মহান মুক্তিযুদ্ধে খ্রীষ্টান শহীদ

Published:

Freedom Frighter (3)সুমন কোড়াইয়া:

১৯৭১ সালে দেশে খ্রীষ্টানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩লক্ষ। মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.৩ ভাগ। তা সত্ত্বেও বাঙ্গালীর স্বাধীকার আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খ্রীষ্টান জনগণও নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য কাজ করেছেন। এখনো কাজ করে যাচ্ছেন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও পূর্ব বাংলার জনগণের উপর ঔপনিবেশিক ধরনের শোষণ, নির্যাতন ও বৈষ্যম্য অব্যাহত থাকে। বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ডাকে শুরু হলো স্বাধীনতা সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধরু ডাকে সাড়া দিয়ে শত শত খ্রীষ্টান যুবক সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। দেশ মাতৃকাকে বাঁচাতে গিয়ে অনেকে নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়েছেন। অনেকে আহত ও পঙ্গু হয়েছেন। এছাড়া বিদেশী মিশনারী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগণ যুদ্ধের ন’মাসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয়, খাদ্য, সেবা ও চিকিৎসা দিয়ে সাহায্য করেছেন। দেশের অভ্যন্তরে থেকেও অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন অথবা বিভিন্নভাবে তাদের সহায়তা দিয়েছেন। সহায়সম্বলহীন মানুষগুলোকে যাঁরা আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছেন, বর্বর পাকহানাদার বাহিনী তাঁদের বাড়ী ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে তাঁদের সর্বস্ব লুণ্ঠন করেছে। হত্যা করেছে নির্বচারে। দেবতুল্য ফাদার উইলিয়াম এভান্স, সিএসসি, ফাদার মারিও ভেরোনিসি, এসএক্স, ফাদার লুকাশ মারান্ডী, সিস্টার এম্মানূয়েল এসএমএমআই সহ আরও অনেককে তারা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। বীরের সাথে সম্মুখ সমরে লড়ে শহীদ হয়েছেন সুভাষ বিশ্বাস, খোকন সলোমন পিউরীফিকেশন, আশিস ব্যাপারী, পরিমল দ্রং সহ আরো অনেকে।
যুদ্ধ করে সুনাম অর্জন করেছেন জর্জ দাশ (জর্জ ভাই) যাঁরা একই পরিবারের পাঁচ ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, এন্থনি ডি’রোজারিও, থিওফিল হাজং, প্যাট্টিক রড্রিক্স, দীপক সাংমা, সমর লাইস ডি’কস্তা, এক্সিবিশন বনোয়ারী, রবিন আলফন্স গমেজ, অনাথ নকরেক, রমেশ রাফায়েল গমেজ, ইউজিন কস্তা, অরবিন্দ সংমা দিও, নির্মল রোজারিও, ধীরেন্দ্র রিছিল, অরুণেষ পান্ডে, এন্ডু ডি’কস্তা, স্তেফান নকরেক, নেলসন বাদল হালদার, কিরণ প্যাট্টিক ডি’রোজারিও, ভদ্র মারাক, সিলভেষ্টার সন্তোষ কস্তা, যতীন্দ্র সাংমা- ১, ডেভিড পি. বৈরাগী, সুব্রত বনিফেস গমেজ, যতীন্দ্র সাংমা- ২, আব্রাহাম অরুণ ডি’কস্তা, জেমস আর কে. হাজরা, অশ্রু কুমার বিশ্বাস, আরমন্ড রয়, লুইস রোজারিও, জীবন ডি’ক্রুশ, উইলিয়াম অতুল কুলুন্তুনু, যোসেফ গমেজ সহ আরো অনেকে যাঁদের নাম ভবিষ্যতে কোন লেখায় উল্লেখ করার আশা রাখি।খ্রীষ্টানদের মধ্যে কোন রাজাকার নেই, সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন।
এগারশর বেশি খ্রীষ্টান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। অনেক মুক্তিযুদ্ধা যুদ্ধ করেও পাননি মুক্তিযুদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি। জীবনের শেষ বয়সে এসেও তারা সম্মান ও স্বীকৃতি না পেয়ে সেই আক্ষেপ করে যাচ্ছেন।

১৯৭২ সালে ২ ফেব্রুয়ারী আর্চবিশপ টি এ গাঙ্গুলীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের কাথলিক ও প্রটেষ্টান মন্ডলীর ছয়জন নেতা সদ্য স্বাধীন দেশের প্রধান মন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের সাথে তাঁর অফিসে সাক্ষাৎ করেন এবং এদেশের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য দু’লক্ষ টাকার একটি চেক এবং এদেশের উপর ঈশ্বরের আশিবাদের প্রতীকস্বরূপে একটি স্বর্নের ক্রুশ ও তাঁর গলার চেইন প্রদান করেন।

Freedom Frighter (2)


মহান যুক্তি যুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন, যুদ্ধে সমর্থন দিয়েছেন এবং যাঁদের মাধ্যমে আমরা সুন্দর একটি দেশ, পতাকা ও
মানচিত্র উপহার পেয়েছি, তাঁদের জানাই হাজারো সালাম!

Leave a Reply