বিদেশ অভিজ্ঞতা

ওসমান্ড রড্রিগ্স্:

আগেই বলি আমার বিদেশ অভিজ্ঞতা খুবই কম। কাতারের অভিজ্ঞতা আগেই প্রতিবেশীতে ছাপা হয়েছিল এবং   সে সময়ে বলেছিলাম সময় পেলে সিঙ্গাপুর ও হংকংএর অভিজ্ঞতার কথা সময় পেলে লিখব। আফসোস্ তেমন অর্গানাইজেশনে চাকুরী করি না, যেখান থেকে বছর বছর নানা সেমিনারে গিয়ে বিদেশ ভ্রমন করার সুযোগও আছে। আমাকে ব্যাক্তিগত ভাবেই ক’এক দেশ ভ্রমন করতে হয়েছিল। আজ ২৪ বছর পূর্বের সিঙ্গপুরের আমার অভিজ্ঞতার কথা অতিব সক্ষিপ্তভাবে লিখছি।

আমরা অষ্ট্রেলিয়া, এ্যমেরিকা বা কানাডা থেকে আসা লোকদের থেকে সে দেশের সরকারী আইন বা চাকুরীর অবস্থা বা থাকা/খাবার টুকরো টুকরো অনেক কিছুই শুনি। তবে তাতে অনেক কিছুই অজানা থেকে যায়। বর্তমান সিঙ্গাপুর আমার দেখা ২৪ বছর পূর্বের  তুলনায় অনেক অনেক আধুনিক। তবে আমরা ওদের সেই ২৪ বছর পূর্বের অবস্থায়ইবা কখন যেতে পারব তাই প্রশ্ন। সিঙ্গাপুর মানে সিংহপুর। নামানুসারে সিটি সেন্টারে সিংহের মূর্তী আছে। ডি.এইচ.এল কুরিয়ার সার্ভিসের ৬মাসের এয়ার অপরেশনে সিঙ্গাপুর চাঙ্গি এয়ারপোর্টের অফিসে ট্রেনিং অর্থাৎ কাজ করতাম। তিন সিফ্টে আট ঘন্ট করে ডিউটি। সেখানে কেউ আট ঘন্টা ১ মিনিট বা ৭ ঘন্টা ৫৯ মিনিটও কাজ করে না। পাকা আট ঘন্ট ঘড়ি ধরে কাজ করে। তবে এই আট ঘন্টা টানা কাজ। গাফিলতী বা কাজ ফাঁকী বলতে ওরা জানে না। ওরা উন্নত জাতি – তাই ওদের দেশও উন্নত। চুরি কাকে বলে ওরা জানে না। সদালাপি ও পরপোকারী ছাড়া ওদের আর কোনও ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। কাজের সময়ে শুধু কাজ ও আনন্দের সময়ে শুধুই আনন্দ, এটাই ওদের চরিত্র ও বৈশিষ্ট।

ইভ্নীং সিফ্টের ডিউটী শেষে বাসে বসে বাসায় ফিরছিলাম রাত সাড়ে বাড়োটায়। আমার এক মেয়ে কলিগ একটা জায়গায় বাস থেকে প্রতিরাত্রে নেমে ওর বাসায় যায়। যেখানে কোনও মানুষ, দোকান বা বাড়ী ঘর নেই। মেয়েটা গাছে ঘেড়া কিছুটা অন্ধকার গলীর মত জায়গা দিয়ে বেশ দূর ওর ঘরের দিকে হেঁটে যায় প্রতিদিন। ভাবলাম আমাদের দেশে দিনের বেলায়ও একা মেয়েদের কত সন্তরপনে চলতে হয় এবং এরপরও কখনোবা বিপদও ঘটে। বাসায় এসে ক্লান্ত লাগছিল বটে তবে তাৎক্ষনি ঘুমিয়ে পরতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। তাই জানালার ধারে বসে দেশের কথা চিন্তা করতে লাগলাম। দোতালায় থাকতাম এবং বিল্ডিং এর পাসেই বিরাট খোলা জায়গা। সেখানে ক’য়েকটা রাস্তার মোড় চোখে পড়ে। আমার বরাবর একটা রোড সিগনাল এবং লাল বাতী জ্বলাতে একটা গাড়ী এসে থেমে গেল। সিগনাল সবুজ হলেই, গাড়ীটা সজোরে ছেড়ে চলে গ্যাল। আবার হঠাৎই হার্ড ব্রেইকের আওয়াজ পেলাম এবং দেখলাম কিছু দূরেই আরেকটি সিগনালে লাল বাতী জ্বলাতে গাড়ীটা হার্ড ব্রেইক চেপে থেমে গ্যাল। কি আশ্চর্য্য, সেখানে আর কোনও একটা গাড়ী বা ট্রাফিক পুলিশের কোনও রোড ওয়াচিং ক্যামেরাও নেই। সে কতটাই রাস্তার সিগনাল মেনে চলছে একা একা। ভেবে দুঃখ্য হলো আমাদের দেশে দিনের বেলায়ই ট্রাফিক পুলিশের সামনেই কতো আইন ভঙ্গ করে গাড়ী চালায়। তাই কিভাবে ভাব্বো আমরা কখনো ওদের মত হতে পারবো কি পারবো না? আসলে এগুলো মন মানষীকতার ব্যাপার। এগুলো আসল শিক্ষা, চরিত্র ও অভ্যাসের ব্যাপার। আমরা এখনো শুরুই করিনি তো অভ্যাস হবে কিভাবে ? লখো পরাই সব বদ্যি নয়।

 

সিটি হলের ৫৬ তলার এক বিল্ডিং এর ৩৭তালায় এক কাজে আমার কলিগ আমাকে নিয়ে চললো। ৬তলায় গাড়ী পার্ক করলো এবং কাজ সেরে আবার ফিরে আসতে রেভিনিউ স্ট্যাম্পের মত কি যেন ছিড়ে ডাষ্টবিনে ফেললো। জিজ্ঞেস করাতে বললো, সেটা তার গাড়ী পার্কিং চার্জ। কি আর্শ্চয্য সেখানে কোনও সি.সি ক্যামেরা বা তাকে দেখার কোনও লোক নেই। ভেবে আর্শ্চয্য হলাম তার দেশ ও আইনের প্রতি দায়িত্ব ও শ্রদ্ধা দেখে। তাই ভাবি অদৌ আমরা কখনো এমনটি হতে পারবে? বাস ষ্টেশনে টাকা ভাংতীর মেশিন আছে। বাসে কন্ডাক্টর থাকে না এবং বাসে উঠে মেশিনে পয়সা ঢেলে দিলেই টিকেট বেড়িয়ে আসে। এখানেও সততার ব্যাপার আছে। তখনই দেখেছি বাসে ক্রেডিট কার্ডে টিকেট কাটার ব্যাবস্থা। এখন আমার দেখা ২৪ বছর আগের তুলনায় ওরা কতটাই-না উন্নত হয়েছে বা এগিয়ে গেছে। যদিও হতে পারে আর যেতে পারবো না, তবু ওয়েব সাইটে ইউ. টিউবে সবই দেখি ও আনন্দ পাই। সারা বিশ্ব দেখি ও মনে প্রাণে ওদেরই মতো হয়ে উঠি এবং হতেও চাই। জানি না আমাদের দেশের ভবিষ্য কি।

প্রথম দিন ওরা আমাকে নিয়ে সন্ধায় ভাল একটা হোটেলে খাওয়াতে নিয়ে গেল। বাগানে টেবিল চেয়ার লাগানো। অনেক আইটেম দিল খেতে। প্রথমে সুপের মত তবে তাতে শাক ও রসগোল্লা যেন দেয়া আছে। সেই রসগোল্লা মুখে দিয়ে তা আর মুখে রাখতে পারলাম না। বিকট সামুদ্রিক মাছের গন্ধ। আসলে সেটা ছিল ফিস্ বল। সামুদ্রিক মাছকে বল (রসগোল্লার মত) বানিয়ে তা গরম পানিতে আধা সেদ্ধ করে তারপর তাদের সুপ যাতে নানা সস্ মিলিয়ে একটা আইটেম। ওরা চপষ্টিক, চামচ ও কাঁটা চামচ দিয়ে খুবই মজা করে খেতে লাগলো। শেষে শুধু ফ্রাইড চিকেন, সামান্য চিকেন ফ্রাইড রাাইস, ১ পিস্ ফল এবং কাঠাঁলের আইসক্রীম দিয়ে খাওয়া শেষ করলাম। যেহেতু ঐ সমস্ত খাবারে অভ্যস্ত নই এবং খাবারের কোর্স জানতাম না, তাই বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিলাম। ওরা বেশির ভাগ সেদ্ধই খায় এবং মশল্লা খুব কম ব্যাবহার করে। তাই ওদের যেমনি স্বাস্থ্য ভাল এবং তুলনামূলক দীর্ঘ আয়ু পায়। আমাদের দেশের চাইনীজ খাবার ভিন্ন ভাবে এবং ভিন্ন স্বাদে রান্না করা হয়।

ভোর ছ’টায় মা/বাবা ঘুম থেকে ওঠে এবং বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতী নেয়। ৭ টায় স্কুল বাস এসে হাজির। মা/বাবাও কিছুক্ষনের মধ্যেই অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। বাচ্চার টিফিন, লেখাপড়া, খাবার, মল/মুত্র ত্যাগ, স্নান/গোসল সবই স্কুলে। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বাবা/মা এসে হাজির বাসায় এবং প্রায় একই সময়ে স্কুল বাস বাচ্চাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যায়। এবার সমাই মিলে বেড়ীয়ে যায় হাটতে হালকা খাবার, চা/কফি খেতে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন প্রায় মানুষ বিহীন চওড়া ফুটপাত। চারিদিক নানা গাছে বাগানের মত। গাছের ফাঁকে রঙ্গিন বাতি দেখে মনে হয় সাঁজিয়ে রেখেছে। বাড়ীর নিচে বা পাশেই নানা রেষ্টুরেন্ট আছে। ওরা বেশীর ভাগ রেষ্টুরেন্টে খাবার খায়। সেদ্ধ ও তাজা খাবার। চাইলে নানা মশল্লা দিয়ে সাথে সাথেই রান্না করে দেবে। ইতিমধ্যে আপনি কোক/বিয়ার পান করা সহ টেলিভিশন দেখে সময় পার করতে পারেন। হোটেলেই নানা রাইডস্ আছে, ইতিমধ্যে বাচ্চা তাতে গিয়ে খেলতে থাকবে। খাবার দাবার শেষে ঘরে ফিরে গান শোনা বা টি.ভি. দেখা এবং তারাতারি শুয়ে পরা। বেশীর ভাগ এই হলো সাধারণ সিঙ্গাপুরিয়ান লাইফ স্টাইল। ওদের পরের র্চ্চার সময় নেই এবং প্রয়োজনও পরে না। প্রতিবেশীদের সাথেও বেশী মেসে না। সবাই নিজেদের ফ্যামিলি বা ইন্ডিপেডেন্ট থাকতে পছন্দ করে। যুবক যুবতীরা সন্ধায় খোলা জায়গায় বা রেষ্টুরেন্টে বসে চুটিয়ে আড্ডা দেয়। তবে আমাদের মত ঘন্টার পর ঘন্টা নয়। বাসে ট্রেনেই প্রেমিক প্রেমিকেরা আলিঙ্গন করে সবার সামনেই। ওদের মনে কোনও কুটিলতা নেই, নেই হিংসা। ন¤্রতামি বা ভদ্রতামিই পরিলক্ষিত হয়।

 

দেখার মত সম্পূর্ণ দেশটাই তবে র‌্যাফলেস সিটি, সিটি সেন্টার বা জু দেখার মত।  ফেরি বা ক্যাবল কারে নদী পেরিয়ে মনমুগ্ধকর স্যান্টোসা আইল্যন্ড। যা না দেখলে সিঙ্গাপুর দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সস্তা এবং আরাম দায়ক যাতায়াত হলো এম.আর. টি. (ট্রেন) কখনো মাটির নিচ দিয়ে অবার কখনো মাটির উপর উঠে তা ৫ তলা উঁচু বিল্ডিং পাস দিয়ে চলে। লম্বায় ২২ মাইল এবৎ প্রস্থে ১৮ মাইলের এই দ্বীপ  দেশটি সম্পূর্ণই একটি ট্যুরিজম স্পট। লোক সংখ্যা খুবই কম। অচল ছাড়া কেউ বসে খায় না। কাজ কর্মের বেশীর ভাগ ম্যাকানাইজ করে নিয়েছে। অর্থাৎ গায়ে খাটুনীর কাজ বলতে গেলে নেই। ওরা সৎ, কঠোর কর্ত্যব্য পরায়ণ ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জাতী। ওদের কোনও খনিজ নেই, নেই মিঠা পানি। পার্শ¦বর্তী দেশ মালয়েশীয়া থেকে পাইপ দিয়ে পানি এনে ব্যবহার করে। নেই উর্বর জমি এবং নেই কোনও বন সম্পদ। ৯ই অগাষ্ট, ১৯৬৫ সনে মালয়েশীয়ার থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং কঠোর পরিশ্রম, সততা, দেশ প্রেম ইত্যাদি কারণেই ক’য়েক বছর আগেই বিশ্বর সবচে ধনী দেশে পরিণত হয়। আমরা বৃটিশ থেকে ১৯৪৭ এবং পাকিস্তান থেকে ১৯৭১ সনে স্বাধীনতা লাভ করি। আমাদের তো সবই আছে, তবে কেন এখনো গরীবের তালিকায়। কেন না আমরা অসৎ, ক্ষমতালোভী ও সঠিক দেশপ্রেমি নই। আমরা ত্যাগী নই এবং চুরি, মিথ্যই আমাদের মূল আরাধনা এবং শুধুই স্বার্থবাদী। দশেকে কহে ভাল বাসে না এবং আইনকে কহে শ্রদ্ধা করে না। এসমস্ত কারনেই আমরা সর্বদাই পিছিয়ে। আরো অনেক কিছু লিখার ছিল, লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে, তাই আর লিখলাম না।

আমরা বিদেশ ফেরৎ লোকদের থেকে ওদের নানা উন্নত অবস্থার কথা, ওদের উন্নতীর কথা শুনি আর বলি, কবে আমাদের দেশটা ওদের মত হবে। আসলে দেশ নয়, প্রথমে চিন্তা করতে হবে, আমি মন মানষীকতায় কবে ওদের মত উন্নত হবো।