আমরা খ্রিষ্টান, আমরা বাংলাদেশী

লিখেছেন সুবীর কাস্মীর পেরেরা
৬৮ হাজার বর্গমাইলের ছোট একটি স্বাধীন দেশের জন্মের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয় সংগ্রামের ফসল এই বাংলাদেশ। আমরাই একমাত্র গর্বিত জাতি যারা খুব অল্প সময়ে

সুবীর কাস্মীর পেরেরা

সুবীর কাস্মীর পেরেরা

দানবের বিরুদ্ধে লড়ায়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। ত্রিশ লক্ষ্য শহীদদের আত্মবলিদানের এই বাংলাদেশের তথা বিশ্ব দরবারে লাল সবুজের চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। বাংলাদেশে ৮৬% মুসলিম প্রধান দেশ হলেও সংখ্যালঘু হিসেবে হিন্দু-বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের অবস্থান দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ। দেশের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সংখ্যা ০.৪%. হিন্দু ১৫% কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭% .তবে আমরা খ্রিষ্টান হিসেবে গর্ব করে বলতে পারি সংখ্যার দিকে কম হলেও মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অবদান ছিল ১০০% .যা দেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মধ্যে নেই। আমরা গর্ব করে বলতে পারি আমাদের কোন রাজাকার ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমাদের চার্চ ও ফাদার-সিস্টারদের অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু আজ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে আজ আমাদের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রেখেছে।
সংসদে জিয়ার ৫ ম সংশোধনী এবং স্বৈরাচার এরশাদের ৮ ম সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম কায়েমের মাধ্যমে দেশে জঙ্গিবাদের আস্ফালন দেখা দিয়েছে। যা আমাদের প্রতিনিয়ত শংকিত ও ব্যথিত করে। জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ যে ভাবে আজ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অদূর ভবিষ্যতে দেশ তালেবানি রাষ্ট্র বানানোর স্বপ্নে বিভোর মৌলবাদী চক্র ।
ইদানিং দেশে যে হারে খিষ্টানদের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা ও ডাকাতির বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে মানুষের মনে আতংক নয় মৃত্যু তাদের প্রতিনয়ত তাড়া করছে। গত কয়েক বছর দেশে জঙ্গিবাদের উথ্যান ও তাদের নৃশংস ধ্বংস জগ্গের যে আলামত পরিলক্ষিত হচ্ছে , সরকার ও প্রশাসন যেন তাদের হাতের পুতুল সেজে বসে আছে। দেখেও না দেখার ভান করে একের পর এক তান্ডবে তারাও সামিল হচ্ছে। এমতাবস্তায় আমি-আপনি বা আপনার কি চুপ করে বসে থাকব?? আমরা কি আরো হারাতে চাই আমার প্রিয় ভাই-প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়কে???আপনার আমার কি কিচ্ছু করার নেই??? আপনার বিবেক কি আপনাকে আন্দোলিত করে না?

নির্যাতন 
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ও মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এর এক জরিপে দেখা গেছে ২০১৫ সালে দেশে শুধু মাত্র সংখ্যালঘু নারী- পুরুষদের খুন, ধর্ষণ, নারী অপহরণ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরিতকরন্সহ২৬২ টি মানবাধিকার লংগ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে একাধিক ব্যক্তি , পরিবার ও প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ১৬৫ টি। হামলায় নিহত হয়েছে ২৫ জন , আহত হয়েছেন ২৩৯ জন, অপহরণের শিকার ২৪ জন নারী, যাদের মধ্যে ৯ জনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৫ জন নারী ,তাদের মধ্যে ১০ জনকে গণধর্ষণ, দুইজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জমিজমা, ঘরবাড়ি মন্দির দখল ও হামলার ঘটনা ঘটেছে ২০৯ টি। উচ্ছেদের শিকার ৬০ টি পরিবার।
রংপুরের ৯ টি চার্চ ও ১০ টি প্রতিষ্ঠানকে হত্যা ও হামলার হুমকি দিয়েছে জঙ্গিগুষ্ঠী। এছাড়া ১২ জন যাজককে মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে।
৫ অক্টোবর ২০১৫ সালে ইশ্বরদীর পাষ্টর লুক সরকারকে(৫০) গলা কেটে হত্যা চেষ্টা করেছে জঙ্গিরা। ইতোমধ্যে দুজন ধরা পরলেও দুর্বল ধারার মামলার কারণ ও পুলিশের দুর্বল চার্চশিটের কারণে মামলা ঝুলে আছে।
১৮ নভেম্বর দিনাজপুরে কাথলিক ইতালিয়ান যাজক পিয়েরো,পিচমকে(৬৪) গুলি করে হত্যা চেষ্টা করা হয়. পরে জেএমবির দুই জঙ্গিকে গ্রেফতার করলেও মামলার অগ্রগতি নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
এই গেল ২০১৫ সালের তকমা!! ২০১৬ সালের বিগত ৬ মাসে যে হারে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে তা আতকে উঠার মধ্যে। নিচে ২০১৬ সালের কিছু ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরলাম, যা কেবল পত্রিকায় এসেছে, পত্রিকায় আসেনা এমন খবরের সংখ্যা কত ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানেনা।

২০১৬ সালে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা 

১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ বুধবার দিবাগত রাতে কালিগঞ্জের তুমিলিয়া ধর্মপল্লির সেন্ট মেরিস কাথলিক মা ও শিশু সেবা কেন্দ্রে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ডাকাতেরা লক্ষাধিক টাকার জিনিস নিয়ে গিয়ে লাঞ্চিত করে এস এম আর এ সিস্টারদের। এই ঘটনায় জনগণ দুইজনকে এতক করলেও মামলা কি অবস্থায় আছে ঈশ্বর কেবল জানেন।
৬ মার্চ ২০১৬, খুলনা ধর্মপ্রদেশের মেহের্পুরস্থ ভবরপারা ধর্মপল্ল্লির মাদার হাউজে দুর্ধষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পুলিশ ১০ জনকে গ্রেফতার করলেও আসলে তারা ডাকাত কি-না তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
৮ মার্চ ২০১৬, কালিগঞ্জের দরিপাড়া ধর্মপল্লির চাবির বাড়িতে ডাকাতেরা হানা দিয়ে স্বর্ণালংকার, মোবাইল, এবং নগদ টাকা ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে লুট করে। পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে না পারে ভাওয়াল এলাকায় মানুষের মনে আতংক দেখা দিয়েছে।

২২ মার্চ ২০১৬ কুড়িগ্রাম শহরের গাড়িয়াল পাড়ায় হোসেন আলী সরকার(৬৮) নাম এক খির্ষ্টভক্তকে দুর্বৃত্তরা জবাই করে হত্যা করে। সে ইসাহ ফেলোশিপের সদস্য় ছিল।

৩ এপ্রিল ২০১৬, চুয়াডাঙ্গার দামুরহুদা উপজেলার বাঘাদাঙ্গা খ্রিষ্টান পল্লীতে আলম মন্ডলের বাড়িতে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩ জন গুরুতর আহত হয়। পুলিশ এক জঙ্গিকে এতক করলে মত অংকের বিনিময়ে ছাড়া পায়।
৮ এপ্রিল ২০১৬, খাগড়াছড়ির বড়নালা ইম্মানুয়েল ব্যাপ্টিস্ট চার্চের পাস্টরের (৪৫) স্ত্রীকে স্থানীয় বাবু মুন্সী, ফরিজাল, মুকবুল ও অজ্ঞাতনামা আরেকজন গণধর্ষণ করে। পুলিশ এখনো মামলা নেয়নি।
২০ মে জানা যায়, মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলার ভবরপাড়া গ্রামের মেয়ে আম্রকানন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের খন্ডকালীন খৃষ্টান ধর্মীয় শিক্ষিকা তার বিদ্যালয়েল প্রধান শিক্ষক শরিফুল ইসলাম জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে। শিক্ষক শরিফুল ইসলাম বর্তমানে পলাতক আছে।
২১ মে ২০১৬, রাত সরে তিনটায় গাজীপুরের ভাদুন ধরপল্লির একটি খ্রিষ্টান বাড়ির গেট ভেঙ্গে মুখোশধারী লোক ধরালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রুনু পালমা ও সবিতা পালমাকে আহত করে। তারা ভাদুনের নৈপারা গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

২৯ মে পাবনা জেলার ফৈলজনা গ্রামের ব্যবসায়ী রঞ্জিত রোজারীয়র উপর সন্ত্রাসীরা হামলা করে। তাকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্থানীয় বাদশা মিয়া হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিল।

৪ জুন দেশে শেষ দফা নির্বাচন চলাকালে সাভারের ৭ নং বিরুলিয়া ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ড ভোট কেন্দ্রে কমলাপুর (ভবানীপুর) এ ভোট চলাকালে কতিপয় আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসী স্থানীয় খ্রিষ্টান ভোটারদের উপর হামলা করে। এ ঘটনায় সুরেশ রোজারিও, বিলাস গোমেজ, মালতি গোমেজ , চৈতালি রিবেরু ,রাজু গোমেজ, পিতার গোমেজ,দনেল গোমেজ, হেলেন রজারীয়সহ শতাধিক খ্রিষ্টান ভোটার আহত হয়েছে। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনা ধামাচাপা দিতে ইতোমধ্যে সাথানিয় এমপি ডা এনামুল ম্যানেজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। উক্ত ঘটনায় বিলাস গোমেজ বাদী হয়ে আল আমিনকে প্রধান করে ৫০-৬০ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির নাম মামলা করে।
৫ জুন ২০১৬ রবিবার ঘটে গেছে সব চেয়ে ভয়াবহ হত্যা কান্ড। নাটোরের বড়ায়গ্রামের সুনীল গোমেজকে দুর্বৃত্ততা গলার পিছনে কুপিয়ে হত্যা করে। দিনে দুপুরে এমন ঘটনা রীতিমত ভয়ানক। সুনীল গোমেজ নিজ দোকানে খুন হলে স্থানীয় খ্রিষ্টভক্ত ক্ষোভে ফেটে পরে। এ সময় তারা স্থানীয় বাজারের সামনে বিক্ষোভ করে প্রতিবাদ জানায়। দেশ বিদেশে উঠে প্রতিবাদের ঝড়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষ মন্তব্যের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়। পুলিশ দায়সারা ভাবে একজনকে গ্রেফতার করে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়.

৬ জুন ২০১৬ শিমুলিয়া গির্জায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতি করে পালানোর সময় স্থানীয় বাসিন্দারা একজনকে ডাকাতকে এতক করে গণপিটুনি দেয়। এতে ডাকাত আমিনুল(৩০) ঘটনাস্থলে নিহত হয়।

এই তো গেল ছয় মাসের ঘটনা। আরো বছরের ছয় মাস অপেক্ষা করছে। জানি না কি হবে সামনে। তবে সচেতন না হলে হয়ত আরো বেশি ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বয়েছে। আমরা আর কোন খ্রিস্ট বিশ্বাসীকে হারাতে চাই না। আসুন বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলে প্রতিবাদের ঝড় বিয়ে দেয় মানবতার মন কুঠিরে।

(তথ্যসূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, বিডি খ্রিষ্টান নিউজ, সুমন কড়াইয়া, দৈনিক জনকন্ঠ, দৈনিক সংগ্রাম ও স্পন্দন। )

লেখক: আমেরিকা প্রবাসী

Leave a Reply