সাওঁতালদের বর্ণমালা বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামত রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃতি হোক

মার্শাল টুডু:

ভাষা একেকটি জাতির স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে ,যা একটি জাতির সমাজ-সংস্কৃতি ও জীবনাচরণকে তুলে ধরে। আর সেই ভাষা বেঁচে থাকে লেখনীর মাধ্যমে । বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলে অসংখ্য ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার মানুষ বসবাস করে।পারপার্শ্বিক বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা,বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে প্রভৃতি কারনে এইসব জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে। বর্তমান সরকার বিষয়টি অনুধাবন করে ২০১০ সালে একটি শিক্ষানীতি বিল সংসদে পাশ করেছিল । ফলে  সেই শিক্ষানীতিতে ২০১৪ সালের প্রথম থেকেই ৫টি  ক্ষুদ্রজাতিস্বত্তার শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজ ভাষায় পাঠদানের সিদ্বান্ত গৃহীত হয়।এসব জনগোষ্ঠী হলো চাকমা, সাওঁতাল ,গারো, উরাঁও, ত্রিপুরা। চারটি জাতি তাদের ভাষার হরফ বিষয়ে ঐক্যে ঁেপৗছালে ও সমতলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাওঁতাল জাতিস্বত্তার মানুষ তাদের ভাষার হরফ নির্বাচনের বিষয়ে মতপাথর্ক্যে জড়িয়ে পড়ে। এরকম পরিস্থিতিতে মধ্যে সরকার সান্তালদের ভাষা বিষয়ে সিদ্বান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকে। ২০১৭ সালে সরকার সাওঁতাল ভাষা ব্যতীত অন্য ৪ টি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক ছাপানো ও সরবরাহ করা শুরু করে । ২০১০ সালে শিক্ষানীতি ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই সান্তালী হরফ নিয়ে বির্তকের সূত্রপাত হয় । শুরু থেকেই সাওঁতাল জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী ১০টির অধিক সংগঠন সহ, সান্তালদের ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় সংগঠন আদিবাসী মুক্তি মোর্চা সাওঁতাল শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে  সাওঁতালী হরফ (রোমান হরফ) দাবি করছে। বাম আর্দশে বিশ্বাসী শুধু আদিবাসী পরিষদ নামক সংগঠনে থাকা গুটিকয়েক সান্তাল নেতৃবৃন্দ বিশেষ রাজনৈতিক দলের পেশিশক্তির দ্বারা এর বিরোধিতা করছে, সংর্কীণ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হতে ।যদি ও তারা গোটা সান্তাল সমাজের সাংগঠনিক প্রতিনিধিত্ব করেনা ।প্রথমে তারা সাওঁতালী ভাষা বাংলা হরফে লেখার দাবি করে। বাংলা ভাষা পবিত্র ও শহীদের ভাষা, তা শুধু বাংলা ভাষার জন্য প্রযোজ্য। বাংলা হরফে সাওঁতালী ভাষা লেখলে সাওঁতাল ভাষার স্পষ্ট ও সুন্দর উচ্চারণ বিকৃত হয়ে যায় এবং কোন শব্দ লেখার ক্ষেত্রে বানানগত জটিলতা তৈরী হয়। এখন তারা উড়িষ্যা অঞ্চলে বসবাসরত সান্তালদের আঞ্চলিক ভাষায় তৈরী অলচিকি হরফ দিয়ে সান্তালী ভাষার হত্যার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এটি ১৯৩০ সালে উড়িষ্যার ময়ূরভূঞ্জে রঘুনাথ মুর্ম কর্তৃক প্রণীত হয় । অলচিকি কোন সান্তালী বর্ণমালার উচ্চারণ  নয়,তা দুর্বোধ্য সাটঁলিপির অনুরূপ ।অলচিকি হরফ মূলত অবৈজ্ঞানিক ভাবে বিভিন্ন লিপি  থেকে সংগৃহীত হয়েছে । যেমন :সি,এস,উপাসক লিখিত ‘দ্য হিষ্ট্রি এন্ড প্যালিওগ্রাফি অফ মোরিয়ান ব্রাক্ষী স্ক্রিপ্ট গ্রন্থের১৯১, ২৪১, ২৮৪, ২৮৮, ২৮৯, ৩০৯পৃষ্ঠায় দর্শিত লিপিমালার সাথে অলচিকির হুবহু মিল রয়েছে । এছাড়া ব্লুমফিল্ড এর ‘ল্যাঙ্গুয়েজ ’ গ্রন্থে অবস্থিত গ্রন্থের সাথে হুবহু মিল রয়েছে । এছাড়া  মৌর্যযুগের ব্রাহ্মী লিপি ও দক্ষিণ ভারতীয় চিত্রলিপির সাথে অলচিকির হুবহু মিল দেখতে পাওয়া যায়। অলচিকিতে ‘ক’ কে আক,‘জ’ কে আজ,‘ল’ কে আল,‘গ’ কে অগ,‘র’ কে ইর,‘দ’কে উদ,‘প’ কে এপ ,‘ন’ কে এন,‘ত’ কে অত,‘ঙ’ কে অং,‘ম’ কে আম,‘ঞ’কে ইঞ ইত্যাদি উচ্চারণ করা হয় । সান্তালী ভাষাতে ৪৭টি ধ্বনি আছে ,এর জন্য ৪৭ টি অক্ষরের প্রয়োজন ,কিন্তু অলচিকিতে মাত্র ৩০ টি অক্ষর রয়েছে । কিন্তু সান্তালী রোমান বর্ণমালাতে তা পুরোপুরি রয়েছে। এছাড়া অবদমিত ব্যঞ্জনধ্বনি ‘ক’, ‘চ’,‘ত’,‘ৎ’,‘প’ এর পরিবর্তে অলচিকিতে ‘গ’,‘জ’,‘দ’,‘ব’ লেখা হয় ,এতে উচ্চারণ নিরূপনে অবাস্তবতা পরিলক্ষিত হয় । এভাবে অলচিকি  ব্যাকরণগত ক্রটি ও অক্ষরগত সীমাবদ্ধতা ছাড়া বহু কারণে ভারতের সান্তালদের কাছে বির্তকিত থেকেছে । ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসরত সান্তালদের রাজনৈতিকভাবে বিভাজনের স্বার্থে উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাংশের সান্তাল অধূষ্যিত অঞ্চলের সংরক্ষিত আদিবাসী রাজনৈতিক আসনগুলোতে অলচিকিকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচেছ ।আবার ভারতের সাওঁতাল জনগণ সুদীর্ঘকাল হতে সান্তালী ভাষায় শিক্ষা অর্জন ও সাহিত্য লেখার জন্য রোমান হরফ ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু অলচিকি পন্থীদের দাবী রোমান হলো নাকি উপনেবিশবাদী ও মিশনারী খ্রিষ্টানদের বর্ণমালা ,তাদের এই মনগড়া অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যে। আসলে আসলে তারা খ্রিষ্টান ধর্ম সর্ম্পকে অবগত নয় । খ্রিষ্ট ধর্মের জন্মের ১০০০ বছর পূর্ব থেকেই এই লাতিন বর্ণমালা তৈরী করা হয়েছিল । আর বাইবেল প্রথমে আরামায়িক ভাষায় লেখা হয়েছিল ,পরে তা পৃথিবীর বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। সত্য কথা এই যে, এই হরফ জড় উপাসক বা পৌত্তলিক বর্ণমালা ।পরবর্তীতে রোমানরা এটিকে সংস্কার করে বিধায় একে রোমান হরফ বলে। আজকে আমরা যে ইংরেজী ভাষা বলি ও ব্যবহার করি ,সেটি ও রোমান বর্ণমালা ।  পৃথিবীর অধিকাংশ জাতির নিজেস্ব ভাষা নেই, এটা নিয়েও তারা মোটেও উদ্বিগ্ন নয়। বিশ্বের ৭০% এর অধিক ভাষা রোমান হরফেই  লেখা হয়। যেমন তুর্কি,ইন্দোনেশীয়, ভিয়েতনাম,র্জামান,প্রভৃতি ভাষা । রোমান র্বণমালা বিশ্বের র্সাবজনীন বর্ণমালা যা ল্যাটিন হতে উৎসারিত। বর্ণমালার মাঝে কোন খারাপকিছু নেই । বৈজ্ঞানিক  তত্তের ও জিনিষের মাঝে যে ধর্ম খুজবে সে কোন দিন এগোতে পারবে না। কারণ জীবন ধারণের  প্রয়োজনীয় সব জিনিষ ও তত্ত্ব অধিকাংশ ইংরেজরা তৈরী করেছে । এখন সব দেশের রাষ্ট্রে প্রধানরা বা বিশ্বায়নের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের শাসন  কার্য পরিচালনা করছে ।

উপমহাদেশে সান্তালী ভাষা রোমান হরফে  লেখ্যরুপ প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৮৪৫ সাল থেকে । সেই হিসেবে আজ পযর্ন্ত প্রায় ১৭১ বছরের ইতিহাস । আর ভারতীয উপমহাদেশে প্রকাশনা কার্যক্রমের দিক থেকে সান্তালী হরফে লিখিত ভাষার (রোমান) দাপট ও প্রভাব অনেক বেশী ,যেমন : জুগ সিরিজল ,নাওয়া ইপিল ,মার্শাল তাবোন সহ আরো অনেক উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা রয়েছে ।এছাড়া সান্তালী হরফে (রোমান )আসাম সরকার ,পশ্চিম বঙ্গ ,বিহার ও ঝাড়খন্ড রাজ্য সরকার শিক্ষা ও প্রকাশনা কার্যক্রম চালু রয়েছে আর বাংলাদেশ সেই হরফে সান্তালী ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ইতিহাস প্রায় ৯০ বছরের অধিক । মূলত রোমান হরফ থেকে অক্ষর ও ডায়া ক্রিটিক্যাল মার্ক নিয়ে মৌখিক উচ্চারণ ও সঠিক ব্যাকরণগত দিক বিবেচনাই রেখে এই সান্তালী ভাষা রচিত হয়েছে । এর ফলে সান্তালীর সান্তালী ভাষার সঠিক উচ্চারণ ও মাধুর্যতা আসে ।

বাংলাদেশে সান্তালী শিশুদের নিয়ে সান্তালী ভাষায় (রোমান) ভাষায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ লক্ষ করা যায় জয়পুরহাটে বেগুনবাড়িতে ১৯০৫ সালে। বেণীদুয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯২৫ , নিকেশ্বর ১৯৬২ । এছাড়া ও গোটা উত্তরবঙ্গে মোট ২০১ টি স্কুলে প্রাক -প্রাথমিক ও প্রাইমারী পর্যায়ে এই পুস্তক ও পাঠ্যদান করা অব্যাহত রয়েছে । মিশনারী ও এনজিও সহযোগিতা ব্যাতীত এ বর্ণমালায় বাংলাদেশ  হতে অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে । যেগুলো প¦ার্শবতী ভারতেও সাড়া জাগিয়েছে । যেমন Haram Koak ato (সান্তাল সমাজ ব্যবস্থা), Hor hopon  (সান্তালদের ইতিহাস বিষয়ক বই), Mare Hapramkoak katha (সান্তাল সমাজ ব্যবস্থা বিষয়ক বই)  সান্তালী ভাষা অভিধান সান্তাল পারগাণা প্রভৃতি। এ ছাড়াও এ বর্ণমালায় (Santals Civil Law) নামে একটি ম্যাগাজিন বের হয়  মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকে । এছাড়া তাবিথা সংবাদ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা এ ভাষায় বের হয়ে সাহিত্য চর্চার জন্য নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে । এছাড়ায় এ বর্ণমালায় এ হরফে পযার্প্ত সাহিত্য কর্ম, ব্যাকরণ,সান্তাল বাংলা অভিধান ,পি.ও বোডিং ৬ খন্ড সান্তালী ইংরেজী অভিধান ,ক্যাম্ববেলসহ অনেক সান্তালী লেখকের রচিত বই ও পাঠ্যপুস্তক রয়েছে । প্রকাশনার মতো প্রযুক্তির ক্ষেত্রে  সান্তালী হরফের জয়জয়কার । বাংলাদেশের তরুণ প্রযুক্তিবিদ সমর এম সরেন কম্পিউটারে ব্যাবহার উপযোগী (Arial unicode Ms Santali font)ও মোবইল  উপযোগী হড় কাথা সফটওয়্যার রয়েছে । যার মাধ্যমে সহজে সান্তালী ভাষা টাইপ করা যায়। এই হরফে সুর্দীঘ কাল হতে সাহিত্যর্কম,ডিকশনারী, ব্যাকরণ,ভাষা শিক্ষার কার্যক্রম প্রণীত করা হয়েছে । এগুলোকে আরও সহজ,সমৃদ্ধ  ও যুগোপযোগী করা যায় ।  কিন্তু নতুন করে তৈরী করা যায় না । এই সান্তালী রোমান বর্ণমালার সান্তাল শিক্ষক  শিক্ষয়ত্রীগণ স্বাধীনাত্তোর এই হরফে শিক্ষাদানের স্কুল থেকে সান্তাল শিশুদের সহজেই পাঠদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা , দক্ষতা ও বিভিন্ন কলাকৌশল অর্জন করেছে । এ ছাড়া শিক্ষক শিক্ষয়ত্রীগণ তাদের নিজেদের শব্দ ভান্ডারকে সমৃদ্ধকরতে রোমান হরফে প্রণীত ডিকশনারী ব্যবহার করছেন । সান্তাল শিশুদের নিকট এ ভাষা সহজে বোধ্যগম্য, তা বাড়তি কোন ঝামেলা নয় ।

আদিবাসী সাওঁতালদের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, গবেষক, সমাজকর্মী,উন্নয়নকর্মী, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সান্তালী প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অধিকাংশ একমত পোষণ করেন যে,বাংলাদেশের সান্তালদের প্রাক প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ণে ও শিশুদের সহজবোধ্য পাঠদানের জন্য সান্তালী রোমান বর্ণমালা সময়পোযোগী এবং যা সময়ের দাবী ।মুষ্টিমেয় প্রোপাগান্ডায় চালিত সান্তাল নেতাদের সংর্কীণ দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং  ব্যাকরণগত যোগ্যতা, উচ্চারণগত যোগ্যতা এবং সান্তাল শিশুদের বোধগম্যতা ও সহজবোধ্যতার বিষয় বিবেচনা করে সান্তালী রোমান বর্ণমালা ব্যবহার করা উচিত ।এতে করে সান্তাল শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার কমবে । অপরদিকে তারা আনন্দ সহকারে নিজ ভাষায় শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত হবে ।সংখ্যাগরিষ্ঠ সান্তাল জনগনের চাওয়া পাওয়ার যৌক্তিক ও যুক্তিসঙ্গত বিষয় বিবেচনা করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট ও তার সরকার ব্যবস্থাকে অবশ্যই সান্তালী ভাষাকে (রোমান) স্বীকৃতি দেওয়া উচিত । আগামী ২০১৮ সাল থেকে এই হরফে সান্তালী হরফে সান্তালী ভাষার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে বলে বিশ্বাস করি । এতে সান্তালী ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা পাবে ।