মৃত্যু সজ্জায় শিক্ষা

ওসমান্ড রড্রিগ্স্

কতনা জোরে গাড়ী চালিয়ে যেতো মমিন সাহেব, আর আজ  সে এম্বুলেন্সে রাস্তায় শত শত গাড়ীর জ্যামে পড়ে আটকে আছে। কেহ তার এ্যম্বুলেন্সকে সাইড দিচ্ছে না, যে যার মত ঠায় দাঁড়িয়ে। মমিন সাহেবের কোনও শক্তি নেই যে, কোন গাড়ীকে সাইড দেবার জন্যে ধমক দেবে। মনে মনে খোদার কাছে দোয়া চাচ্ছে, যেন রাস্তার গাড়ীর জ্যাম তাড়াতাড়ি যেন ছুটে যায়। মনে মনে বলছে, ড্রাইভারেরা কত বজ্জাত, এ্যম্বুলেন্সকে সাইড দিচ্ছে না। সময় মত হাসপাতালে না পৌছতে পারলে সে বাঁচবে কি-না সন্দেহ। অনবরত তার এম্বুলেন্সটা সাইরেন দিয়ে যাচ্ছে। সবাই তাকিয়ে দেখছে স্যালাইন লাগানো ছট্ফট্রত মমিন সাহেবকে। কয়েক জন হাত পাখা দিয়ে বাতাস করছে তাঁকে। মমিন সাহেবের এ্যম্বুলেন্সের সহযাত্রীরা কেহবা উদাস্ দৃষ্টিতে থ হয়ে বসে আছে, আর কেহবা ইতস্ততঃ করছে। উপায় নেই। মনে মনে কেহবা বলছে এক্ষেত্রে হেলিকপ্টার হলে ভালো হতো ইত্যদি ইত্যদি। তবে মমিন সাহেব আজ অনেক কিছুই  বুঝতেছিল, যা আগে বোঝার চেষ্টা করেননি। আজ তা বুঝেও তার লাভ নেই।

আজ আমাদের রাস্তা ঘাটের কেন এ অবস্থা ? এম্বুলেন্সকেও সাইড দেবার প্রয়োজন বোধ করে না কেহ। আজ মানুষ এমনকি কোন কোনও ক্ষেত্রে পশুর চেয়েও খরাপ। অনেকেই বলবে সব কিছুর মূল বা দ্বায়ী হলো সরকার। কথাটা কিছুটা সত্য হলেও, আমার মতে সম্পূর্ণ সত্য নয়। যদিও সরকারী নিয়মেই চলার কথা ও সরকারও তার নিয়ন্ত্রণ রাখার কথা কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই না। তবে অনেক কিছুই সরকারও বোঝার সুযোগ পায় না। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ডিপার্টমেন্টগুলোর চাপ এবং মন্ত্রিবর্গের সুপারিস ইত্যাদি ভাবনা ধারাই সরকার প্রধানকে মেনে নিতে হয় এবং সেভাবেই এগুতে হয়। জনগণকে দেখানোর জন্যে বা ভাল হওয়ার জন্যে কিছু কিছু আইন, কিছু কিছু উন্নয়নমূলক কাজ সব সরকারকেই করে যেতে হয় এবং এরই মধ্যে অনেকের পকেট ভারী করারও সুযোগ আসে। এগুলোর মধ্যে কোন কোনওটা জনগণের কল্যাণ বয়ে আনে আবার কোনটা অসুবিধারও সৃষ্টি করে। সুযোগে বিরোধী দল আহ্বান করে হরতাল অবোরোধ ইত্যাদি। সরকার বিদেশী  লোক নয়। তারা আমাদের সমাজেরই লোক। সুতরাং তাদের স্বভাব, রীতি, নীতি সব কিছুই বাঙ্গালী স্টাইলে। বাঙ্গালীর চরিত্র, স্বমাজ ও জনগোষ্ঠি ঠিক না হওয়া পর্য্যন্ত, কোনও সরকারই ঠিক ভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত করতে পারবে না। তাই শুধুমাত্র সরকারকে না দোষা দিয়ে নয়, ব্যাপারটাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে বা ভিন্ন আঙ্গিকে ভেবে  দেখা উচিত। প্রত্যেকেরই অন্যের দোষ বা বিচার করার পূর্বে দেখতে হবে, নিজে ঠিক আছি কি-না। জনগোষ্ঠি ভাল হলে সরকারের সাধ্য নেই দেশ ও জনগণের উপর বল খাটানো বা কোন ঠাষা করে রাখা। করলেও তার থেকে সরে আসতে বাধ্য করা ব্যাপর নয়। উন্নত দেশ গুলোর ঘটনা গুলোই আমাদের কাছে এরকমেরই উপমা রাখে।

জলিল সাহেব রিটায়ার্ড করেছেন অনেক দিন হয়। বাড়ী বানিয়েছেন। ক’দিন পর পর ক্ষণে ওয়াসার বকেয়া ভুঁয়া নোটিশ বা  ক্ষনে ইলেক্ট্রিক বকেয়ার ভুঁয়া বিল আসে ইত্যাদি ইত্যাদি। ৫/৭ মাসের আগের বকেয়া বিল যার পরিষোধিত কিন্তু বিলের কপি তার কাছে নেই। এখন তার এই পাহাড় সম বকেয়া দিয়ে নানা বিড়াম্বনা। ঘুষ চাই। আর্থিক অভাবে বর্তমানে তার পক্ষে বড় অংকের ঘুষ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কি করবে ভেবে পায় না। বলে ওঠে দেশের মানুষ সব ঘুষখোর হয়ে গেছে। তবে মনে মনে বলে, আমিও কি জীবনে মানুষকে কম ঘুরাতাম, কম ঘুষ খেতাম ? হাসেম ছিল তেল ব্যাবসায়ী। হঠাৎ বাসা থেকে খবর এলো তার বচ্চা অসুস্থ। দৌঁড়ে গিয়ে ডাক্তারের নিকট যায় এবং ডাক্তার বলে ভেজাল দুধ খাওয়ানোর ফলে বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বিপদ জনক অবস্থায় ইন্টেসিভ্ কেয়ার ইউনিটে আছে। হাসেম বললো, দেশের সব ব্যাবসায়ীই দু’নম্বর হয়ে গ্যাছে। ভেজাল মেশায়। বাঁচ্চার লাশের সামনে অনেক কেঁদে শেষমেষ মনে মনে বলে, আমিও কি তেলে কম ভেজাল করি ? আমার কারনেওতো কত শিশু অসুস্থ হয় ?

মমিন সাহেব চিন্তা করছিল, আমিওতো সারাজীবন এভাবেই নানা জায়গায় অবৈধভাবে গাড়ী পার্ক করে কতো মানুষের অসুবিধার কারণ হয়েছিলাম, যা আমার কখনোই করা উচিত ছিল না। আমি অনর্থক দু’দুটো গাড়ী কিনে রাস্তায় যানযট্ বাধাঁতে সাহায্য করেছি এবং আজ এই জটের কারণেই আমাকে হাসপাতালে আসতে এতো সময় লেগে গেল

পরীক্ষায় ছেলে ফেল করেছে। ডাক্তার সাহেব ছেলের জন্যে বড়ই চিন্তিত ও স্কুলের টিচারদের উপর খুব রাগ। স্কুলের নিয়মে ছেলেকে উপরের ক্লাশে কোন মতেই ওঠানো যাবে না। ডাক্তার সাহেব রাগের চোটে বলছিলেন, সারা বছর শুধু  ধেকাবাজি করে মাষ্টরেরা সময় পাড় করে। আর কিভাবে পয়সা কামাবে সে তালেই থাকে। ছাত্ররা কি শিখলো না শিখলো তা তাদের প্রয়োজন নেই। কিন্তু মনে মনে এও ভাবছিল যে, সেই-বা রুগীদের কি সেবা বা চিকিৎসা করে ? শুধুতো পয়সার ধাঁধাঁতেই থাকে। ওদেরইবা দোষ কোথায় ? বকুল মিঞা ছেলে মেয়েদের বড়ই আদর যত্ম করে মানুষ করেছিল। রিটায়ার্ড হবার পর যখন ওনার হাত খালি, তখনই বোঝে ছেলে/মেয়েরা একটাও মানুষ হয়নি। এমন কি কঠিন রোগে সজ্জা পার্শ্বেও ছেলেদের চেহারা দেখেনা। এখন মৃত্যু সজ্জায় শুয়ে শুয়ে কাঁদে আর বলে, কেন আমি ওদরে প্রকৃত মানুষ হবার জন্যে কখনো চিন্তা করিনি। শুধু টাকার মোহেই ছিলাম। আমারই ভুল ছিল সমস্ত কিছুর।

শেষ পর্যন্ত মোমিন সাহেবের এ্যম্বুলেন্স হাসপাতালের গলি দিয়ে ঢুকতে শুরু করলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেখানেও কে যেন একটা গাড়ী রং সাইডে পার্ক করে রেখেছে। এ্যম্বুলেন্সটা ঢুকাতেই পারছিল না এবং সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল। মমিন সাহেব চিন্তা করছিল, আমিওতো সারাজীবন এভাবেই নানা জায়গায় অবৈধভাবে গাড়ী পার্ক করে কতো মানুষের অসুবিধার কারণ হয়েছিলাম, যা আমার কখনোই করা উচিত ছিল না। আমি অনর্থক দু’দুটো গাড়ী কিনে রাস্তায় যানযট্ বাধাঁতে সাহায্য করেছি এবং আজ এই জটের কারণেই আমাকে হাসপাতালে আসতে এতো সময় লেগে গেল। পয়সায়, লালসায় যোয়ান কালে কত কি-ই না করেছি কিন্তু কিছুই চিন্তা করিনি এবং শিখিওনি। আজ মৃত্যু সজ্জায় সবই বুঝতেছি এবং আমার শিক্ষা হচ্ছে। মমিন সাহেব যেন কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল কিন্তু আর পারলেন না এবং অবশেষে এ্যম্বুলেন্সেই শেষ নিঃশ্বার ত্যাগ করলেন। আমরা অনেকেই অনেক কিছু সময় থাকতে শিখিনা। অন্যকে দোষাই এবং নিজে কি করছি তা আর তলায়ে দেখি না। আমরা অনেকেই নানা ভাবে নানা সুযোগ নিয়ে নিজে সুখ, আরাম ও শুধুমাত্র নিজে ধনী হয়ে থাকতে চাই। কিন্তু এমনি এক সময় আসে যখন নিজেদের কারনেই নিজেরা অসুবিধায় পরি। আমাদের শুরু বা সময় থাকতেই শিক্ষা গ্রহন করতে হবে, মৃত্যু সজ্জায় নয়। সময় থাকতে হতে হবে সৎ, ভদ্র, ত্যাগী এবং ধৈর্য্যশীল। পরিহার করতে হবে লোভ এবং মানতে হবে সমাজ ও আইন। তবেই শুধু পাব মৃত্যু সজ্জায় শান্তি।

Leave a Reply