অধার্মিকের ধর্মকথা -২

খোকন কোড়ায়া

ঈশ্বর কি আমাদের প্রার্থনা শুনেন ?

এই প্রশ্নটি আমাদের অনেকের মনেই ঘুরপাক খায়, ঈশ্বর কি আমাদের প্রার্থনা শুনেন ?

আমরা অনেকে আবার অভিমান করে ঈশ্বরকে অন্ধ, কালাও বলে থাকি – ঈশ্বর আমাদের কথা শুনতে পাননা, আমাদের সমস্যা দেখতে পাননা। আসলেই কি তাই? কিন্তু ঈশ্বরতো আমাদের পরম পিতা। তিনি অসীম দয়ালু, অসীম শক্তিধর, তিনি আমাদের ভালোবাসেন, তিনি কেন আমাদের প্রার্থনা শুনবেন না!

আমাদের জন্য যা প্রয়োজনীয়, মঙ্গলজনক ঈশ্বর তা-আমাদের দান করেন

আমাদের বাবাতো আমাদের অনেক আবদার রক্ষা করেন তবে ঈশ্বর আমাদের পরম পিতা হয়েও কেন আমাদের সব দাবী দাওয়া পূরণ করেন না। বাবার সঙ্গে ঈশ্বরের পার্থক্য হল বাবার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ আর ঈশ্বরের ক্ষমতা অসীম। বাবা আমাদের শুধু অতীত আর বর্তমান জানেন কিন্তু ঈশ্বর আমাদের ভবিষ্যতও জানেন, আমাদের  সবকিছু জানেন তিনি। তিনি আমাদের মঙ্গল চান। তাই আমরা কিছু চাইলেই তিনি তড়িঘড়ি করে তা পূরণ করেন না। আমাদের চাহিদা যদি আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় হয়, মঙ্গলজনক হয় তবেই তিনি তা কবুল করেন, নচেৎ নয়।

আমরা কি সত্যিকারের বিশ্বাস নিয়ে প্রার্থনা করি ?

আমরা আজ ঈশ্বরের কাছে কিছু যাচনা করি, পরদিনই সেটার ফল পেতে চাই। আর তৃতীয় দিন থেকে আমরা ভাবতে শুরু করি ঈশ্বর আমার প্রার্থনা গ্রাহ্য করেননি। তারপর আমরা ঈশ্বরকে দোষারোপ করতে শুরু করি – কত পাপী, কত দুষ্ট মানুষকে ঈশ্বর কত ভালো রেখেছেন অথচ আমার সামান্য প্রার্থনাটা তিনি পূরণ করলেন না। কিন্তু ঈশ্বর চান আমরা তাকে পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করি, বিশ্বাস করে অপেক্ষা করি। তার উপর সম্পূর্ণরুপে নির্ভর করি। তিনি ্ধৈর্যহীনদের, অল্প বিশ্বাসীদের পছন্দ করেন না। তাছাড়া আমাদের বুঝতে হবে ঈশ্বর অনন্তলোকের রাজা। তার সময় অফুরান। তাকে সময় বেঁধে দেয়া মোটেও উচিত নয়।

ঈশ্বর শেয়ারে কোন কাজ করেন না 

কেউ আমাদের ক্ষতি করলে, আমাদের প্রতি অন্যায় করলে আমরা ঈশ্বরের কাছে বিচার দেই। ঈশ্বর কাজটা হাতে নেন এবং তাঁর নিজের নিয়মে অগ্রসর হতে থাকেন। আমরা কিন্তু ঈশ্বরের কাছে বিচার দিয়েই ক্ষ্যান্ত দেইনা, আমরাও নিজেরাও চেষ্টা করতে থাকি কিভাবে লোকটাকে শায়েস্তা করা যায়, বেকায়দায় ফেলা যায়। আর তখনি ঈশ্বর সেই কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নেন কারণ তিনি শেয়ারে কোন কাজ করেন না। তিনি অসীম শক্তিধর, কারো সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করার তাঁর প্রয়োজন নেই। ছোট-বড় যে কোন কাজ করার জন্য তিনি একাই যথেষ্ট।

ঈশ্বরের কাছে আমরা বিচার চাই কিন্তু শাস্তিটা নিজেই বেঁধে দেই

আমরা প্রায়ই ঈশ্বরের কাছে বিচার প্রার্থী হই কিন্তু শাস্তিটাও নিজেরাই বেঁধে দেই।  যেমন আমরা বলি- হে ঈশ্বর, অমুক আমার এত বড় ক্ষতি করেছে, ওকে তুমি পঙ্গু করে বিছানায় ফেলে রাখ, ওকে অন্ধ করে দাও, ওর সব ধন সম্পদ কেড়ে নিয়ে ওকে পথের ফকির বানাও, এমনকি আমরা আসামীর মৃত্যুদন্ডও কামনা করি। ঈশ্বর এই ধরণের কেস গ্রহণ করেন না কারণ আসামীর শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব বিচারকের, বিচারপ্রার্থীর নয়। তবে ঈশ্বর অপরাধীকে অবশ্যই সাজা দেন কিন্তু আমরা অনেক সময়ই তা বুঝতে পারিনা। বুঝতে পারিনা তার কারণ আমরা ত্বরিৎ এ্যাকশন চাই কিন্তু ঈশ্বর তা করেন না। হয়তো একটা মানুষ আজ অপরাধ করলো ঈশ্বর কিন্তু বিশ বছর পরও তাকে শাস্তি দিতে পারেন। আর সেই শাস্তিটা আমাদের দৃষ্টিগোচর না হওয়ারই কথা। তাছাড়া  আমারা চাই দৃশ্যতঃ শাস্তি। একজন আমার দশ লক্ষ টাকা আত্মস্মাত করেছে আমি চাই তার এক কোটি টাক্রা ক্ষতি হোক। ঈশ্বর অনেক সমযই তা করেননা। তিনি টাকার বদলে অপরাধীকে অন্য কোন শাস্তি দেন। আর আমি ভাবি আমার দশ লক্ষ টাকা মেরে দিয়ে লোকটাতো ভালোই আছে কিন্তু যে শাস্তি পেয়েছে সে-ই জানে দশ লাখ টাকার চেয়ে কত কঠিন সেই শাস্তি।

আমরা কি প্রার্থনায় শুধু নিজেদের চাহিদার লিস্ট পাঠ করি ?

– হে ঈশ্বর, আমার প্রমোশনটা ঝুলে আছে, একমাত্র তুমিই পার ওটা পাইয়ে দিতে। হে ঈশ্বর, আমার স্ত্রীর পায়ে ব্যথা , সারিয়ে দাও। হে ঈশ্বর, আমার ছেলেটা উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চায়, তুমি ওর মনোবাঞ্ছা পূরণ কর। হে ঈশ্বর, আমার মেয়েটা বিবাহযোগ্য, তুমি ওর সুপাত্রের ব্যবস্থা করে দাও। হে ঈশ্বর, তুমিতো জান আমার গাড়ীটা পুরনো হয়ে গেছে, আমি একটা নতুন গাড়ী কিনতে চাই , তুমি আমাকে সাহায্য কর। হে ঈশ্বর, তুমিতো দেখতেছো এ্যাপার্টমেন্টে বাস করলে কত রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, বারিধারায় আমার এক টুকরো জমি আছে, ওখানে আমি একটা বাড়ী করতে চাই, তুমি আমাকে শক্তি, সাহস আর সামর্থ দান কর প্রভু। হে ঈশ্বর, তুমিতো দেখেছো প্রভু এই সমিতির জন্য আমি কতটা শ্রম দিয়েছি, আমার পরিবারকে সময় না দিয়ে আমি সমিতির জন্য কাজ করেছি, আমার মেয়ের গায়ে হলুদের দিন আমি রেজিষ্ট্রি অফিসে গেছি সমিতির জমি রেজিষ্ট্রি করার জন্য, আমি আরেকবারএই সমিতির প্রেসিডেন্ট হতে চাই, আমাকে সুযোগ দাও প্রভু।

আমাদের প্রার্থনা যদি এরকম শুধু ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে সে প্রার্থনা ঈশ্বর না-ও শুনতে পারেন। ঈশ্বর বলেছেন, তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মত ভালোবাসবে। তিনি চান আমার যে প্রতিবেশী গুরুতর অসুস্থ্য আমি যেন তার জন্য প্রার্থনা করি, যে প্রতিবেশী গভীর সমস্যায় জর্জরিত, আমি যেন তার জন্য প্রার্থনা করি, যে প্রতিবেশী পাপে নিমগ্ন  আমি  তার জন্যও যেন প্রার্থনা করি। অন্যদের জন্য দশটা প্রার্থনা করার পর আমি নিজের জন্য যদি একটা কিছু চাই তবে ঈশ্বর সেটা অবশ্যই গ্রাহ্য করবেন।

ঈশ্বরের কাছে কিছু চাওয়ার আগে আমরা কি আমাদের পাপের ক্ষমা চাই?

ঈশ্বরের কাছে কিছু চাওয়ার আগে অবশ্যই আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে, মনকে কালিমামুক্ত করতে হবে। আমাদের পাপস্বীকার করতে হবে, ঈশ্বরের কাছে পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে, অনুতপ্ত হতে হবে। আর কারো সঙ্গে আমাদের বিরোধ থাকলে তা মিটিয়ে ফেলতে হবে। কেউ আমার প্রতি অন্যায় করে থাকলে তাকে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা করতে হবে।

আমাদের পিতা যদি আমাদের আবদার পূরন করেন, তবে ঈশ্বর আমাদের পরম পিতা হয়ে কেন আমাদের প্রার্থনা শুনবেন না, অবশ্যই শুনবেন। তবে প্রার্থনা করতে হবে পরিপূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে, আর অপেক্ষা করতে হবে গভীর প্রত্যয় নিয়ে। সে প্রার্থনা যদি আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হয় এবং কারো জন্য অমঙ্গলজনক না হয় তবে সে প্রার্থনা ঈশ্বর অবশ্যই পূরণ করবেন।

লেখক: কথা সাহিত্যিক ও ব্যবসায়ী

আরো পড়ুন: অধার্মিকের ধর্মকথা ১