র হতাশাব্যঞ্জক। এই জন্য পরিবারের বাবা ও মা’দের সন্তানদের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হতে হবে।

অন্য সকল সম্পর্ক বিসর্জন দিয়ে হলেও তাদের দম্পত্য প্রেমের সম্পর্ক রক্ষা  করা উচিত। তাছাড়া এখন জীবিকা ও কাজের সঙ্গে বুঝাপড়া কমে যায়, সন্দেহ ও অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। অন্য কারো সঙ্গে অযাচিত ও অনৈতিক সম্পর্কও গড়ে উঠে। অনেক খ্রিস্টান পরিবারে এই কারণে ভাঙ্গনও দেখা যায়। এই সমস্যা দূরিকরণের জন্য যতদূর সম্ভব স্বামী-স্ত্রীদের একত্রে থাকার ব্যবস্থা করা উচিত বা ঘনঘন পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়া উচিত।

তবে পরিবারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক। দাম্পত্য প্রেমের সুসম্পর্ক বজায় রাখাই এখন স্বামী-স্ত্রীদের বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ পরিবারের ও সমাজের অনেকে এই সম্পর্কের উপর প্রভাব খাটাতে চেষ্টা করে ও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে বিষিয়ে দিয়ে নিজেদের স্বার্থে তাদেরকে ব্যবহার করে। স্বামী-স্ত্রীকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, অন্য সকল সম্পর্কের চেয়ে, তাদের মধ্যকার দাম্পত্য প্রেমের সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই অন্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য এই সম্পর্ক বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। বরং উল্টাটাই হওয়া উচিত। অন্য সকল সম্পর্ক বিসর্জন দিয়ে হলেও তাদের দম্পত্য প্রেমের সম্পর্ক রক্ষা  করা উচিত। তাছাড়া এখন জীবিকা ও কাজের সঙ্গে বুঝাপড়া কমে যায়, সন্দেহ ও অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। অন্য কারো সঙ্গে অযাচিত ও অনৈতিক সম্পর্কও গড়ে উঠে। অনেক খ্রিস্টান পরিবারে এই কারণে ভাঙ্গনও দেখা যায়। এই সমস্যা দূরিকরণের জন্য যতদূর সম্ভব স্বামী-স্ত্রীদের একত্রে থাকার ব্যবস্থা করা উচিত বা ঘনঘন পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়া উচিত। আজকাল মোবাইল ফোন ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলি ব্যবহার করে ভৌগলিকভাবে দূরে থেকেও পরস্পরের কাছে থাকা সম্ভব। তবে তার জন্য চাই সদিচ্ছা ও কমিটমেন্ট বা অঙ্গীকার পূরণের প্রচেষ্টা। পরিবারের বহুবিধ সমস্যা সব সময়ই থাকবে। অথনৈতিক বা টাকা পয়সার সমস্যা, চাকরী বা কাজের সমস্যা, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া বা গঠনের সমস্যা, দায়িত্ব পালনের সমস্যা, শ্বশুর-শাশুড়ির সমস্যা, আত্মীয়-স্বজনদের সমস্যা, যোগাযোগের সমস্যা, অজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতার সমস্যা ইত্যাদি। কিন্তু সেসব সমাধান করতে গিয়ে বিবাহিত দম্পতিরা যদি তাদের দাম্পত্য সর্ম্পক হারিয়ে ফেলে তা হলে তাদের লাভ কী? তাই সকল সমাস্যারই সমাধান করতে হবে, কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্কের বিনিময়ে কোনো সমাধান চাওয়া বা গ্রহণ করা উচিত নয়।

আজকাল প্রায় সকল খ্রিস্টান পরিবারেই দেখা যায় বিভিন্ন কারণে সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে অনীহা বা কম সন্তান গ্রহণের প্রবণতা। দূর বা নিকট অতীতে বিবাহিত দম্পতিরা বেশি সন্তান জন্ম দিলেও তারা চেষ্টা করেছেন সন্তানের ভালো শিক্ষা দিতে। এখন যদিও বিবাহিত দম্পতিরা কম সন্তান গ্রহণ করে, তারা তাদের সন্তানদের সঠিক শিক্ষা ও গঠন দিতে পারে না। বর্তমানে পিতামাতারা দুটি বা তিনটি সন্তান গ্রহণ করলেও তাদের সন্তানদের গঠন করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এর প্রধান কারণ হল তাদের জীবনে আদর্শ ও অঙ্গীকার পূরণের প্রচেষ্টার অভাব। এখন তাই পরিবারের ইন্টেগ্রিটির জন্য স্বামী-স্ত্রীদের জীবনের ইন্টেগ্রিটি পূরণ করা আবশ্যক। তাদের হতে হবে সন্তানদের জন্য নৈতিক ও আধ্যাত্মি আদর্শ। সন্তানদের স্বপ্ন পূরণের জন্য পিতামাতাদের চেষ্টা করতে হবে। নিজেদের স্বপ্ন পূরণের জন্য সন্তানদের ব্যবহার করা উচিত নয়। তাই তাদের উচিত সন্তানদের শক্তি ও সামর্থ্য সবার আগে বিবেচনা করা।

পরিবারে প্রবীণ ব্যক্তিদের অবস্থাও বর্তমানে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। অতীতে ভারতীয় উপমহাদেশে পরিবারই ছিল বৃদ্ধ বাব-মায়ের আশ্রয়। এখন যেহেতু একান্নবর্তী পরিবার লোপ পাচ্ছে, সন্তানরা আর একত্রে থাকে না। বিয়ের পর সকলেই একান্নবর্তী পরিবার গড়ে তোলে আর আলাদা থাকে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের আশ্রয় ও যতেœর ব্যপারে অনেক ঠেলাঠেলি হয়; আবার এটা সত্যিই দুঃখজনক কিন্তু বর্তমানের বাস্তবতা। পশ্চিমা দেশগুলিতে রাষ্ট ও চার্চের উদ্যোগে বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে। সেখানে প্রবীণরা তাদের সহায় সম্বল ও  পেনশন বা রাষ্টীয় ভাতা নিয়ে উঠতে পারে। এই ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবন্ধতা আছে কিন্তু মন্দের ভালো বলে কথা। আমাদের দেশে প্রবীণদের জন্য পেনশন নেই বা প্রবীণরাও সন্তানদের প্রতি মায়া ও দরদের কারণে নিজেদের সম্পত্তির সবই সন্তানদের দিয়ে দিতে চান। বৃদ্ধাশ্রমে তারা তাদের সহায় সম্বল দান কররা ভরশা পান না। তাই আমাদের দেশে সেইভাবে ভালো কোনো বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠার সম্ভাবনাও কম। তাই পরিবারেই এই সমস্যার সমাধান হতে হবে। কাথলিক মন্ডলী সব সময়ই প্রবীণদের সেবার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে।

যে সকল পরিবারে প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে, তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথম: এই প্রতিবন্ধীত্ব যদিও কেউ ইচ্ছে করে গ্রহণ করে না। তথাপি সমাজের কাছে পরিবারের সদস্যদের বিব্রতকর থাকতে হয়। কারণ এটি এখনো পর্যন্ত সামাজিক স্টিগ্মা। কেউ প্রতিবন্ধী সন্তান চায় না বা গ্রহণ করে না কিন্তু কোনো জেনেটিক বা অন্য কোনো অজানা কারণে পরিবারে প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নিতে পারে। কোনো অভিশাপের কারণে নয়। তাই পরিবারের পিতা-মাতা ও অন্য সদস্যদের উচিত খোলা মন নিয়ে সেই সন্তানকে গ্রহণ করা। আমাদের সকলেরই উচিত এই বিষয়ে সচেতন হওয়ার যে এই প্রতিবন্ধী সন্তানটিও একজন মানব সন্তান। তার রয়েছে মানবীয় মর্যাদা ও অধিকার। আমরা যেন কোনোক্রমেই তার সেই মর্যাদা ও অধিকার ক্ষুন্ন না করি। এই সন্তানটিকেও পরিবারের অন্য সদস্যদের মত গ্রহণ করতে হবে। তার প্রতি আমাদের যে সেবা দায়িত্ব, তা শুধু দয়া বা করুণা করার জন্য নয় বরং এই সেবা পাওয়া তার একটি নৈতিক অধিকার। পরিবারে প্রতিবন্ধী সন্তানকে যদি সঠিক মর্যাদায় গ্রহণ করা হয় ও দেখা হয়, তাহলে সে হয়ে উঠতে পারে পরিবারের সকল সদস্যদের জন্য ভালাবাসা ও মিলন কেন্দ্রবিন্দু। মন্ডলীর দিক থেকে এই বিষয় যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যেন পরিবারে প্রতিবন্ধীদের সঠিকভাবে যতœ করা হয়।

খ্রিস্টান পরিবারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ বর্তমানে সন্তানদের মাদকাসক্তি। আজকাল অনেক খ্রিস্টান পরিবারের ছেলে-মেয়েরা পারিবারিক পরিবেশের কারণেই হোক বা পিতামাতার অবহেলার কারণেই হোক মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। খ্রিস্টান পরিবারের সন্তান যখন মাদকাসক্ত হয়, অন্যান্যদের মত পরিবারের পক্ষে এই বিষয়টি অস্বীকার করা হয় বা লুকানোর চেষ্টা করা হয়। এটা কোনো সমাধান নয় বা সমাধানের কোনো উপায় নয়। পরিবারের উচিত সন্তানদের ভালোবাসা, সঙ্গ দেওয়া, আনন্দ  দেওয়া ও তাদের প্রয়োজন মিটানো; তবে সেই সঙ্গে প্রতিদিন তাদের খোঁজ খবর রাখা ও প্রয়োজনে সংশোধন করা বা শাস্তি দেওয়াও পরিবারের পিতা-মাতাদের অবশ্য কারণীয় কাজ। এই কাজে প্রয়োজনে সমাজের ও মন্ডলীর অন্যদের সহায়তাও নেওয়া উচিত। এই দায়িত্ব অবহেলা করে গেলে একদিন সর্বনাশা হয়ে যেতে পারে এবং শুধু মাদকাসক্ত সন্তানের ক্ষতিই হবে না, সেই সঙ্গে পরিবারের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। আর সন্তান একবার মাদকাসক্ত হয়ে গেলে তা লুকিয়ে না রেখে, একজন অসুস্থ ব্যক্তির মত তাকে সুস্থ করার প্রচেষ্টা নিতে হবে সকলের সহায়তায়। মনে রাখতে হবে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার ও সকলের ভালবাসা পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা যেন সকলে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের সেই অধিকার মেনে চলি। পরিবারের সদস্যদের সেই ব্যপারে বেশি সচেতন থাকতে হবে।

বর্তমানে অধিকাহারে খ্রিস্টান বা খ্রিস্টীয় পরিবার ধর্মকর্ম ও গীর্জা-প্রার্থনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বলা যায় এটাও সেইসব পরিবারের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের কারণ। আগের দিনে পরিবারে পরিবারে সন্ধ্যা-প্রার্থনা ও বাইবেল পাঠ করার একটা রীতি ছিল। পরিবারের সকলে রবিবার দিন ও পর্বদিনে গীর্জায় যেত। কিন্তু এখন কতভাগ পরিবারে পারিবারিক প্রার্থনা হয় বা কতভাগ পরিবার গীর্জায় যায়, আমার জানা নাই। তবে এটা নিঃসন্দেহে বলতে পারি শতভাগ পরিবারে এই চর্চা আর নেই। এখন সন্ধ্যা প্রার্থনার স্থান দখল করে নিয়েছে টেলিভিশন, মোবাইল ও ফেইসবুক। আর গীর্জা ও ধর্মশিক্ষার স্থান দখল করেছে সন্তানদের ‘তথাকথিত’ প্রাইভেট কোচিং ও সাজগোজ করে বেড়াতে যাওয়া। পারিবারিক প্রার্থনা ও গীর্জার কথা উঠলে কত যে অজুহাত বের হয় তার কোনো ইয়ত্তা নেই! অথচ প্রতিদিন আমরা খাওয়ার সময়, পড়ার সময়, কাজের সময়, বিশ্রামের সময়, বেড়ানোর সময়, বাজারঘাট করার সময়, ইত্যাদি সবের সময় ঠিকই পাচ্ছি। শুধু ঈশ্বরের জন্য আর মন্ডলীর জন্যই সময় নেই। এইজন্য পরিবারে অনেক নৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয় যা পরিবারকে বিপথে নিয়ে যায় বা বিপদে ফেলে। তারপর ফাদারদের কাছে বা সমাজে প্রধানদের কাছে এসে সহায়তা বা সমাধান চাইলে তা দেওয়া সহজ হয় না। গীর্জা প্রার্থনা পরিবারকে আধ্যত্মিক ও নৈতিক শক্তি জোগায় এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সংহতি বৃদ্ধি করে।

এইসব ছাড়াও বর্তমানে বাংলাদেশে খ্রিস্টীয় পরিবারে আরও অসংখ্যা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য খ্রিস্টান পরিবারগুলিকে প্রস্তুত হতে হবে ও শিক্ষা নিতে হবে। কাথলিক মন্ডলী এইজন্য বিবাহ প্রস্তুতি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। যদিও এই প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতে বিবাহিত জীবনের জন্য অনেক দরকারি, দেখা যায় অনেক পরিবার এই প্রস্তুতি প্রশিক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে না বা তা করতে চায় না। বিবাহিত দম্পতিদের জন্যও বিভিন্ন পর্যায়ে সেমিনার বা আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। কিন্তু তাতেও বিভিন্ন অযুহাতে তেমন সাড়া পাওয়া যায় না। অথচ এইগুলি পরিবারের মঙ্গলের জন্য অনেক টাকা পয়সা খরচ করেই করা হয়। তাছাড়া ‘বিবাহ সাক্ষাৎ’ নামে একটি দাম্পত্য সেবাও বাংলাদেশে চালু আছে। সেখানেও বিবাহিত দম্পতিরা অংশ গ্রহণ করতে চায় না। যারা অংশগ্রহণ করে তাদের ডেকে আনতে গলদঘর্ম হতে হয়। অথচ ‘বিবাহ সাক্ষাৎ সপ্তাহান্ত’ করার পরে অংশ নেওয়া দম্পতিরা সকলেই এর প্রশংসা করে ও উপকৃত হয়।

‘বিবাহ সাক্ষাৎ’ সেবা সকল খ্রিস্টান দম্পতিদের জন্যই উপযুক্ত। কারণ এটা শুধু দাম্পত্য জীবনের জন্যই নয় বরং তাদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জীবনের জন্যও প্রয়োজন। এই প্রশিক্ষণ পেয়ে তারা সুখের জীবনের কলাকৌশলের পাশাপাশি মৌলিক ধর্মশিক্ষাও পায়। তারা মন্ডলীকে ভালোমত চিনতে পারে। পরিবার যে একটি ‘গৃহমন্ডলী’ তারা এই বিবাহ সাক্ষাৎ করার পরে বুঝতে পারে। তাছাড়াও ‘কাপল ফর খ্রাইষ্ট’ নামক দাম্পত্য সেবার আরও একটি ভালো আন্দোলন রয়েছে। যারা এইসব কিছুর সাথে যুক্ত থাকবে, তারা ভালো খ্রিস্টান পরিবার গড়ে তুলতে পারবে বলেই বিশ্বাস।

লেখক: ধর্মপাল, রাজশাহী কাথলিক ধর্মপ্রদেশ