মা

খোকন কোড়ায়া

নবজীবন হাসপাতালের একটি কেবিনের অতিরিক্ত বেডে শুয়ে আছি আমি। পাশের বেডে আমার মা। পনের বছর যাবত মা ক্যান্সারে ভুগছে। দূরারোগ্য ব্যাধিটি শিকার হিসাবে বেছে নিয়েছে মার দাঁতের মাড়ি। এই পনের বছরে অনেক চিকিৎসা হয়েছে মার। একাধিকবার সার্জারি, রেডিওথেরাপি আর কেমোথেরাপি হয়েছে। মাঝখানে বেশ কয়েক বছর মা বেশ ভালই ছিলো। বলা যায় স্বাভাবিক জীবন যাপন করেছে। কিন্তু বছর খানেক ধরে অসুখটা খুব বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। চিকিৎসায় কোন কাজ হচ্ছে না। ডাক্তার বলেছেন ক্যান্সারের রুগীদের বেলায় এমন একটা পর্যায় আসে যখন যত ব্যয়বহুল চিকিৎসাই করানো হোকনা কেন কোন ফল পাওয়া যায় না। বুঝতে হয় রুগীর শেষ অবস্থা এখন। আমার মার বর্তমান অবস্থাও সেরকম। সবাই জানি মা বাঁচবেনা। তারপরও মার চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি।
আজ সারাদিন মার কেমোথেরাপী চলেছে। সন্ধার পর কেমোথেরাপী শেষ হলে উচ্চ ভিটামিন সমৃদ্ধ একটি বিশেষ স্যালাইন দেয়া হচ্ছে মাকে। এটা সারারাত চলবে। মা খুবই ক্লান্ত। ক্যানসারের অসহনীয় ব্যথা আর কেমোথেরাপীর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া মাকে খুব দুর্বল করে দিয়েছে। ঘুমও হচ্ছে না মার। দশ পনের মিনিট একটু তন্দ্রার মত হচ্ছে আবার জেগে উঠছে।
আমাদের পরিবারের সদস্যরা সবাই পালা করে হাসপাতালে মার সঙ্গে থাকছি। আজ রাতে আমি আছি। রাত দশটায় মাকে পরিজ খাওয়ানোর পর আমার আর করার কিছু ছিলোনা। রাতে হাসপাতালে আসার সময় নবম শ্রেণীর ছাত্রী আমার বড় মেয়ে আমাকে একটি রহস্য উপন্যাস দিয়ে বলেছিলো , বাবা হাসপাতালে গিয়ে পোড়ো, সময় কাটবে। আধা ঘন্টা হল সেই রহস্য উপন্যাসটি আমি শেষ করেছি। এখন আর সময় কাটছে না। হাতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত তিনটা। আমাদের কেবিনটা নীচতলায়। আর আমার বেডটা জানালার পাশে। জানালাটা এতক্ষন বন্ধ ছিলো। খুলে দিতেই মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে এলো। বাইরে তাকিয়ে দেখি একটি শিউলী ফুলের গাছ। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে ছোট গাছটা। আমাদের গ্রামের বাড়ীতেও একটা শিউলী ফুলের গাছ ছিলো। ছিলো আরও অনেক ফুলের গাছ, ফলের গাছ। সবই মার হাতে লাগানো, মা-ই গাছের পরিচর্যা করতো। গ্রামের কথা মনে হতে মাকে ঘিরে ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি মনের পর্দায় ভেসে বেড়াতে লাগলো।

স্মৃতির ভুবন থেকে কখন যে ঘুমের ভুবনে প্রবেশ করেছি জানিনা। হঠাৎ বেশ জোরে একটা শব্দ এবং তারপরই মার আর্ত চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বাতি জ্বালানো ছিলো। তাকিয়ে দেখি মা খাটে নেই, নীচে পড়ে গোঙ্গাচ্ছে। স্যালাইনের ব্যাগটা খুব জোরে দুলছে। আর মার হাতের ক্যানোলাটা খুলে গিয়ে রক্ত ঝরছে।

হৈ চৈ ডাকাডাকি করে নার্সদের আনা গেলো। একটু পরে ডাক্তার এলেন। মাকে বিছানায় শুইয়ে নতুন করে আবার স্যালাইন দেয়া হল। সবাই মার উপর খুব বিরক্ত হল অযথা একা একা খাট খেকে নামতে গিয়ে ঝামেলা বাঁধানোর জন্য। আমারও রাগ হল মার উপর। সবার সঙ্গে আমিও মাকে মৃদু তিরষ্কার করলাম।

ডাক্তার নার্স সবাই চলে গেলে পরিস্থিতি আবার শান্ত স্বাভাবিক হয়ে এলে হঠাৎ আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগলো- আচ্ছা মা কেন নামতে গিয়েছিলো বিছানা থেকে? মা-তো বেড প্যানেই টয়লেট করে অনেক দিন ধরে। সেরকম হলে মা-তো আমাকে ডাকে। আর আমি বুয়াকে ডেকে আনি। মার বিছানার কাছে গিয়ে মার কপালে হাত রেখে বললাম- আচ্ছা মা বলতো তুমি বিছানা থেকে নামতে গিয়েছিলে কেন?

একটা দীর্ঘশাস ফেলে অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে মা বললো – তুই যখন ঘুমিয়ে পড়লি তোর গায়ে তখন শুধু স্যান্ডো গেন্জী ছিলো। ফ্যানটা ঘুরছিলো ফুল স্পীডে আর জানালা দিয়ে ভোরের ঠান্ডা বাতাস আসছিলো। তুই ঘুমের মধ্যে খুক খুক করে কাশছিলি । তোর তো অল্পতেই ঠান্ডা লেগে যায়। মনে নেই ছোটবেলায় একবার ব্রংকাইটিজে কি রকম ভুগেছিলি তুই। ভাবলাম বুকে ঠান্ডা লেগে যদি আবার সেরকম কিছু হয়ে যায়। এদিকে শেষ রাতে তুই একটু ঘুমিয়েছিস – তোর ঘুম ভাঙ্গাঁতেও ইচ্ছে করছিলো না । তাই আমি খাট থেকে নামতে চেয়েছিলাম তোর গায়ে চাদরটা টেনে দিতে। কিন্তু বাবা আমার মনে ছিলোনা যে আমি অসুস্থ, আমার হাতে স্যালাইন বাধাঁ।

একসঙ্গে এত কথা বলে মা খুব কুব ক্লান্ত হয়ে পড়লো তার রুগ্ন চোখ দু-টিতে টলমল করতে লাগলো অশ্রু। আর ভেজা চোখে অবাক হয়ে আমি তাকিয়ে রইলাম একজন মায়ের দিকে।