কবি মতেন্দ্র মানখিনের সাক্ষাৎকার: আমরা থেমে নেই, এগিয়ে যাচ্ছি

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমন সাংমা

তাঁর মাধ্যমে বাংলাদেশের গারো সাহিত্যাঙ্গণ অনেক বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে। ছোট গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ছড়া, গান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সব অঙ্গনেই তাঁর সমান ও অবাধ বিচরণ। তিনি কবি মতেন্দ্র মানখিন। ছাত্রাবস্থা থেকেই লিখছেন, এখনও নিরন্তর লিখে চলেছেন। ১৯৫২ সালের ৩ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার পাহাড়ঘেরা দিঘলবাগ গ্রামে তাঁর জন্ম। গারো ভাষায় অসংখ্য কালজয়ী গান রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি দেশাত্ববোধক, ধর্মীয় গানও লিখেছেন। গীতাবলী ও আচিক বিবালেও তাঁর গান স্থান পেয়েছে। এক সময় বাংলাদেশ বেতারের সালগিত্তাল অনুষ্ঠানে নিয়মিত কথিকা পাঠ করতেন। ফেব্রুয়ারিতে অমর একুশে বইমেলা উপলক্ষে কবিতা উৎসবে যোগ দিতে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। কথা বলেছেন গারো সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে।

প্রশ্ন: লেখালেখির শুরুটা কিভাবে?

মতেন্দ্র মানখিন: মুক্তিযুদ্ধের আগে গারো সমাজে তেমন লেখক ও কবি ছিলনা। এটা নিয়ে খুব ভাবতাম। অষ্টম শ্রেণি থেকেই উপলদ্ধি হয়েছে গারো সমাজে লেখক দরকার, কবি দরকার। নিজেদের সাহিত্য, সমাজের কথা না বললে বাইরে থেকে এসে কেউ তো লিখে যাবেনা সেই ভাবনা থেকেই লেখালেখিতে আসা।

প্রশ্ন: আপনার প্রথম প্রকাশিত লেখা….

মতেন্দ্র মানখিন: আমার লেখা প্রথম কবিতা বর্ষা সাপ্তাহিক প্রতিবেশীতে প্রকাশিত হয়। ছাপা হওয়ার পর কবিতা লেখার নেশা আমার মধ্যে বেশি করে চেপে বসলো। কিন্তু ১৯৮৫-১৯৯০ সাল পর্যন্ত লেখায় ইস্তফা দিয়েছিলাম। পরে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, কতটুকু ঠিক করছি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারব তো? লেখা বা কবিতা ছাড়তে চাইলেও কবিতা আমাকে ছাড়েনি। এভাবেই আবার লেখালেখি শুরু করলাম।

প্রশ্ন: আপনার সমসাময়িক কবি বা লেখকগণ কে ছিলেন?

মতেন্দ্র মানখিন: সে সময় আমার সমসাময়িক লেখক ছিলেন খোকন কোড়াইয়া, স্বপন খ্রিষ্টফার পিউরীফিকেশন (প্রয়াত), বেনেডিক্ট আলো ডি’ রোজারিও ও মার্শেল গমেজ প্রমুখ।

প্রশ্ন: আপনাদের সময় থেকে বর্তমান সময়ের সাহিত্যের ধারায় কি ধরণের পাথর্ক্য বা পরিবর্তন দেখতে পান…

মতেন্দ্র মানখিন: অনেক পাথর্ক্যই চোখে পড়ে। প্রথম দিকের লেখাগুলো খুব বেশি মানসম্মত ছিল না। কিন্তু মনের আনন্দে লিখতাম। লেখার কিছু কিছু ভাবধারা ঠিক ছিল বলেই সম্পাদকগণ প্রকাশ করতেন। তবে এখনকার কবিতায় অনেক পরিবর্তন। এখনকার ভাবধারা ও কবিতার চিত্রকল্পে অনেক পরিবর্তন এসেছে। দেশের প্রথম সারির কবিরাও স্বীকার করেন সেই সময়ের অর্থাৎ স্বাধীনতা উত্তর ও পরবর্তী লেখার ভাষা, ভাব আর ছন্দের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন কবিতার যে চিত্রকল্প তা খুবই জীবন ঘনিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মত। মানুষের মন-প্রাণ ছুঁয়ে যায়।

প্রশ্ন: নতুনদের কবিতা পড়েন?

মতেন্দ্র মানখিন: নতুন-পুরনো সবার কবিতায় পড়ি। নতুনদের কবিতা পড়ে শিহরিত হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই ভাল লিখছে। তবে লেখালেখি সত্যিকার অর্থে লেগে থাকা ও দীর্ঘ সাধনার কাজ। অনেক মৌসুমি কবিও আছেন। কোন অনুষ্ঠান কিংবা দিবস ব্যতিরেকে সারা বছর তাদের উপস্থিতি খুব একটা চোখে পড়েনা।

প্রশ্ন: নতুনদের মধ্যে কার কবিতা ভাল লাগে?

মতেন্দ্র মানখিন: নতুনদের কথা বলতে হলে হিমেল রিছিল, টগর দ্র, লুই চিরান, লেবিসন স্কু ও শাওন রিছিলের কথা বলতে পারি। তাদের কবিতা ভাল লাগে। তারা যদি নিয়মিত লিখে যেত তবে জাতীয় পর্যায়েও লিখতে পারতো। তাদের মধ্যে আগামীর সম্ভাবনা দেখি। নিয়মিত লিখে গেলে ভাল করবে।
প্রশ্ন: নতুনদের কবিতায় কোন দিকটি ফুঁটে ওঠে?

মতেন্দ্র মানখিন: নতুনদের লেখায় মান্দি সমাজের চিত্র, দু:খ-কষ্ট উঠে আসে। কখনো প্রেম, দ্রোহ কখনোবা প্রতিবাদ বাস্তব হয়ে ধরা দেয়।

প্রশ্ন: মধুপুর কিংবা সমতলের সমস্যাগুলো তাদের লেখায় কতটুকু উঠে আসছে? রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে কি সেগুলো পৌঁছাছে?

মতেন্দ্র মানখিন: অবশ্যই, বিশেষ বিশেষ দিবসে (আদিবাসী দিবস, ওয়ানগালা) রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারনী ও বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ স্মরণিকায় বাণী এবং আতিথেয়তা গ্রহণ করে থাকেন। নতুনরা আদিবাসী ভাবধারা নিয়ে আদিবাসী স্বীকৃতি, শোষণ ও বঞ্চনার জীবনধারা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। হারানোর বেদনা নিয়ে রাষ্ট্রের শীর্ষমহলের দৃষ্টি কামনায় তাদের কলম অব্যাহত রয়েছে।

প্রশ্ন: সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রেই আপনার সমান ও অবাধ বিচরণ, এটি কিভাবে সম্ভব হল?

মতেন্দ্র মানখিন: সংস্কৃতির দৈন্যতা থেকেই গান লেখা ও সুর করা শুরু করি। একসময় দেখলাম আমাদের কোন সঙ্গীত নেই। যে সমাজে সঙ্গীত নেই, কবিতা ও সাহিত্য নেই সেই সমাজ তো মৃতের মতোই। সেই চিন্তা ও দায়বদ্ধতা থেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার লক্ষে গান রচনা করেছি। সমাজের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, জাতীয়তা ও মূল্যবোধগুলো কবিতা, প্রবন্ধ ও গানের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত সালগিত্তালেও আপনার গান প্রচারিত হয়েছে…

মতেন্দ্র মানখিন: আসলে একধরণের দৈন্যতার ভেতর দিয়ে সালগিত্তালের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মাইকেল মৃত্যুঞ্জয় রেমা খুব কষ্ট করে বিভিন্ন জায়গা থেকে গান সংগ্রহ করে সালগিত্তালে প্রচার করতেন। বলতে গেলে জোড়াতালি দিয়ে শুরু করেছেন। ভাল গান লেখার কেউ ছিলনা। তখন অনুভব করলাম; আমাদের গান দরকার এবং দেশাত্ববোধক ও জাগরণের গান। এরপর ১৯৭৭-১৯৭৮ থেকে গারো গান লেখা শুরু করি।

প্রশ্ন: আপনার লেখা কোন গানটি বেশি সমাদৃত এবং মানুষের মুখে মুখে ফেরে?

মতেন্দ্র মানখিন: বাঙা.আ জাবিছিম দুকনি সাগাল বালজ্রয়ে (হাজার পাহাড় আর দু:খ নদী পেরিয়ে) গানটি। গানটিতে সুর দিয়েছেন আরেক স্বনামধন্য গীতিকার ও সুরকার ফরিদ জাম্বিল। এরপর থেকে গানটি মানুষের মুখে মুখে এবং আজও সমান জনপ্রিয়। গানটি আজও সর্বত্র সমান মর্যাদায় গাওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন: এই গানটি আপনার অমর সৃষ্টি এবং বলা হয় গানটি গারোদের জাতীয় সঙ্গীত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রয়াত সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এবং গারোদের অবিসংবাদিত নেতা এড. প্রমোদ মানকিন সাহেব গানটি খুব পছন্দ করতেন।

মতেন্দ্র মানখিন: হ্যাঁ, এড. প্রমোদ মানকিন ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের প্রোগ্রামের শুরুতে এই গানটি জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাইতেন। আমার জন্য এটি বিশাল সম্মানের এবং দারুণভাবে উজ্জ্বীবিত হয়ে পরবর্তীতে আরও গান রচনা করি। ধর্মীয় গানও আছে যেগুলো গীতাবলি এবং গারোদের ধর্মীয় গানের বই আচিক বিবালে স্থান পেয়েছে। গারো ভাষায় আরও কিছু গান বই আকারে প্রকাশের অপেক্ষায় আছে।

প্রশ্ন: কতটি গান রচনা করেছেন, মনে আছে?

মতেন্দ্র মানখিন: গারো ও বাংলা মিলিয়ে একশ’র মত গান লিখেছি। সর্বশেষ প্রমোদ মানকিন কে নিয়ে লেখা গানটি ইতিমধ্যে ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে।

প্রশ্ন: লেখালেখির জন্যে অসংখ্য পুরস্কার আপনার ঝুলিতে জমা হয়েছে, যদি সে সম্পর্কে একটু বলেন।

মতেন্দ্র মানখিন: লেখার জন্যে ১৯৭৭ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত অনল সাহিত্য পুরস্কার পায়। পরবর্তীতে বান্দরবন সমুজ্জ্বল সুবাতাস সাহিত্য পুরস্কার, ময়মনসিংহ শিল্পকলা সাহিত্য পুরস্কার, ভালুকা পাড়া ধর্মপল্লীর ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্মাননা পুরস্কার, রাণীখং ধর্মপল্লীর ১০০ বছর জুবিলী উপলক্ষে সম্মাননা পুরস্কার, কারিতাস সম্মাননা পুরস্কার, দূর্গাপুর সাহিত্য সম্মাননা পুরস্কার, টিডব্লিউএ (ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন) সখিপুর থানা শাখা সম্মাননা পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। একেকটি পুরস্কার আমার জন্যে শুধুই সম্মাননা নয়, দায়িত্বও বটে। আর সেই জায়াগ থেকেই লিখে যেতে চাই। মানুষের কথা জানাতে চায়।

প্রশ্ন: পরিবার সম্পর্কে যদি একটু বলেন?

মতেন্দ্র মানখিন: পরিবারে আমার সহধর্মিনী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে আছে। সম্প্রতি আমি দাদু হয়েছি (হাসি)! বড় ছেলে পুত্র সন্তানের বাবা হয়েছে।

প্রশ্ন: ২০০৮ সালে কবি নুরুল হুদাসহ বেশ ক’জন কবি আপনার গ্রামের বাড়ি ছায়াকাননে গিয়ে আপনাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছিলেন, সেই গল্পটা একটু বলুন..

মতেন্দ্র মানখিন: ২০০৮ সালে কবি নুরুল হুদাসহ বেশ কজন কবি আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ পাথরচাঁপা ফুলের প্রকাশনা উৎসবে যোগ দিতে ছায়াকাননে গিয়েছিলেন। এটা নিয়ে অনেকে হাসাহাসি হয়েছে। অনেকেই বলেছে, মানুষ রাজধানী ঢাকা কিংবা জেলা ও উপজেলা শহরে কবিতা উৎসব করে। উত্তরে তাদের বলেছি, আমার সুবিধার্থে আমি এটা করেছি। যারা কোনদিন প্রকাশনা উৎসব দেখেনি তাদের জন্যে এটা করেছি। কাজটি সমালোচিত হলেও পরবর্তীতে অনেককেই উদ্ধুদ্ধ করেছে।

প্রশ্ন: বাড়ির নাম ছায়াকানন কেন?

মতেন্দ্র মানখিন: পাহাড় ও নদীর কোলে আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। চারিদিকে সবুজ আর বিস্তীর্ণ মাঠ, মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য মন ভাল করে দেয়, মনকে সতেজ ও সজীব করে। ছায়া সুনিবিড়, স্নিগ্ধ ও শান্তির পরশ মেলে। মনে হয় দেশটা কত অপরূপ আর মনোমুগ্ধকর! তাই নাম দিয়েছি ছায়াকানন।

প্রশ্ন: এ পর্যন্ত আপনার কয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে?

মতেন্দ্র মানখিন: এ পর্যন্ত পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ ও একটি প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং ‘গারোদের লুকায়িত জীবনধারা’ নামে আরেকটি প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায়।

প্রশ্ন: জাতীয় দৈনিকে আপনাদের সরব উপস্থিতি খুব একটা চোখে পড়েনা।

মতেন্দ্র মানখিন: শুধু আমাদের না, সবার ক্ষেত্রেই এটা হচ্ছে। বাঙালি কবিরাও বলেন অপরিচিত ও নতুনদের লেখা জাতীয় দৈনিকগুলো সচরাচর ছাপাতে চাই না। তবে, বাংলাদেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পত্রিকা উত্তরাধিকার এবং কালি ও কলমে লেখা ছাপা হচ্ছে। অনেকের লেখায় জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে তবে আরও দরকার এটা ঠিক।

প্রশ্ন: অমর একুশের বইমেলা আপনাদের মেলা কি বলবেন?

মতেন্দ্র মানখিন: অমর একুশের বইমেলা শুধু আমাদের মেলা না, এটি কবি-লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদেরও মেলা। কথা হয়, ভাব-বিনিময় হয়, বই প্রকাশ করে আনন্দ পায়। অন্যরকম একটা ভাল লাগা কাজ করে। সবার উপস্থিতি একটা মিলনমেলায় রূপ নেয়, নতুন এক মাত্রা যোগ হয়।

প্রশ্ন: পাঠকই বই-এর প্রাণ। অমর একুশে বইমেলা ছাড়া সারা বছর বইপ্রেমীদের কেমন সাড়া পান?

মতেন্দ্র মানখিন: খুবই চমৎকার সাড়া পাওয়া পায়। আর ভাল বইয়ের পাঠক তো অনেক। বই নিয়ে পাঠকদের অনেক আগ্রহ ও কৌতুহল। কবিতা উৎসবে বাংলা ভাষাষাষি কবিতার সাথে অন্য ভাষাভাষি কবিতা শিরোনামে গারো, হাজং, চাকমা, মারমা, রাখাইন ও অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের কবি, লেখকদের জন্যে আলাদা সময় বরাদ্দ থাকে। সেটা আমরাই পরিচালনা করি, আমাদের মধ্য থেকেই সভাপতিত্ব করে এবং এবছর আমি সভাপতিত্ব করেছি। এটা খুব চমৎকার একটা অনুষ্ঠান যেখানে বাংলা ভাষাভাষি কবিদের সাথে আমাদের চিন্তাধারা ও সাহিত্য মেলে ধরার সুযোগ আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুস সামাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় স্বতন্ত্র কবিতা উৎসব করার সুযোগ হয়েছে।

প্রশ্ন: এটা নিয়ে কতবার বইমেলায় আসা হল?

মতেন্দ্র মানখিন: আমি ২০০৭ সাল থেকে বইমেলায় আসি। এটা নিয়ে বইমেলায় আসা-যাওয়ার এগারো বছর পূর্ণ হল। প্রতিবছরই অমর একুশে বইমেলার অপেক্ষায় থাকি। যতদিন বেঁচে আছি, দেহে বল আছে বইমেলায় আসবো।

প্রশ্ন: আদিবাসী কবি-লেখকদের সাথে বাঙালি কবি, লেখকদের মধ্যকার পাষ্পরিক বন্ধন কেমন?

মতেন্দ্র মানখিন: তাঁদের সাথে পারষ্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর ও আন্তরিক। তাঁরা আমাদের যথেষ্ট শ্রদ্ধা ও সম্মান করে এবং লেখাগুলো পড়ে মূল্যায়ন করে। তাঁরা বলেন, আপনাদের লেখাগুলো ভাল। অনেকেই এগিয়ে এসে হাত মেলান এবং কুশলবিনিময় করেন। তাঁদের এই সম্মান নতুন প্রাণের সঞ্চার করে, আশা ও উৎসাহ জাগায়। বিভিন্ন জেলা থেকে কবিরা এসেছিলেন, অনেকেই আমার নামটা চেনেন।

প্রশ্ন: গারো কবিদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মাননা প্রাপ্ত কবি আপনি, কেমন লাগছে?

মতেন্দ্র মানখিন: এ পর্যন্ত লেখার জন্যে বারটি সম্মাননা পেয়েছি। ভীষণ অনুপ্রাণিত হয় তবে পুরস্কারের জন্যে আমি লিখিনা। আমার লেখা যদি মানুষকে জাগ্রত করে, উপকারে আসে, সমাধানের রাস্তা দেখিয়ে দেয় তাতেই আমার তৃপ্তি।

প্রশ্ন: আদিবাসী সমস্যা নিরসনে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের মনোযোগ আকষর্ণে লেখালেখি কি ধরণের ভূমিকা পালন করতে পারে।

মতেন্দ্র মানখিন: কবি-লেখকদের কাজ বা ধর্মই হল লিখে যাওয়া। কে পড়বে, পড়বেনা সেটা নিয়ে লেখকরা কখনো ভাবেন না। পাখিদের গান কেউ শুনুক বা না শুনুক তাদের স্বভাবসূলভ গান তারা গেয়ে যায়। আমরা সর্বসাধারণের জন্যে লিখি এবং এই সর্বসাধারণের মধ্যে সরকার-জনগণ সবাই আছেন। তবে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে তো লেখা হই-ই।

প্রশ্ন: গারো কবি, সাহিত্যিকদের একটা সংগঠন আছে, সংগঠনটি এখন কি অবস্থায় আছে?

মতেন্দ্র মানখিন: ওটা অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাবনা দিয়েছি ঢাকায় যারা অবস্থান করছে তাদের নিয়ে নতুন একটি সংগঠন করতে এবং বছরে একবার কবিতা উৎসবের আয়োজন করতে। এতে নতুনদের আগ্রহ ও উদ্দীপনা যেমন বাড়বে তেমনি অন্যান্যদের কাছে আমাদের সাহিত্য কর্মের উন্মেষ ঘটবে।

প্রশ্ন: আমাদের সবচেয়ে বড় দৈন্যতা কী?

মতেন্দ্র মানখিন: সবচেয়ে বড় দৈন্যতা হল আমাদের মধ্যে প্রকাশক নেই, প্রকাশনা সংস্থা নেই। প্রকাশনার ক্ষেত্রে আমাদের অন্যের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যদি নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা থাকতো তাহলে আমাদের আরও বই বের হতো। তবুও কোন না কোন ভাবে প্রতিবছর নতুন বই বের হচ্ছে। আমরা থেমে নেই, এগিয়ে যাচ্ছি।

প্রশ্ন: কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, গান কোনটাতে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করেন?

মতেন্দ্র মানখিন: আমি কবিতা লেখায় বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করি। কারণ কবিতা এমন একটা নান্দনিক শিল্প যা মানুষকে আকর্ষণ করে এবং প্রভাব বিস্তার করতে পারে। প্রবন্ধও তাই কারণ প্রবন্ধের মাধ্যমে খুঁটিনাটি বিষয় বিশদভাবে তুলে ধরা যায়।

প্রশ্ন: অনেক তো হল আর কতদিন লিখবেন?

মতেন্দ্র মানখিন: যতদিন জীবন থাকে, যতদিন বাঁচি ততদিন লিখে যেতে চায়, লেখা থামবেনা।

প্রশ্ন: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ….

মতেন্দ্র মানখিন: আপনাকেও ধন্যবাদ।