কার্ডিনাল প্যাট্রিকের খ্রিস্টান নেতৃবৃন্দের মধ্যে ঐক্যের আহ্বানে সমাজে করণীয়

এডভোকেট জন গমেজ:
আমাদের সমাজ জীবনে ধর্ম এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘকাল ধর্মীয় নেতৃত্ব সমাজে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব দেন। এতে সচেতন সামাজিক নেতৃত্বের সাথে ধর্মীয় নেতৃত্বের কিছুটা দ্বন্দ্ব ছিল। ফলে আমাদের সামাজিক নেতৃত্বের সুষ্ঠু বিকাশ ঘটেনি। সামাজিক নেতৃত্ব সমাজ নেতাদের হাতে আসলে কিছুকাল সম্প্রীতির বন্ধনে কাটে। কিন্তু স্বার্থের প্রশ্ন আসলে সামাজিক নেতৃত্বে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সমাজের দ্বন্দ্ব নিরসনে আমরা বার বার ধর্মীয় নেতৃত্বের কাছে ফিরে গিয়েছি। ধর্মীয় নেতৃত্ব আমাদেরকে সব সময় সঠিক পথ দেখিয়েছেন। আমার বিশ্বাস আজও বর্তমান সংকটে তাঁরা আমাদেরকে আলোর পথ দেখাবেন।

বর্তমান সামাজিক দ্বন্দ্বের পরিধি অনেক ব্যাপক ও গভীর। মহামান্য কার্ডিনাল মহোদয়ের ভাষায় দেশে ও বিদেশে তৃণমূল পর্যন্ত খ্রীষ্টান সমাজের বিভক্তি ও অনৈক্য। সম্প্রতি মহামান্য কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’রোজারিও তাঁর খোলাচিঠিতে খ্রীষ্টান সমাজের ঐক্যের জন্য প্রার্থনা করবেন বলেছেন। মহামান্য কার্ডিনাল মহোদয়ের খোলাচিঠি বার বার পড়ে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি। তিনি বিভক্তি ও অনৈক্যের কারণ, সমাজে এর প্রভাব এবং খ্রীষ্টের ক্ষমার কথা বলেছেন। কিন্তু সমাধান কোন পথে? মহামান্য কার্ডিনাল মহোদয়ের খোলাচিঠির প্রার্থনায় কি সব কিছু সমাধান হয়ে যাবে? উনার প্রার্থনায় কি সবাই ভাল হয়ে যাবেন? সবাই কি সবাইকে ক্ষমা করে দিবেন? উনার খোলাচিঠির উপর অনেকে অনেক মন্তব্য করছেন। কেউ বলছেন শর্ত দিয়ে কোন সংলাপ নয়। ইত্যাদি ইত্যাদি —-। ভয় কেন? অপকর্ম কি তারা খুব বেশী করে ফেলেছেন? কিন্তু মহামান্য কার্ডিনাল তো কোথাও সংলাপের কথা বলেননি। নিঃশর্ত সংলাপ হয় কিভাবে? সমস্যার মধ্যেই তো শর্ত থাকে। নিঃশর্ত সংলাপে সমস্যার সমাধান কি? তা হলে বিভক্তি ও অনৈক্যের সমাধান কি সম্ভব নয়? তারা কি মহামান্য কার্ডিনালের ঐক্যের প্রার্থনার গুরুত্ব অনুধান করতে ব্যর্থ হয়েছেন? সমাজ কি বিষধরদের কারণে বিভক্তি ও অনৈক্যের অভিশাপ নিয়ে চলবে? না, এভাবে একটা সমাজ টিকে থাকতে পারে না। সমাধান জরুরী। সমাধান সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি বর্তমান অবস্থায় একমাত্র ধর্মীয় নেতৃত্বের কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। মহামান্য কার্ডিনাল মহোদয়ের প্রার্থনাকে ঐক্যের উৎস ধরে সমাধানের পথে সামনে আগালেই সমাধান সম্ভব। এব্যাপারে করণীয় বিষয়ে আমার কিছু বিশ্লেষণ ও মতামত তুলে ধরলাম। অন্যদের আরো মতামত থাকতে পারে।

১। সমাজের মানুষ মহামান্য কার্ডিনাল মহোদয়কে সকল খ্রীষ্টভক্তের কার্ডিনাল হিসাবে দেখতে চায়। সমাজের মানুষ গন্ডীর মধ্যে বন্দী কার্ডিনালকে নয়, কিন্তু মূক্ত কার্ডিনালকে দেখতে চায়। তিনি সবাইকে সমান ভাবে আর্শীবাদ করবেন। সমাজে ধর্মীয় নেতৃত্বকে ন্যায্যতার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। অনেক ধর্মীয় নেতৃত্বই সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।

২। মহামান্য কার্ডিনাল মহোদয়ের নির্বাচন পূর্ব মনোভাব আইনের পথে যা হবার তাই হবে এমন অবস্থান নিয়ে ঐক্য সম্ভব নয়। আইনের সমাধান দিয়ে ঐক্য হয় না। আইনে এক পক্ষ হারে অন্য পক্ষ জিতে। কোন পক্ষের হার বা জিত দিয়ে সমাজে ঐক্য সম্ভব নয়। ন্যায্যতা দিয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

৩। মহামান্য কার্ডিনাল মহোদয়ের ঐক্যের জন্য প্রার্থনার খোলাচিঠি একটি সুন্দর পদক্ষেপ। তাঁর আহবান সমাজের বিবেকবান মানুষের মনকে নাড়া দিয়েছে। এখন এই প্রার্থনাকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে হবে। যে কোন সমস্যা আলোচনার টেবিলেই সমাধান সম্ভব।

৪। সমাজে বিভক্তি ও অনৈক্যের কারণগুলো আলোচনার টেবিলে আনতে হলে সবার গ্রহণযোগ্য একটি শক্তিশালী সমাধান কমিটি গঠন জরুরী। এব্যাপারে কার্ডিনাল মহোদয় গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে সমাধান কমিটি গঠন করতে পারেন। সবার গ্রহণযোগ্য বলতে (১) ফাদার বেন্জামিন কস্তা, সিএসসি,(২) বিশপ মজেস কস্তা, সিএসসি, (৩) বিশপ জের্ভাস রোজারিও, (৪) বিশপ শরৎ ফ্রান্সিস গমেজ ও (৫) ডঃ ফাদার লিটন এইচ গমেজ, সিএসসি হতে পারেন। অথবা আরো অন্য কেউ।

৫। সমাধান কমিটি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে সমস্যা চিহ্নিত করে বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাধানের কার্যকর পদক্ষেপ নিবেন।

৬। যেহেতু ঢাকা ক্রেডিট র্নিবাচন – ২০১৭কে কেন্দ্র করে সমাজে বিভক্তি ও অনৈক্য প্রকট আকার ধারণ করেছে সেক্ষেত্রে ঢাকা ক্রেডিটের সাধারন সদস্যবৃন্দের মতামত নিয়ে (তারা কি চায়) সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।

৭। ঢাকা ক্রেডিট র্নিবাচন – ২০১৭কে কেন্দ্র করে সাধারন সদস্যবৃন্দ / সমাজবাসী নিজেদের খুবই অপমানবোধ করছে। ঐক্যের জন্য তাদের অধিকার, মানবাধিকার, গনতন্ত্র ও নির্বাচন ফিড়িয়ে দিতে হবে।

৮। নির্বাচনোওর সদস্যপদ সংক্রান্ত গণ কারণ দর্শানোর নোটিশ পরিস্থিতি জটিল করছে। ঐক্য চাইলে এ ধরনের অনৈতিক কাজ দ্রুত বন্ধ হওয়া জরুরী।

৯। সমাজের বিভক্তি ও অনৈক্য দূর করতে হলে খ্রীষ্টান সমাজে সমিতিগুলোর নির্বাচন আচরণ বিধিতে ব্যাপক সংস্কার আনতে হবে। নির্বাচন অবাধ হতে হবে। যেন যোগ্য সাধারণ সদস্যবৃন্দ স্বাধীনভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন। নির্বাচন যেন শুধুমাএ কোন সিন্ডিকেটের মধ্যে বন্দী না থাকে। সমিতির নির্বাচন পূর্বে নতুন ভোটার বানানো বন্ধ করতে হবে। সমিতির সদস্যরা ভোটার নয় সম্মানিত সদস্য হবেন। ঐক্যের জন্য নতুন প্রজন্ম ও নারী নেতৃত্বের সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি জরুরী।

১০। সমাজে বিভক্তি ও অনৈক্য দূর করতে হলে সমিতির প্রতিটি কাজ সমবায় আইন, বিধি ও উপ-আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন এবং সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত ও সমভাবে নিয়মনীতি প্রয়োগ জরুরী। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সমাজে বিভিন্ন সমিতির নেতৃত্ব নিজস্ব ভাবে নির্ধারন হওয়া আবশ্যক। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আর্থিক বিনিয়োগ ও নিয়মনীতির মধ্যে থেকে লেনদেন প্রয়োজন।

১১। সমাজ ঐক্যে খ্রীষ্টান সমাজের সমিতিগুলোকে পূর্বের ন্যায় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসাবে ফিরিয়ে আনা আবশ্যক।
আশা করি মহামান্য কার্ডিনাল মহোদয়ের প্রার্থনায় সমাজে ন্যায্যতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা বাস্তব রুপ নিবে। আমি সমাজ ঐক্যের স্বপ্ন দেখি।
লেখক: আইনজীবী ও রাজনীতিক