মায়ের মতো আপন কেহ নাই

প্রদীপ মার্সেল রোজারিও:

 

‘মা’ ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু এ শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে এ জগতের সমস্ত স্নেহ-মমতা, আবেগ, ভালোবাসা। পৃথিবীতে মায়ের মতো ভালোবাসা আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। মা তার সন্তানকে বুকের ভেতর আগলে রাখে অতি আদরে।  ‘ও মা জননী নাইরে যাহার/ত্রিভুবনে তাহার কেহ নাইরে/মায়ের মতো আপন কেহ নাই’। ’মা কথাটি ছোট্ট অতি/ কিন্তু জেনো ভাই/ তাহার চেয়ে মধুর নাম যে ত্রিভুবনে নাই’। মাকে নিয়ে এমন অনেক গানই আছে। ‘মা’ পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দ। ভালোবাসা আর নিরাপদ আশ্রয়ের শ্রেষ্ঠ জায়গা। মা শ্বাশত, চিরন্তন।

প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে নগর সংস্কৃতি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্ব সর্বত্র মা এক মহিমা, এক আরাধনা। সনাতন ধর্মের পূজা-অর্চনায় মা দখল করে আছেন একটি বিশেষ স্থান। ইসলাম ধর্মে বলা আছে, মায়ের পায়ের তলায় সন্তানের বেহেশত। খ্রিস্ট ধর্মেও মাতৃ-বন্দনার কথা বলা আছে। খ্রিস্টের আগমনের সঙ্গেই তো জড়িয়ে আছে মা মারীয়ার নাম।

মা সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, ’আমি যা হয়েছি বা যা হতে চাই, তা সবটুকুর জন্যই আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী। আমার মায়ের প্রার্থণাগুলো সব সময় আমার সঙ্গে সঙ্গে ছিলো।’ বিখ্যাত ফরাসী ঔপনাসিক বালজাক বলেছেন, ‘মায়ের হৃদয় হচ্ছে এক গভীর আশ্রয়, সেখানে আপনি সহজেই খুঁজে পাবেন মমতার সুশীতল ছায়া।’ জন গে বলেছেন, মা, মা-ই, তার অন্য কোন রূপ নেই।’

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ’মা হচ্ছেন জগজ্জননী। তার চেয়ে শান্তির ঠিকানা আর কোথাও নেই।’ ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিং বলেছেন, ‘মাতৃত্বেই সব মায়া-মমতা ও ভালোবাসা শুরু এবং শেষ।’

মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক কোন রেজিস্ট্রেশন দিয়ে বেধে দেয়া যায় না। একইভাবে এ সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্যও কোন আইনের বাধ্যবাধকতা নেই।

একজন সন্তানের জন্য মায়ের প্রতি ভালোবাসার দিন প্রতিদিন এবং প্রতিমুহুর্ত। মাকে শ্রদ্ধা জানাতে, মাকে ভালোবাসতে বিশেষ দিবসের প্রয়োজন নেই। তাহলে কেন মা দিবস? মা দিবস কিভাবে এলো বা মা দিবসের মাহাত্মই বা কি?

১৮৭০ সালে আমেরিকার জুলিয়া ওয়ার্ড হাও নামের এক গীতিকার মা দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। তিনি আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় একটি দেশাত্মবোধক গান লিখেছিলেন। সে গানটা সে সময় বেশ জনপ্রিয় ছিলো। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হচ্ছিলো। এক মায়ের সন্তান আরেক মায়ের সন্তানকে হত্যা করছিলো অবলীলায়। এসব হত্যাযজ্ঞ দেখে জুলিয়া ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি এ হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার জন্য আমেরিকার সব মাকে একসাথে করতে চাচ্ছিলেন। আর এ কারণেই তিনি আন্তর্জাতিক মা দিবস পালন করতে চাচ্ছিলেন। তার লক্ষ্য ছিলো এ দিনটিকে সরকারী ছুটি হিসাবে ঘোষণা করার। তিনি ব্যাপকভাবে সাড়া না পেলেও তার নিজের শহর বোস্টনে দিবসটি পালিত হচ্ছিলো বেশ ঘটা করেই। ভার্জিনিয়ার একটি মহিলা দলও জুলিয়া হাও-এর প্রস্তাবিত মা দিবসটি পালন করছিলো বেশ মর্যাদার সঙ্গে। এ দলের নেত্রী ছিলেন আ্যানা রিভেস জারভিস। তিনি গৃহযুদ্ধের সময়কালে ‘মাদার’স ফ্রেন্ডশীপ ডে’ পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ দিবস পালন গৃহযুদ্ধের সময় অনেকটাই শান্তির বার্তা বয়ে এনেছিলো।

আ্যান রিভেস জারভিস জীবনের সুদীর্ঘ ২০ বছর কাটিয়েছিলেন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের একটি গীর্জায়। সেখানে তিনি সানডে স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তার মৃত্যুর পর তার মেয়ে আ্যানা এম জারভিস মা দিবস ঘোষণা আন্দোলনের হাল ধরেন। আ্যানা জীবিত ও মৃত সকল মায়ের প্রতি সম্মান জানানো তথা শান্তির জন্য এ দিবসটি পালন করতে চাচ্ছিলেন। এ লক্ষে তিনি ১৯০৮ সালে গ্রাফটনের গীর্জার সুপারিন্টেন্ডের নিকট আবেদন জানান। তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে সে বছরেই ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ও পেনসিলভেনিয়ার কয়েকটি গীর্জায় মা দিবস পালিত হয়। এভাবে অনেকেই প্রতিবছর মা দিবস পালন করতে শুরু করে। অবশেষে ১৯১৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে জাতীয় মা দিবসের মর্যাদা প্রদান করেন।

মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারে বিভিন্ন দেশে মা দিবস পালিত হলেও ইংল্যান্ডে এ দিবসটি পালিত হয় মার্চ মাসে। কোন কোন দেশে আবার মে মাসের শেষ রবিবার মা দিবস পালিত হয়ে থাকে।

মা দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো মাকে যথাযথ সম্মান জানানো। যে মা আমাদের জন্ম দিয়েছেন, লালন-পালন করেছেন, তাকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। মায়ের প্রতি সন্তানের যে ভালোবাসা তা প্রকাশের সুযোগ হয়ে উঠে না সিংহভাগ মানুষের। মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আন্তর্জাতিক মা দিবস সন্তানদের এ সুযোগ করে দেয়। পশ্চিমা বিশ্বে দিবসটির উৎপত্তি; উদযাপনে ঘটাও সেখানে বেশী। বিশ্বের বহু দেশে কেক কেটে মা দিবস পালন করা হয়। উপহার হিসাবে সন্তানেরা মাকে দেয় কার্ড বা চকলেট। তবে মা দিবসের প্রবক্তা আনা জার্ভিস এ বানিজ্যিকীকরণের বিরোধী ছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে একবার বলেছিলেন, মাকে কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর অর্থ হলো, মা তোমার জন্য এত কিছু করেছেন, তাকে দুই কলম লেখার সময় হয় না তোমার? আর যে চকলেট উপহার হিসাবে দাও, তার বেশীর ভাগই চলে যায় তোমার পেটে।’

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মা দিবস পালিত হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে।  বাঙালির মাতৃভক্তির ইতিহাস বহু পুরোনো। দুর্যোগ মাথায় নিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সাঁতরে নদী পার হয়েছিলেন মাকে দেখবেন বলে।

মায়ের ভালোবাসায় কোন স্বার্থ নেই, কোনো প্রাপ্তি নেই। মা তার সন্তানকে বুকভরা ভালোবাসা, প্রাণঢালা আদর বিলিয়ে ধন্য হন। মায়ের মমতার আঁচল সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। মাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট কোন দিন প্রয়োজন হয় না। মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রতিদিনের, প্রতি মুহুর্তের। তারপরও বিশ্বের সকল মানুষ যাতে একসঙ্গে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারে, সে জন্য মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আন্তর্জাতিক মা দিবস পালিত হচ্ছে।  মা দিবসে বিশ্বের সব মায়ের জন্য রইলো অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধা।