কিংবদন্তী ফুটবল শিল্পে নৈপুণের মারী

এলড্রিক বিশ্বাস:

বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই চিনেনা ফুটবলার মারীকে। মানুষ মাঠে তাকিয়ে থাকতে তাঁর ছন্দময় ফুটবল উপভোগ করার জন্য। চারযুগ আগে মারী ফুটবল থেকে বিদায় নিলেও ফুটবল প্রতিভা এবং সৃষ্টিশীল ফুটবল নৈপুণের কথা উঠলেই যে নামটি প্রথমেই বার বার উচ্চারিত হয়েছে তিনি কিংবদন্তী ফুটবলার মারী। একজন ফুটবলারের জীবনে এর চেয়ে বড় স্বার্থকতা আর কি হতে পারে! তিনি দীর্ঘ সময় পায়ের নিখুত কারুকার্যের মাধ্যমে ফুটবল পিপাসুদের সম্মোহিত করে রেখেছিলেন।

ফুটবলার চিং হ্লা মং মারী চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দের ২৩ মে মার্চ পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির চন্দ্রঘোনায়। চন্দ্রঘোনা মিশন হাসপাতাল, চার্চ, মাঠ পাহাড়-নদী গাছ গাছালী, পাখ-পাখালরি মনোরম সৌন্দর্যের  দৃশ্যপটে ঘেরা  চন্দ্রঘোনা। চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই যেতে পথে পড়ে লিচুবাগান বাস স্ট্যান্ড, চন্দ্রঘোনা। চন্দ্রঘোনায় আছে এশিয়ার বৃহত্তম কাগজের কল চন্দ্রঘোনা পেপার মিল। মারীর বাবা মি: থয়সাউ চৌধুরী ছিলেন বোমাং রাজ পরিবারের সন্তান। খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করার জন্য মারীর বাবাকে রাজ পরিবার থেকে বের করে দেয়া হয়। ৩ ভাই ১ বোনের সংসারে মারী ছিলেন সবার ছোট। মারীর খেলোয়ারী জীবন শুরু চন্দ্রঘোনা মিশন হাসপাতালের ছোট্ট মাঠে। তিনি খেলতেন ভলিবল, ব্যাটমিন্টন, এথলেটিক্স ও ফুটবল। মা মিসেস অচ্চা চৌধুরীর উৎসাহেই দূর্দান্ত ফুটবলার হিসেবে মারীর আতœপ্রকাশ।

১৯৫১ খ্রীষ্টাব্দে মারী চট্টগ্রাম লীগে প্রথম খেলেন ফিরিঙ্গী বাজারের হয়ে। ১৯৫২ তে খেলেন চট্টগ্রাম পোটর্  ট্রাস্টে। তখন ব্যাপকভাবে তার নাম ভাল ফুটবলার হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময়ের সেরা ফরোয়ার্ড মারী খেলেন পূর্ব পাকিস্তানের রেলওয়েতে। তিনি ছিলেন ফুটবলে বাঁ পায়ের শিল্পী।  তিনি খেলেছেন ওয়ান্ডার্সে, আজাদ স্পোটিং, ঢাকা মোহামোডেন স্পোটিং ও আইপিআইডিসির হয়ে। অনেক তাঁর চেয়ে চট্টগ্রামের রেল দলের ম্যাকওয়াকে সেরা পেন্ট-মেকার হিসেবে বললেও পেন্ট-মেকার ও গোল স্কোরার হিসেবে মারীকে সবার ওপরে স্থান করে দেবে বলে ফুটবল বোদ্ধাদের  দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। মারীর শিল্পময় ফুটবল দর্শকদের ইন্দ্রীয় সুখ মেটাতো। সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে তার সাবলীল ড্রিবলিং-এর একটা অভিন্ন মিল খুঁজে পাওয়া যেত। মূলত এক পা অর্থাৎ বাঁ পায়ের খেলোয়াড় হলেও শক্তি ও দুরূহ প্রতিপক্ষের তাকে আটকাতে যেভাবে বেসামাল হতে হয়েছে- তা দর্শকদের চমৎকৃত না করে পারেনি।

ফুটবলার মুহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন – ১৯৫১ সালে মারী যখন ইবি রেলওয়ের (পরে পিই রেলওয়ে) ঢাকা লিগে প্রথম খেলতে আসেন, আমি তখন ঢাকা মাঠের এগারো বছরের এক কিশোর দর্শক। তাকে শেষ লিগ খেলতে দেখি ১৯৭০ সালে। তখন প্রতিষ্ঠিত ক্রীড়া সাংবাদিক। এর মাঝে আমার পরম সৌভাগ্য যে, ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ সালে মারীর (দা) দূরন্ত    ও প্রবল শক্তিশালী জগন্নাথ কলেজ ফুটবল টিমে তার সাথে খেলার সুযোগ পাওয়া আমার খেলোয়াড়ী জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি।

পরে ১৯৬২ ও ১৯৬৩ সালে মারীর সাথে আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলা আমার নশ্বর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। ১৯৬৩ সালে ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে মওসুমের প্রথম দু’মাস সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে এগিয়ে থাকার পেছনে মারীর অবদান ছিল মুখ্য। সেন্টার ফরোয়ার্ড ছিলেন শাহজাহান (খুলনা/কাস্টমস), মুক্তা, মারী ও আবু তাহের (বাটু বা পুতু)। ইপিজি প্রেসের বিরুদ্ধে পরপর দুটি গোল করে পরে দুটি গোলের সহজ সুযোগ নষ্ট করায় আমার হ্যাট্রিট্রিক পূরণের আশা প্রায় উবে যায়। আমি হ্যাট্রিক পূরণে ব্যর্থ হয়ে যখন নিরাশ হয়ে পড়ি, ঠিক তখনই মারীদা প্রতিপক্ষের তিন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে ফাঁকা পোষ্টে নিজে গোল না করে বল ঠেলে দিয়ে আমার হ্যাট্রিক পূর্ণ করেছিল। সেটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম উজ্বল মূহুর্ত।

তিনি আরো বলেন – মারীর খেলার যাদুকরী মাধুর্য মাঠের দর্শকদের দারুণ মোহাবিষ্ট করে রাখতো। শুধু তা নামেই দর্শকসমাগম হতো বেশি। ভদ্র, মার্জিত, পরিচ্ছন্ন খেলা ছাড়াও মারীর খেলার যাদুকরী নৈপুণ্য যারা না দেখেছেন, তাদের পক্ষে তা ধারণা করা কঠিন। একবার হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসার জন্য আড়াই লাখ টাকার বিল দিতে না পারায় তাঁকে হাসপাতালে আটকে রাখা হয় কিন্তু হৃদয়বান রিয়াজউদ্দিন আল মামুন নামের একজন ফুটবলার মারী’র বিল পরিশোধ করে দেয়ার ঘটনা আমার কাছে রূপকথার মত মনে হয়। হলি ফ্যামিলিতে ভর্তির ঠিক অব্যাহতিপূর্বে ক্রীড়ালেখক সমিতি মারীর চিকিৎসার্থে এক লাখ টাকা সাহায্য ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। রিয়াজউদ্দিন আল মামুন ও ক্রীড়ালেখক সমিতি এজন্য সবার সাধুবাদ পাওয়ার দাবীদার।

১৯৫৭ সালে ঢাকায় যখন পাকিস্তান ফুটবলের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হয়, তাতে তার টিম পূর্ব পাকিস্তান হোয়াইট ফাইনালে ১-২ গোলে হেরে রানার্সআপ হলেও মারী ছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা ও সবচেয়ে আলোচিত খেলোয়ার। ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ সালে জগন্নাথ কলেজের হয়ে খেলার সময় কলেজ স্যার এএফ রহমান শিল্ড ও গভর্নরস কাপ জেতার গৌরব পায়। আমি ও জাকারিয়া পিন্টু সে দলের সদস্য ছিলাম।

১৯৫৮ খ্রীষ্টাব্দে এশিয়াডে মারী পায়ে ব্যথা পেয়েছিলেন, আর এই ব্যথাই তাঁকে শেষ পর্যন্ত জাতীয় দল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। তবে লীগে ও অন্যান্য ঘরোয়া খেলায় তিনি নয়ন জুড়ানো ফুটবল খেলেছেন ১৯৬৯ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত।

বাঁ পা বা শরীরের যে কোন অংশ দিয়ে চুম্বকের মত বল রিসিভ থেকে শুরু করে সমুদ্রের ঢেউ-এর মত স্বচ্ছ-সাবলীল ও মনকাড়া ড্রিবলিং বা সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা সহযোগীর কাছে বল ঠেলে দিয়ে ক্ষুধার আক্রমণ রচনার কুশলতা মারীকে তার সময়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফুটবলারের মর্যাদা দিয়েছে। এ গুণগুলো অর্জন করতে মারীকে কত অসংখ্য প্রহর ক্লান্তিহীন পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠা ব্যয় করতে হয়েছে- তার তুলনা মেলা ভার। শুধু অগণিত দর্শক নয়, সুদক্ষ ফুটবলারদের কাছে মারী ছিলেন স্বপ্নের এক খেলোয়াড়। দেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিলেও ‘স্বাধীনতা পদক’ তাঁর ভাগ্যে জোটেটি। সাদামাটা এক জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার নিয়ে তাঁকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।

১৯৫২ সালে মারী চট্টগ্রাম লীগে প্রথম খেলেন ফিরিঙ্গি বাজারের হয়ে। তখন তিনি স্কুলের ছাত্র। তাঁর খেলা দেখে তাঁকে বরিশাল দল নিয়ে আসে ‘রোনাল্ড লীগ’ খেলতে। পরের বছর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল স্কুলের পক্ষে লীগ খেলেন এবং পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের হয়ে ঢাকায় রোনাল্ড শীল্ড খেলেন। এরপর মারী আর কখনও পেছনে ফিরে তাকাননি। পাঁচ বছরের মধ্যে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। ফুটবলের সেরা ফরোয়ার্ড। ঢাকার লীগে খেলেছেন ফায়ার সার্ভিস, ওয়াল্ডারার্স, আজাদ স্পোর্টিং, ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং এবং ইপিআইডিসির হয়ে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত। খেলেছেন জাতীয় ফুটবল, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে দাপটের সঙ্গে।

আমি যখন চট্টগ্রামের যতীন্দ্র মোহন সেন ( জেএমসেন ) স্কুলের সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি তখন ফুটবলার মারীর নাম শুনি। চট্টগ্রামের ষ্টেডিয়ামে ম্যাকওয়ার খেলা দেখেছি কিন্তু কিংবদন্তী ফুটবলার মারীর খেলা দেখার সুযোগ হয়নি। এরপর সুযোগ হয় ২০০৫ খ্রীষ্টাব্দে যখন সাপ্তাহিক ‘খ্রীষ্টাব্দ’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি তখন ফুটবলার মারীর সাক্ষাৎকার নিই ও তা ছাপা হয় খ্রীষ্টাব্দ পত্রিকায়। তাঁর অনেক ছবি তুলেছিলাম। আমার তোলা ছবি ওনাকে উপহারও দিয়েছিলাম। ফুটবলার মারী তখন হাতে একটি লাঠি নিয়ে চলাফেরা করতেন। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা থেকে ফুটবলার মারীকে দেয়া হয় সম্মাননা। এছাড়া আর্থিক ভাবে সহায়তা করে প্রথম আলো পত্রিকা ও পত্রিকার সম্পাদক জনাব মতিউর রহমান, একথা আমাকে জানান সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় ফুটবলার মারী।

তিনি জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, চীন,  জাপানের টোকিওতে ও ভারতের কোলকাতায় । সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের ফুটবল দলে ত্রয়ী প্লেয়ার হিসেবে যাদের নামডাক ছিল কবির-আশরাফ-মারী।  তখন চায়ের টেবিলে সবাই ফুটবলার মারীর কথাই বলতো। ১৯৬৯ খ্রীষ্টাব্দে ফরোয়ার্ড খেলেই তিনি অবসর নেন। তিনি নিজস্ব গতিতে বল নিয়ে চলে যেতেন প্রতিপক্ষেও সীমানায়। তিনি নিজে গোল করতেন ও সতীথ দের দিয়ে গোল করাতেন। তাঁর বাঁ পায়ের শর্ট ছিল তীব্র গতির। এছাড়া তিনি ছিলেন একজন ভাল এথ্লেট। তিনি ১০০ ও ২০০ মিটার দৌঁড়ে সোনা জিতেছিলেন।

মারী প্রথম পাকিস্তান জাতীয় দলের হয়ে বিদেশে যেয়ে খেলেছেন শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং এবং চীনে। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন দেশের জাতীয় ফুটবলে পূর্ব   পাকিস্তান থেকে দুটি দল অংশগ্রহণ করে।

গত ৯ ই মে, ২০১২ খ্রীষ্টাব্দ ভোরে হলি ফেমেলি হাসপাতালে কিংবদন্তী ফুটবলার চিং হ্লা মাং মারী চৌধুরী ৭৩ বৎসর বয়সে এ মর্তের মায়া ত্যাগ করেন। ঐ দিন রাত ৮ টায় তাঁর মরদেহ মগবাজার এজি চার্চে আনা হয়। চার্চে প্রার্থনা অনুষ্ঠানের পর তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান আত্মীয় স্বজন ও গুণগ্রাহীবৃন্দ। সমবায়ী নেতা মি: মিলন আই গমেজ, ফুটবল কোচ   মি: উইলিয়াম রোজারিও, মি: জেমস দীপক কস্তা। ।

ফুটবলার মারী স্ত্রী মিসেস ইন্দুলেখা চৌধুরী ও তিন পুত্র সুমন চৌধুরী, ববী মারী ও আইজ্যাক মারীকে রেখে গেছেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মুক্তিযোদ্ধা ফুটবলার চিং হ্লামাং মারী চৌধুরীকে ১০ ই জুন, ২০১২ খ্রীষ্টাব্দে সমাহিত করা হয়েছে তাঁর নিজ জন্মস্থান চন্দ্রঘোনায়। পিতা ঈশ্বর সৃষ্টিকর্তা তাঁর সন্তান মারীকে চিরশান্তি দান করুন। #

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার :

# জাতীয় ক্রীড়া পাক্ষিক – ক্রীড়া জগৎ, সংখ্যা ২১, ১৬ মে, ২০১২ খ্রী:

# দৈনিক জনকন্ঠ, ১৬ মে, ২০১২ খ্রী:

# দৈনিক সকালের খবর, ১০ মে,২০১২ খ্রী: