অত্যাচারিত খ্রিস্টান জনপদঃ নির্বাক দৃষ্টি ভঙ্গি

পল সি মধু:

২৪ মার্চ,  কতিপয় পুলিশ কালিগঞ্জ থানার দড়িপাড়া খ্রিস্টান জন-পদে নারী-পুরুষ, আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলের উপর নির্মম অত্যাচার চালায়। যা দেখে মনে হয়, ১৯৭১ সালের পাকিস্থানী প্রেতাত্মারা আবার বাংলার বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী  বাহিনীর মধ্যে লুকিয়ে আছে। সময় ও সুযোগ  পেলে রাজাকারদের মতো আজো এদেশের নিরীহ দেশ প্রেমিক জাতি গোষ্ঠি বিশেষত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার চালায় ।

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশের সকল আন্দোলনে খ্রিস্টান সম্প্রদায় সবসময় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও বাংগালী খ্রিস্টানরা মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছে এবং সাধারণ খ্রিস্টান জনগণ এদেশে অন্য সম্প্রদায়কে পাকিস্থানী বাহিনীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করেছে। কারণ যুদ্ধের একটা সময় পাক-বাহিনীরা খ্রিস্টানদের কিছুটা রেহাই দিয়েছিল। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এদেশের খ্রিস্টানরা অন্য ধর্মাবলম্বী বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়কে বিভিন্ন কৌশলে খ্রিস্টান পরিচয় দেখিয়ে নর পিচাশদের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। শুধু তাই নয়, অনেকে  শরনার্থী হয়ে ভারতে যাবার সময় তাদের সোনা-দানা, গরু বাছুর, জমি-জমা ইত্যাদি খ্রিস্টান পরিবারের হাতে আমানত হিসেবে রেখে নিশ্চিন্তে চলে গিয়েছিল এবং যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে সেগুলো আবার ফেরৎ নিয়েছিল এমন উদাহরণও প্রচুর রয়েছে।

এই থেকে এটা স্পষ্ট যে, এদেশের খ্রিস্টান জনগণ অসাম্প্রদায়িক, দেশ-প্রেমিক,বিশ্বিস্ত ও মানব সেবায় নিবেদিত প্রান। তবুও এদের উপর একটার পর  একটা নির্যাতন কখনো সরকারী বাহিনীর মাধ্যমে আবার কখনো পথ-হারা কিছু উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠির মাধ্যমে নিয়মিতভাবে ঘটে চলছে। জানিনা  এই নির্যাতন কখন  এবং কোথায় গিয়ে শেষ হবে? তবে এর পরিসমাপ্তি আশু প্রয়োজন। নতুবা আমাদের অজানা একটা ত্রাসের মধ্যে  জীবন যাপন করতে হবে, সত্যিই যা কোন স্বাধীন, সার্বভৌম ও সভ্য জগতে সম্ভব নয়।

সরজমিনে স্বাক্ষাতকার এবং বিভিন্নভাবে আঘাত প্রাপ্তদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, ঘটনার দিন ৪ জন পুলিশ ছদ্ম বেশে এবং কোন প্রকার আইডি কার্ড এবং পোষাক ব্যতিরেকে সন্ধ্যার দিকে দড়িপাড়া খ্রিস্টান বাড়ীতে গিয়ে এক বিধবা মহিলাকে (বিশেষ কারণে অত্যাচারিতদের নাম প্রকাশ করা হলো না) বলেন যে, তুমি মদ তৈরী করো এবং সেই মদ বিক্রি করে এলাকায় মাদক ব্যবসা চালু করেছো। আমাদের যদি ৫০,০০০/ (পঞ্চাশ হাজার টাকা) না দেও তবে তোমাকে ও তোমার ছেলে -মেয়েদের মাদক ব্যবসার মামলা দেখিয়ে থানায় ধরে নিয়ে যাব। উত্তরে ঐ মহিলা জানায় যে, আমি মদ খাই না এবং মদ বানাইও না। আপনারা কারা? কিসের জন্য এসেছেন? দয়া করে আপনারা আমাদের বাড়ী থেকে চলে যান। কিন্তু ঐ পুলিশ সদস্যগণ নাছোরবান্দা। তাদের টাকা না দিলে তারা সেখান থেকে যাবে না। এভাবেই তর্ক চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে পুলিশ সদস্যগণ  ঐ ঘরের খাবার ঘর থেকে একটা চাকু এনে বলেন যে, এই চাকুটা তোমাদের ঘরে পাওয়া গেছে, তোমাদের নামে অস্ত্র মামলা করা হবে। এভাবে বাগ-বিতন্ডা চলতে থাকলে পাশের ঘরের লোকজন সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। পুলিশ সদস্যরা তাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালা-গালি করে এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেয়। এতে ভয় পেয়ে ঐ মহিলারা এবং বাড়ীর লোক জন ডাকাত বলে চিৎকার করে।

কিছু সময় পরে গ্রামের লোক জন আসলে তারা বলেন যে, তারা পুলিশের লোক এবং আসামী ধরতে এসেছেন। কাকে কি কারণে ধরতে এসেছেন তাহা জানাতে পারেনি এবং তাদের কাছে কারো নামে কোন ওয়ারেন্ট আছে কি-না, তাদের পুলিশের আই ডি কার্ড আছে কিনা জানতে চাইলে, তারা কিছুই দেখাতে পারেনি। ইতিমধ্যে তাদের একজন থানায় ফোন করে জানায় যে, গ্রাম-বাসী তাদের মার-ধোর করেছে এবং আটকিয়ে রেখেছে, যথা শীঘ্র ফোর্স নিয়ে এসে উদ্ধার করুন। এই ফোন পাওয়ার পর থানার ওসির নেতৃত্বে ৩০-৩৫জন পুলিশ এসে গ্রাম-বাসীর উপর রাবার বুলেট ছুড়ে এবং বেধরক মার-পিট করে।

শুধু তাই নয়, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে খ্রীষ্টান জনপদের নারী-পুরুষদের নামে গন-মামলা দায়ের  করে। ফলে এলাকাটি পুরুষ শুণ্য হয়ে যায়। পুলিশের ছড়া গুলিতে এবং লাঠি ও জুতার আঘাতে অনেকে গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হয়। অনেকে আজও পালিয়ে বেরাচ্ছে। এর পর স্থানীয় জন-প্রতিনিধী এবং খ্রিস্টান সমাজের সুধী জনের আলোচনার মাধ্যমে বর্তমানে পুলিশ ঐ এলাকায় কম যায় কিন্তু বে-নামা মামলা আজো প্রত্যাহার করা হয়নি। এলাকার মানুষ এখনো  গ্রেপ্তারের ভয়ে আতংকিত।

ঘটনার সত্যতা জানার জন্য এবং অত্যাচারিত মা-বাবা-ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিগত ১ এপ্রিল খ্রীষ্টিয়ান এ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের ৪০ সদস্য বিশিস্ট একটি প্রতিনিধী দল অত্র এলাকা পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় জনগণ ও এলাকার চেয়ারম্যানের সাথে মত-বিনিময় করেন। খ্রীষ্টিয়ান এ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সম্মানিত মহা সচিব  প্রলয় সমদ্দার বাপ্পী বলেন, “আমাদের ভাষা আজ হারিয়ে গেছে, আমাদের পা থমকে গেছে, আমাদের বিবেক বার বার কষাঘাত করছে। আমাদের কোন ভাষা নেই যা দিয়ে এই নারকিয় অত্যাচারের বিবরণ দিব, শোক জানাবো, সমবেদনা প্রকাশ করবো”। তিনি আরো বলেন, “আমাদের ভাবতে অবাক লাগে যে- আমরা এদেশের নাগরিক। সরকার অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র তৈরীতে রাত-দিন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে অথচ তার পুলিশ বাহিনীর কিছু পথভ্রষ্ট পিশাচ এদেশের সবচেয়ে শান্তি কামী খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের অত্যাচার করছে”। “কিছু দিন আগে এই পুলিশ বাহিনী গাইবান্ধায় নিরীহ সাঁওতাল জন-গোষ্ঠির বাড়ী ঘরে আগুন জ¦ালিয়ে দেয় যার ৯০ ভাগ জন-গোষ্টিই খ্রিস্টান সম্প্রদায়। তিনি পুলিশ বাহিনীর কাছে প্রশ্ন করেন- খ্রিস্টান সমাজ পুলিশ বাহিনীর কি ক্ষতি করেছে যে, তারা একটার পর একটা খ্রিস্টান জন-পদকে আক্রমণ করে যাচ্ছে? আমরা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছি এবং এর প্রতিবাদ আমরা সকলকে নিয়ে করে যাবো”। এই সময় আরো সমবেদনা জানিয়ে বক্তব্য দেন খ্রীষ্টিয়ান এ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের জাতীয় আহবায়ক মিঃ অব্রাহাম গোমেজ এবং যুগ্ম-সচিব দিপক পিরিচ, নির্মল মজুমদার প্রমুখ।

আমরা আজ আর কেই নিরাপদ নই। বেশ কিছু দিন যাবত খ্রিস্টান পুরোহিত হত্যা, ব্যবসায়ী হত্যা, গীর্জায় আঘাত আনা সহ অনেক ঘটনা আমাদের দিশা-হীন করে তুলেছে, আমাদের নিরাপত্তাহীন করে ফেলেছে। এমনিতেই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি প্রায়ই নামে-বেনামে আমাদের বিভিন্ন পালক-পুরোহিত ও নেতৃবৃন্দদের বিভিন্ন পন্থায় হুমকি দিয়ে আসছে, আর এখন খোদ রাষ্ট্রিয় বাহিনী দ্বারা অত্যাচারিত হচ্ছি। যে পুলিশ বাহিনী আমাদের নিরাপত্তা দিবে, সেই পুলিশ বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যরা দেশের ভাব-মুর্ত্তি নষ্ট করতে নিরীহ জাতি গোষ্ঠির উপর ন্যাক্কারজনক হামলা চালাচ্ছে। আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, আমরা নিরাপত্তা চাই, আমরা এদেশে নাগরিক, আমাদের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের একান্ত কর্তব্য।

আমরা সবাই বাংগালী, এদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমরা দেশের জন্য কাজ করেছি। আমরা দৃঢ় কণ্ঠে বলতে পারি- দেশ আমাদের কি দিয়েছে তা বড় কথা নয় কিন্তু দেশকে বাংলাদেশের খ্রিস্টান সমাজ এদেশকে অনেক কিছু দিয়েছে। সুতরাং আমরা কেন অত্যাচারিত হবো? আমার কেন নিরাপত্তাহীনতায় থাকবো? আমরা কেন চিৎকার করে বলতে পারবো না এই দেশ আমার, আমি এই দেশের একজন নাগরিক। ধর্ম আমার পরিচয় নয়, আমার বড় পরিচয় হল আমি বাঙালী, বাঙলা আমার জন্ম ভূমি।

বর্তমানে অনেক ঘটনা ঘটছে,  কিছু কিছু আমাদের দৃষ্টি গোচর হয় আবার অনেক ঘটনা আমরা জানি না। আমাদের আজ সময় এসেছে এই সকল ঘটনার সুষ্ঠ সমাধান চাওয়া। কারন বর্তমান সরকার একটি অসাম্প্রদায়িক সরকার। সরকার প্রধান কোনভাবেই এই জঘন্য ঘটনার আশ্রয় দিবেন না। কিন্তু তার কাছে কে যাবে এই সমস্ত ঘটনা অবগত করার জন্য।

আমরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। আমাদের মধ্যে ঐক্যতা নেই বললেই চলে। সে যাহা হোক, আমাদের  ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা এদেশের সন্তান, নাগরিক। আমাদের আজ ঐক্যবদ্ধভাবে এই সকল ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে হবে। প্রত্যেককে প্রত্যেকের নিজম্ব অবস্থান থেকে প্রতিবাদের ঝড় তুলতে হবে। আমাদের সততা এবং আমাদের মানবতাকে কেউ দূর্বল ভাবলে তাদের জবাব দিতে হবে। সমাজে ভেদা-ভেদ ছিল, আছে এবং থাকবে। কিন্তু সামগ্রিক বিষেয়ে আমাদের ঐক্যতা প্রকাশ করতে হবে। আমরা যদি ঐক্যে থাকি, তবে আমাদের প্রতি কোন অবিচার, অত্যাচার, নিপিড়ন হলে সকলে মিলে প্রতিবাদ করতে পারবো। আমাদের প্রতি সাম্প্রদায়িক আঘাত আসলে প্রথমে আমাদের নিজেদেরকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে জানাতে হবে যে, আমরা সংখ্যায় কম কিন্তু তাদের থেকে অনেক বেশী। কারন আমাদের সাথে আছে এদেশের লাখো শান্তি কামী মানুষ।

আমরা আর নির্বাক থাকবো না। নির্বাকতা বা নিরবতা কোন প্রতিবাদ, প্রতিশোধ বা ভালবাসা বা মানবতার ভাষা নয়। সবাক হতে হবে, কথা বলতে হবে, প্রয়োজনে আর একটি যুদ্ধে অবতীর্ন হতে হবে। কারন মাতৃভূমির  প্রতি আমাদের অধিকারকে কাউকে খর্ব করতে দেব না।  অসহায়, নির্বাক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের নিজস্ব প্রভাকে নিস্তেজ করে দিয়েছে। আর নয়, এখন আবার যুদ্ধে যাবার সময় হয়েছে,  প্রতিবাদ করার সময় হয়েছে, প্রস্তুত থাকুন, যে কোন সময় আপনাকে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি আঘাত হানতে পারে। ভীতু না হয়ে রুখে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি নিন, দেখবেন আমরাই বিজয়ী হয়েছি।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)